বিয়ে নিয়ে ধোকা সহ বিবিধ প্রশ্ন।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
বিয়ে নিয়ে প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: আমার পরিচিত এক বান্ধবীকে আমি বিয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক করেছিলাম যে, যার সাথে বিয়ে হবে সে ঘুষের সাথে সম্পর্কযুক্ত (পুলিশ) এবং জুলুমের সাথেও যুক্ত, যার প্রমাণ আছে। তার ব্যবহারও খারাপ ও অহংকারী। সে জেনেও তার সাথে বিয়ের অনুমতি দেয় এবং বিয়ে হয়ে যায়। সে জেনেও উত্তরে বলে সে ভালো মানুষ। আমার প্রশ্ন হলো—এতে কি সে হারাম ও জুলুমের সাহায্যকারী হলো? সেই স্বামীর বাড়িতে সে যা খাবে ভরণপোষণ তা কি হারাম হবে, যেহেতু স্বামীর টাকায় হবে? জেনে বুঝেও তাকে সমর্থন করা এবং আমাকে মুনাফিক বলা—এতে শরীয়ত কি বলে?
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
আলহামদুলিল্লাহি ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ।
১. জুলুমের সাহায্যকারী হওয়া প্রসঙ্গে
আপনার বান্ধবী যদি জেনে-বুঝে এমন ব্যক্তির সাথে বিয়ে করে যার সম্পর্ক ঘুষ ও জুলুমের সাথে রয়েছে, তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সমর্থনযোগ্য নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
"তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পর সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সাহায্য করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিয়ে করা নিজেই জুলুমের সাহায্যকারী হওয়ার শামিল কিনা তা নির্ভর করে নিয়ত ও পরিস্থিতির উপর। যদি সে জেনে-বুঝে তার জুলুমকে সমর্থন করার জন্য বিয়ে করে, তবে তা নিশ্চিতভাবে গুনাহের কাজ। কিন্তু যদি সে তার চরিত্র সংশোধনের নিয়তে বিয়ে করে এবং আশা করে যে সে তাকে ভালো পথে আনতে পারবে, তবে সেটি ভিন্ন বিষয়।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার এ উল্লেখ করেছেন যে, জুলুমের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক রাখা এবং তাকে সমর্থন করা মাকরূহ ও গুনাহের কাজ। (রাদ্দুল মুহতার, ৯/৫৫০)
২. স্বামীর উপার্জন হারাম হলে স্ত্রীর ভরণপোষণ
যদি স্বামীর উপার্জন সম্পূর্ণ হারাম হয় (যেমন ঘুষ, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি), তবে তা থেকে স্ত্রীর ভরণপোষণ গ্রহণ করা জায়েয হবে না। তবে যদি তার উপার্জনে হালাল ও হারাম মিশ্রিত থাকে, তাহলে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا
"হে মানবজাতি! পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তুসমূহ ভক্ষণ করো।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৬৮)
ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় উল্লেখ আছে যে, হারাম উপার্জন থেকে খাওয়া জায়েয নয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৫)
তবে এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়—যদি স্বামীর উপার্জনে হালাল ও হারাম মিশ্রিত থাকে এবং হালাল অংশ আলাদা করা সম্ভব না হয়, তাহলে অনেক উলামায়ে কেরাম বলেছেন যে, স্ত্রী তার প্রাপ্য ভরণপোষণ নিতে পারবে, কারণ স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়া ওয়াজিব। কিন্তু যদি সম্পূর্ণ হারাম হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন যে, স্বামীর হারাম উপার্জন থেকে স্ত্রীর খাওয়া জায়েয নয়, তবে যদি সে না জেনে খেয়ে ফেলে তবে আল্লাহর দরবারে মাফের আশা করা যায়। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৮৫)
