গর্ভপাত নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই,
আপনার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা এবং পারিবারিক চাপ বিবেচনা করে গর্ভপাতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করতে হবে। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, গর্ভপাতের বৈধতা নির্ভর করে ভ্রূণের বয়স এবং মায়ের জীবনের ঝুঁকির উপর।
১. ভ্রূণের বয়স ১২০ দিন (৪ মাস) এর আগে:
- হানাফি মাযহাবের প্রধান মত: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, গর্ভধারণের ১২০ দিন (৪ মাস) পর্যন্ত ভ্রূণে রূহ (আত্মা) প্রবেশ করে না। এই সময়ের মধ্যে যথার্থ কারণ (যেমন: মায়ের শারীরিক অসুস্থতা, ডাক্তারের পরামর্শ) থাকলে গর্ভপাত করা মাকরূহ তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) হলেও কিছু ক্ষেত্রে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
- ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, ১২০ দিনের আগেও গর্ভপাত করা জায়েয নয় যদি না মায়ের জীবন রক্ষার জন্য জরুরি প্রয়োজন হয়।
রদ্দুল মুহতার (৫/২৭৫) এ উল্লেখ আছে:
"গর্ভধারণের ১২০ দিনের আগে গর্ভপাত করা মাকরূহ, তবে যদি মায়ের জীবনের ঝুঁকি থাকে বা দুধ পানকারী সন্তানের ক্ষতি হয়, তাহলে অনুমতি আছে।"
২. ভ্রূণের বয়স ১২০ দিনের বেশি হলে:
- সর্বসম্মত মত: ১২০ দিনের পর রূহ প্রবেশের পর গর্ভপাত করা হারাম এবং এটি হত্যার শামিল। এই সময়ে গর্ভপাত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, এমনকি মায়ের জীবনের ঝুঁকি থাকলেও শুধুমাত্র তখনই অনুমতি আছে যদি ডাক্তার নিশ্চিত হন যে গর্ভাবস্থা চলতে থাকলে মায়ের মৃত্যু অনিবার্য।
৩. আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান:
-
প্রথমে ভ্রূণের বয়স নিশ্চিত করুন: ডাক্তারের মাধ্যমে আল্ট্রাসাউন্ড করে ভ্রূণের বয়স জেনে নিন। যদি ১২০ দিনের কম হয়, তাহলে নিম্নলিখিত শর্তে গর্ভপাত করা যেতে পারে:
- মায়ের জীবনের গুরুতর ঝুঁকি: ডাক্তার যদি নিশ্চিত হন যে সিজারিয়ান অপারেশনের কারণে আবার গর্ভধারণ মায়ের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে, তাহলে ১২০ দিনের আগে গর্ভপাত করা জায়েয হতে পারে।
- দুই সন্তানের দেখাশোনা: আপনার স্ত্রী একাই দুই সন্তান দেখাশোনা করছেন, এটি একটি বৈধ কারণ হিসেবে গণ্য হতে পারে, তবে এটি মায়ের জীবনের ঝুঁকির মতো গুরুতর নয়। তাই শুধুমাত্র এই কারণে গর্ভপাত করা উচিত নয়।
-
যদি ভ্রূণের বয়স ১২০ দিনের বেশি হয়: তাহলে গর্ভপাত করা হারাম এবং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই অবস্থায় আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে।
৪. ডাক্তারের পরামর্শ:
- বিশ্বস্ত মুসলিম ডাক্তারের পরামর্শ নিন: যিনি ইসলামী বিধান সম্পর্কে অবগত। তিনি যদি নিশ্চিত হন যে গর্ভাবস্থা চলতে থাকলে মায়ের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে, তাহলে ১২০ দিনের আগে গর্ভপাতের অনুমতি আছে।
- দুইবার সিজারিয়ান হয়েছে: এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে তৃতীয় সিজারিয়ানও সফলভাবে সম্ভব। তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
৫. আপনার করণীয়:
- ভ্রূণের বয়স নিশ্চিত করুন: ডাক্তারের কাছে গিয়ে আল্ট্রাসাউন্ড করান।
- ডাক্তারের সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন: আপনার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা এবং গর্ভধারণের ঝুঁকি সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।
- ইস্তিখারা করুন: আল্লাহর কাছে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য প্রার্থনা করুন।
- বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন: আপনার এলাকার কোনো মুফতি বা আলেমের সাথে পরামর্শ করুন।
সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত:
- যদি ভ্রূণের বয়স ১২০ দিনের কম হয় এবং ডাক্তার মায়ের জীবনের ঝুঁকি নিশ্চিত করেন, তাহলে গর্ভপাত করা জায়েয হতে পারে।
- যদি ভ্রূণের বয়স ১২০ দিনের বেশি হয়, তাহলে গর্ভপাত হারাম।
- শুধুমাত্র সন্তানদের দেখাশোনার চাপ বা পারিবারিক অসুবিধার কারণে গর্ভপাত করা উচিত নয়।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।