বর্ষপূর্তি এবং বিবাহবার্ষিকী পালনে সাদৃশ্য

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 4810
Questioner: Ummu Aisha
Question Asked: 02 Sep 2026, 11:16 AM
Reviewed & Published: 02 Sep 2026, 12:02 PM
Views: 31
Tokens: 5,948
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
আমরা জানি ইসলামে যেকোনো বর্ষপূর্তি উদযাপনই হারাম। তবে দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের "এক বছর যাবৎ নেক কাজের তাওফিক হয়েছে" চিন্তা করে বর্ষপূর্তি উপলক্ষে স্পেশাল কোনো দ্বীনি আয়োজন করা জায়েজ রয়েছে এমন ফতোয়া দেখেছি আইফতোয়াতে।

আমরা স্বামী-স্ত্রী জন্মদিন বা এই জাতীয় দিবস পালন থেকে পুরোপুরি বিরত থাকি আলহামদুলিল্লাহ। তবে বিবাহবার্ষিকীর ব্যাপারে একটু শিওর হতে চাই। দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের বর্ষপূর্তির মতোই আমরা যদি চিন্তা করি "আল্লাহ আমাদের একসাথে আরও একটা বছর পার করেছেন" এবং এই চিন্তা থেকে বিবাহবার্ষিকীর দিনটা একে অন্যকে কিছুটা স্পেশাল ফীল করানো হয়, সেটা কি হারাম হবে? কোনো কেক কাটা নয় বা হ্যাপি অ্যানিভার্সারি বলে উইশ করা নয়; স্বামী হয়তো কোনো গিফট দিলেন স্ত্রীকে। আর স্ত্রী হয়তো ভালো কোনো জামা পরে সারাদিন সেজেগুজে থাকলেন, ভালোমন্দ রান্না হলো এবং একে-অন্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা অন্যান্য দিনের চাইতে বেশি ভাষায় প্রকাশ করা হলো (বছর শেষের reflection এর মতো।) স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা প্রতিদিন থাকলেও প্রতিদিন তো আর স্ত্রীর সেজেগুজে থাকা বা কৃতজ্ঞতা সুন্দর ভাষায় প্রকাশ সম্ভব হয় না। তবে মাঝেমধ্যেই মন ভালো থাকলে বা ছুটির দিনে এগুলো করা হয়, সেই হিসেবে বিবাহবার্ষিকীর দিনটাতেই করলে কি তা গুনাহের কারণ হবে?

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রশ্নটির জন্য ধন্যবাদ। আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে জানতে চেয়েছেন। ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট দিনকে 'বার্ষিকী' হিসেবে উদযাপন করার যে রীতি প্রচলিত আছে, তা সাধারণত বিদআত বা অন্য ধর্মের অনুসরণ হিসেবে গণ্য হয়। তবে আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষাপট ভিন্ন—আপনি কোনো আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়, বরং দাম্পত্য জীবনে আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপলক্ষ্য হিসেবে এই দিনটিকে ব্যবহার করার কথা বলেছেন।

ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও ফতোয়া

১. বিদআত ও উদযাপনের মূলনীতি: ইসলামে এমন কোনো নির্দিষ্ট দিনকে ধর্মীয় উৎসবে পরিণত করা নিষিদ্ধ, যা শরিয়ত নির্ধারণ করেনি। যেমন—জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী পালন করা, যদি তা অমুসলিমদের সংস্কৃতির অনুসরণে হয় অথবা এতে এমন কোনো রীতি থাকে যা ইসলাম সমর্থন করে না (যেমন: কেক কাটা, হ্যাপি অ্যানিভার্সারি বলা, বিশেষ আয়োজন ইত্যাদি), তবে তা মাকরূহ বা নিষিদ্ধ হবে। কিন্তু আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি এসব কিছুই করছেন না।

২. নিয়ত ও উদ্দেশ্যের গুরুত্ব: ইসলামে আমলের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে নিয়তের ওপর। হাদিসে আছে, "নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।" (সহিহ বুখারি: ১)। আপনার নিয়ত যদি হয় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং দাম্পত্য সম্পর্ক মজবুত করা, তবে তা একটি ভালো কাজ। তবে শর্ত হলো, এই দিনটিকে এমন কোনো বিশেষ মর্যাদা দেওয়া যাবে না যা ইসলাম দেয়নি, এবং এমন কোনো কাজ করা যাবে না যা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে।

