নামাজ সংক্ষিপ্ত করার বিধান কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১.শরীর অতিরিক্ত দুর্বল লাগলে, যখন বসে নামাজ পড়তেও কষ্ট হচ্ছে, তখন জোহরের সালাত সংক্ষিপ্ত করার কোন উপায় আছে? থাকলে কতটুকু পড়বো?
২.আমি প্রায় সময়ই বাসার কাজ করার সময়, বিশেষ করে ঘর মোছার সময় হেডফোন কানে লাগিয়ে সিরাত বা ইসলামিক কোন আলোচনা শুনতে থাকি। অনেক সময় এ ক্ষেত্রে আমাকে বাথরুমে ঢুকতে হয়, আবার বের হতে হয়, সে ক্ষেত্রে অনেক সময় কোরআন ও হাদিসের আলোচনা চলে, এতে কি গুনাহগার হয়ে যাচ্ছি?
৩.কাপড়টা যদি অপবিত্র কিন্তু শুকনা থাকে।
সে ক্ষেত্রে গায়ে পরিধান করার সময়, শরীরের ঘাম থেকে ভিজে গিয়ে শরীর অপবিত্র হতে পারে কিনা? কাপড় থেকে?
৪.জানালাতে কাপড় দেয়ার সময়, জানালার পর্দা পবিত্র করা থাকে না. সে ক্ষেত্রে ভেজা কাপড়ের অংশ জানালার পর্দার সাথে লেগে যায় , এক্ষেত্রে কাপড় কি পুনরায় অপবিত্র হয়ে যাবে?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্ন ১: শরীর অতিরিক্ত দুর্বল থাকা অবস্থায় নামাজ সংক্ষিপ্ত করার নিয়ম।
উত্তর: শরীয়তে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে অক্ষম অসুস্থ ব্যক্তির জন্য নামাজ সংক্ষিপ্ত করার অনুমতি আছে, তবে তা নির্দিষ্ট নিয়মে।
যদি আপনি অসুস্থতা বশত বসে নামাজ পড়তেও কষ্ট অনুভব করেন, সেক্ষেত্রে আপনি শুয়ে (ডান কাতে বা চিৎ হয়ে) নামাজ পড়তে পারেন। এ অবস্থায় রুকু ও সিজদা ইশারায় (মাথা বা চোখের ইশারায়) করবেন।
তবে সংক্ষিপ্ত করার অর্থ হলো ফরজ নামাজের রাকাত সংখ্যা কমানো নয় (যেমন জোহর ৪ রাকাতের বদলে ২ রাকাত পড়া জায়েয নয়)। বরং সংক্ষিপ্ত করার অর্থ হলো:
- সূরা ফাতিহার পর কোনো সূরা না মিলিয়ে শুধু ফাতিহা পড়া।
- তাসবিহ (সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম, সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা) কমপক্ষে ১ বার পড়া।
- দরুদ ও দোয়া মাসুরা সংক্ষিপ্ত করা। জরুরত বশত না পড়লেও নামাজ হয়ে যাবে।
আপনি যদি অসুস্থতা বশত দাঁড়াতে না পারেন, তাহলে বসে পড়বেন। বসতেও কষ্ট হলে শুয়ে পড়বেন। শোয়া অবস্থায় রুকু-সিজদা ইশারায় করবেন। সিজদার জন্য মাথা রুকুর চেয়ে একটু বেশি নিচু করবেন। যদি মাথা নাড়াতেও কষ্ট হয়, তাহলে চোখের ইশারায় করবেন (চোখ বন্ধ করে রুকুতে, আরও বন্ধ করে সিজদায়)।
দলিল:
- কুরআনে আল্লাহ বলেন: "আল্লাহ তোমাদের উপর কোনো প্রকার সংকীর্ণতা (কষ্ট) সৃষ্টি করতে চান না।" (সূরা মায়িদা: ৬)
- হাদিসে আছে, ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.)-এর পাইলস রোগ হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেন: "তুমি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়, যদি না পারো তাহলে বসে, আর যদি না পারো তাহলে কাত হয়ে (শুয়ে) পড়।" (সহিহ বুখারী: ১১১৭)
প্রশ্ন ২: বাসার কাজ করার সময় হেডফোনে ইসলামিক আলোচনা শোনা এবং বাথরুমে যাওয়ার সময় তা চলতে থাকলে গুনাহ হবে কি?
