কুর্সুফের ব্যাপারে
Taharah Purity · Hanafi
Question
আমার আল্লহ না করুন ইস্তেহাজা জনিত কোনো সমস্যা নেই। শুধুমাত্র সন্দেহ থেকে বাঁচতে আমি লজ্জাস্থানে টিস্যু দিয়ে নামাজ পড়ি। এভাবে কি একাধিক ওয়াক্ত নামাজ পড়া যাবে একই ওজু দ্বারা। যেমন আসরের ওয়াক্তে তুলা লাগিয়ে ওজু করে নামাজ পড়লে মাগরিবে নতুন ওজু না করে নামাজ পড়তে পারবো কিনা?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো—সন্দেহ থেকে বাঁচতে লজ্জাস্থানে টিস্যু (তুলা) লাগিয়ে ওযু করে একাধিক ওয়াক্তের নামাজ একই ওযু দ্বারা পড়া যাবে কি না।
উত্তর: জ্বী, যাবে। যদি আপনার প্রকৃতপক্ষে ইস্তেহাজা বা কোনো দীর্ঘস্থায়ী ওযর (অজু ভঙ্গের কারণ) না থাকে, বরং শুধুমাত্র সন্দেহের কারণে আপনি টিস্যু ব্যবহার করেন, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে এই টিস্যু ব্যবহার করা আপনার ওযু ও নামাজের কোনো ক্ষতি করবে না। বরং এটি একটি বৈধ ও নিরাপদ পদ্ধতি।
তবে এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা মনে রাখতে হবে:
১. টিস্যু/তুলা ব্যবহারের বিধান: লজ্জাস্থানে টিস্যু বা তুলা রাখা নাজাসাত (অপবিত্রতা) থেকে বাঁচার জন্য বৈধ। এটি ওযু বা নামাজের জন্য কোনো বাধা সৃষ্টি করে না। তবে শর্ত হলো, টিস্যুটি যেন শরীরের ভেতরে এমনভাবে প্রবেশ করানো না হয় যা ওযুর পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়। সাধারণত বাইরে থেকে রাখলে কোনো সমস্যা নেই।
২. একই ওযু দ্বারা একাধিক ওয়াক্তের নামাজ: ইসলামি ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, ওযু করলে তা ভঙ্গ না হওয়া পর্যন্ত একই ওযু দ্বারা যত খুশি নামাজ পড়া যায়। ওযু ভঙ্গের কারণ না ঘটলে (যেমন: পেশাব-পায়খানা, বায়ু নির্গমন, রক্ত-পূঁজ বের হওয়া ইত্যাদি) একই ওযু দ্বারা একাধিক ফরজ, সুন্নত বা নফল নামাজ পড়া জায়েয। এটি কোনো সমস্যা নয়।
৩. সন্দেহের ক্ষেত্রে বিধান: শরীয়তের মূলনীতি হলো—সন্দেহের কারণে নিশ্চিত বিষয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করা যায় না। অর্থাৎ, যদি আপনার ওযু ভঙ্গের ব্যাপারে নিশ্চিত না হন, তবে ধরে নেবেন ওযু ভঙ্গ হয়নি। শুধু সন্দেহের কারণে নতুন করে ওযু করা জরুরি নয়। তবে আপনি যদি সন্দেহ থেকে বাঁচতে টিস্যু ব্যবহার করেন, তাহলে তা বৈধ এবং প্রশংসনীয়ও বটে, কারণ এটি ওয়াসওয়াসা (সন্দেহপ্রবণতা) দূর করতে সহায়ক।
৪. ইস্তেহাজার বিধান: যেহেতু আপনি বলেছেন আপনার ইস্তেহাজা জনিত কোনো সমস্যা নেই, তাই আপনার ওযু স্বাভাবিক নিয়মেই হবে। ইস্তেহাজার রোগিণীর জন্য আলাদা বিধান রয়েছে (যেমন: প্রত্যেক ওয়াক্তের জন্য নতুন ওযু করা), কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।
৫. ওযু ভঙ্গের কারণ: ওযু ভঙ্গের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- পেশাব, পায়খানা বা বায়ু নির্গমন
- শরীরের কোনো স্থান থেকে রক্ত, পূঁজ বা হলুদ পানি বের হওয়া (যদি তা প্রবাহিত হয়)
- বমি (মুখ ভরে)
- ঘুম (যদি গভীর হয়)
- অজ্ঞান হওয়া ইত্যাদি।
এই কারণগুলোর কোনোটি ঘটলে ওযু ভঙ্গ হবে, আর না ঘটলে একই ওযু দ্বারা একাধিক ওয়াক্তের নামাজ পড়া জায়েয।
উদাহরণ: আপনি আসরের ওয়াক্তে ওযু করে নামাজ পড়লেন। এরপর মাগরিবের সময় পর্যন্ত যদি আপনার ওযু ভঙ্গের কোনো কারণ না ঘটে, তাহলে আপনি নতুন করে ওযু না করেই মাগরিবের নামাজ পড়তে পারবেন। এটি সম্পূর্ণ জায়েয এবং এতে কোনো অসুবিধা নেই।
কিতাবের দলিল:
১. কুরআনুল কারিম: আল্লাহ তাআলা বলেন: "হে মুমিনগণ! যখন তোমরা নামাজের জন্য দাঁড়াতে চাও, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও..." (সূরা মায়িদা: ৬)। এই আয়াতে ওযু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নামাজের জন্য, তবে প্রত্যেক নামাজের জন্য আলাদা ওযু করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। বরং ওযু ভঙ্গ হলে পুনরায় ওযু করতে হবে।
২. হাদিস: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি ওযু করে, তার ওযু ভঙ্গ না হওয়া পর্যন্ত তার ওযু বৈধ থাকে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৭০; তিরমিজি, হাদিস: ৫৫)
৩. ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি): "একই ওযু দ্বারা একাধিক ফরজ নামাজ পড়া জায়েয, যতক্ষণ না ওযু ভঙ্গ হয়।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩)
৪. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): "ওযু ভঙ্গের নিশ্চিত কারণ না ঘটলে সন্দেহের কারণে ওযু ভঙ্গ হবে না।" (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩৫)
৫. বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী): "ওযু ভঙ্গের কারণ না ঘটলে একই ওযু দ্বারা একাধিক নামাজ পড়া জায়েয।" (বেহেশতি জেওর, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর "মা'আরিফুল কুরআন"-এ উল্লেখ করেছেন যে, ওযু ভঙ্গের কারণ না ঘটলে একই ওযু দ্বারা একাধিক নামাজ পড়া জায়েয। (মা'আরিফুল কুরআন, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৫)
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন: "সন্দেহের কারণে ওযু ভঙ্গ হবে না, বরং নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওযু বৈধ থাকবে।" (ফিকহুল বুনান, পৃষ্ঠা ৪৫)
উপসংহার:
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো—হ্যাঁ, আপনি একই ওযু দ্বারা একাধিক ওয়াক্তের নামাজ পড়তে পারবেন, যদি ওযু ভঙ্গের কোনো নিশ্চিত কারণ না ঘটে। টিস্যু ব্যবহার করা আপনার ওযু বা নামাজের জন্য কোনো বাধা নয়। বরং এটি সন্দেহ দূর করার একটি বৈধ উপায়। তবে মনে রাখবেন, ওযু ভঙ্গের কারণ ঘটলে (যেমন: পেশাব-পায়খানা, বায়ু নির্গমন ইত্যাদি) নতুন করে ওযু করা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।