৩. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও উপহার: ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, উপহার বিনিময় এবং একে অপরের প্রতি সদয় হওয়া অত্যন্ত পছন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও স্ত্রীদের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসা প্রকাশ করতেন এবং উপহার দিতেন। তাই বছরের যেকোনো দিনে স্ত্রীকে উপহার দেওয়া বা ভালো পোশাক পরা জায়েজ। যদি এই কাজগুলো বিবাহবার্ষিকীর দিনে করা হয়, কিন্তু তা কোনো প্রথা বা রীতির অংশ হিসেবে না হয়ে শুধুমাত্র ভালোবাসা ও শুকরিয়া প্রকাশের মাধ্যম হয়, তাহলে তা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ নেই।

৪. দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের বর্ষপূর্তির সাথে তুলনা: আপনি দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের বর্ষপূর্তির কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে যদি নেক কাজের তাওফিকের শুকরিয়া হিসেবে কোনো আয়োজন করা হয়, তবে তা জায়েজ হতে পারে, যদি তাতে কোনো শরিয়তবিরোধী কাজ না থাকে। আপনার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। যদি দিনটি শুধুমাত্র আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করার এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপলক্ষ্য হয়, তবে তা দোষের নয়।

তবে সতর্কতা

  • দিনটিকে বিশেষ মর্যাদা না দেওয়া: এই দিনটিকে এমনভাবে পালন করা যাবে না যেন এটি ইসলামের কোনো নির্ধারিত দিন (যেমন: ঈদ)। মনে রাখতে হবে, ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিন নেই; এটি প্রতিদিনই করা উচিত। তাই যদি মনে হয়, শুধুমাত্র এই একটি দিনের জন্য বিশেষ আয়োজন করা হচ্ছে এবং অন্য দিনগুলোতে অবহেলা করা হচ্ছে, তবে তা ঠিক নয়।
  • প্রচলিত রীতির অনুসরণ না করা: সমাজে বিবাহবার্ষিকী পালনের যে প্রচলিত রীতি রয়েছে (যেমন: কেক কাটা, পার্টি করা, উইশ করা), তা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা জরুরি। আপনার বর্ণনায় আপনি স্পষ্ট বলেছেন যে, আপনি এসব করবেন না, তাই ইনশাআল্লাহ কোনো সমস্যা নেই।

ফতোয়া ও উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের আলোচনা

হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছে, এমন কোনো দিনকে উৎসব হিসেবে পালন করা মাকরূহ, যা শরিয়ত নির্ধারণ করেনি। তবে যদি তা নিছক একটি পারিবারিক আনন্দের উপলক্ষ্য হয় এবং তাতে কোনো গুনাহের কাজ না থাকে, তাহলে তা জায়েজ। (রদ্দুল মুহতার: ৬/৭৫৪)

ফাতাওয়া হিন্দিয়া-তেও বলা হয়েছে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে উপহার বিনিময় এবং ভালোবাসা প্রকাশ করা মুস্তাহাব। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৩৫)

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন, কোনো নির্দিষ্ট দিনকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া বিদআত, তবে যদি তা নিছক একটি অভ্যাস হয় এবং তাতে শরিয়তবিরোধী কিছু না থাকে, তাহলে তা জায়েজ। (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৫/১৮৭)

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, যদি বিবাহবার্ষিকীর দিনটি শুধুমাত্র আল্লাহর শুকরিয়া আদায়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা প্রকাশ এবং উপহার বিনিময়ের মাধ্যমে কাটানো হয়, এবং তাতে কোনো শরিয়তবিরোধী কাজ (যেমন: কেক কাটা, উইশ করা, বিশেষ পার্টি) না থাকে, তাহলে তা হারাম বা গুনাহের কারণ হবে না। তবে মনে রাখতে হবে, এই দিনটিকে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়া যাবে না। এটি হবে নিছক একটি পারিবারিক আনন্দের দিন, যা ইসলামের সাধারণ নিয়মের মধ্যেই পড়ে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। (আমিন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.