উত্তর: বাসার কাজ করার সময় ইসলামিক আলোচনা বা কুরআন তিলাওয়াত শোনা একটি সওয়াবের কাজ। কিন্তু বাথরুমে (পায়খানা-প্রস্রাবের স্থানে) কুরআন তিলাওয়াত বা যিকির শোনা বা করা জায়েয নয়। এটি অপবিত্র স্থান, তাই সেখানে কুরআনের আয়াত বা হাদিসের আলোচনা শোনা মাকরুহ (অপছন্দনীয়) এবং গুনাহের কাজ।
সমাধান: বাথরুমে প্রবেশের আগে হেডফোনটি খুলে ফেলুন বা বন্ধ করে দিন। অথবা বাথরুমে যাওয়ার সময় হেডফোনে অন্য কিছু (যেমন: দুনিয়াবি কোনো গান নয়, বরং কোনো নিরপেক্ষ অডিও) চালিয়ে রাখুন। বাথরুম থেকে বের হয়ে আবার ইসলামিক আলোচনা চালু করুন।
দলিল:
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "পায়খানায় প্রবেশের সময় 'বিসমিল্লাহ' বলা এবং সেখানে যিকির করা নিষিদ্ধ।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৫)
- কুরআন তিলাওয়াতের স্থান পবিত্র হওয়া শর্ত। অপবিত্র স্থানে কুরআন তিলাওয়াত করা মাকরুহে তাহরিমি (গুনাহের কাজ)।
প্রশ্ন ৩: শুকনা অপবিত্র কাপড় শরীরের ঘামে ভিজে গেলে শরীর অপবিত্র হবে কি?
উত্তর: শুকনা অপবিত্র কাপড় শরীরের ঘামে ভিজে গেলে সেই অপবিত্র কাপড় যদি এমন ভিজে যায় যে তাকে নিংড়ানো হলে নিংড়িয়ে যাবে অথবা শরীরে যদি নাপাকির এর কোন গন্ধ বা চিহ্ন পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে শরীর নাপাক হবে।
অন্যথায় শরির পাকই থাকবে।
দলিল:
-
ফিকহের নীতি: "যদি নাপাকি দৃশ্যমান না হয় এবং স্থানান্তরের প্রমাণ না থাকে, তাহলে মূলত পবিত্রতাই ধর্তব্য।" (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম)
-
রাদ্দুল মুহতার: "শুকনা নাপাক কাপড় শরীরে লাগলে শরীর নাপাক হয় না, যতক্ষণ না নাপাকির অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়।"
প্রশ্ন ৪: ভেজা কাপড় জানালার অপবিত্র পর্দার সাথে লেগে গেলে কাপড় অপবিত্র হবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, যদি জানালার পর্দাটি নিশ্চিতভাবে অপবিত্র (নাজিস) হয় এবং আপনার কাপড়টি ভেজা থাকে, তাহলে ভেজা কাপড়ের মাধ্যমে নাপাকি স্থানান্তরিত হয়ে আপনার কাপড় অপবিত্র হয়ে যাবে। কারণ ভেজা বস্তু অপবিত্র বস্তুর সংস্পর্শে এলে নাপাকি স্থানান্তরিত হয়।
তবে যদি পর্দাটি সন্দেহজনক হয় (অর্থাৎ নাপাকি নিশ্চিত নয়), তাহলে মূলত পবিত্রই ধর্তব্য এবং কাপড় অপবিত্র হবে না। কারণ ইসলামে সন্দেহের ভিত্তিতে পবিত্র বস্তুকে অপবিত্র বলা হয় না।
সমাধান: জানালায় কাপড় দেয়ার সময় সতর্ক থাকুন, ভেজা কাপড় যেন অপবিত্র পর্দার সাথে না লাগে। যদি লাগে এবং আপনি নিশ্চিত হন যে পর্দাটি নাপাক, তাহলে কাপড়ের যে অংশ লেগেছে সেটি ধুয়ে ফেলুন।
দলিল:
- ফিকহের নীতি: "ভেজা বস্তু নাপাক বস্তুর সংস্পর্শে এলে নাপাকি স্থানান্তরিত হয়।" (ফাতাওয়া আলমগীরি, ১/৪৫)
- "সন্দেহের কারণে পবিত্র বস্তুকে নাপাক বলা যাবে না।" (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর)
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।