৩. বিয়ে ভাঙার উপদেশ দেওয়া এবং মুনাফিক বলার প্রসঙ্গে
আপনি তাকে সতর্ক করা এবং বিয়ে না করার উপদেশ দেওয়া—এটি শরীয়তসম্মত কাজ। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
الدِّينُ النَّصِيحَةُ
"দ্বীন হলো উপদেশ প্রদান।" (সহীহ মুসলিম: ৫৫)
আপনি যদি সৎ উদ্দেশ্যে তাকে সতর্ক করে থাকেন, তবে আপনি সওয়াবের কাজ করেছেন। আপনাকে মুনাফিক বলা সম্পূর্ণ অন্যায় ও গুনাহের কাজ। মুনাফিক বলা একটি গুরুতর অভিযোগ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَنْ قَالَ لِأَخِيهِ يَا كَافِرُ فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا
"যে ব্যক্তি তার ভাইকে বলে 'হে কাফির', তবে তাদের মধ্যে একজন অবশ্যই কুফরীতে ফিরে যাবে (অর্থাৎ অভিযোগকারীই মুনাফিক বা কাফির হয়ে যাবে যদি অভিযুক্ত তা না হয়)।" (সহীহ বুখারী: ৬১০৪)
তবে বিয়ে ভাঙার ব্যাপারে শরীয়তের নিয়ম হলো—বিয়ে হয়ে গেলে তা ভাঙা সহজ কাজ নয়। বিয়ে ভাঙার জন্য শরীয়তসম্মত কারণ থাকতে হবে। শুধুমাত্র স্বামীর চরিত্র খারাপ হওয়া বিয়ে ভাঙার জন্য যথেষ্ট নয়, যদি না সে ধর্মীয়ভাবে সীমালঙ্ঘন করে এবং স্ত্রীর উপর জুলুম করে। তবে স্ত্রী যদি স্বামীর সাথে থাকতে না চায় এবং মোহরানার বিনিময়ে খুলা (তালাকের বিনিময়) নিতে চায়, তবে শরীয়তে তার অনুমতি আছে।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ
"যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তারা উভয়ে আল্লাহর সীমা বজায় রাখতে পারবে না, তবে স্ত্রী যা বিনিময়ে দিয়ে মুক্তি পাবে তাতে তাদের উভয়ের কোনো গুনাহ নেই।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২২৯)
৪. আপনার করণীয়
১. আপনি আপনার বান্ধবীকে সৎ উপদেশ দিয়েছেন—এটি সওয়াবের কাজ। ২. এখন বিয়ে হয়ে গেছে, তাই তাকে আরও উত্তম উপদেশ দিন যে, সে যেন স্বামীকে ভালো পথে আনার চেষ্টা করে। ৩. তাকে বলুন, স্বামীর হারাম উপার্জন থেকে খাওয়া যাবে না এবং তাকে হালাল উপার্জনের পরামর্শ দিতে থাকুন। ৪. আপনাকে মুনাফিক বলার জন্য ক্ষমা করে দিন এবং তার জন্য দোয়া করুন। ৫. মনে রাখবেন, উপদেশের দায়িত্ব আপনার ছিল—আপনি পালন করেছেন। এখন ফলাফল আল্লাহর কাছে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
১. আপনার বান্ধবী জেনে-বুঝে জুলুমের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিকে বিয়ে করে জুলুমের সাহায্যকারী হয়েছে—এটি গুনাহের কাজ। তবে সে যদি নিয়ত করে থাকে যে, তাকে সংশোধন করবে, তবে আশা করা যায় আল্লাহ তাকে মাফ করবেন।
২. স্বামীর হারাম উপার্জন থেকে ভরণপোষণ গ্রহণ করা জায়েয নয়। তবে মিশ্রিত উপার্জন হলে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
৩. আপনাকে মুনাফিক বলা সম্পূর্ণ অন্যায়। আপনি সৎ উপদেশ দিয়ে সওয়াবের কাজ করেছেন। বিয়ে ভাঙার উপদেশ দেওয়া আপনার পক্ষ থেকে নসীহত ছিল, যা শরীয়তসম্মত।
৪. এখন বিয়ে হয়ে গেছে, তাই তাকে সংশোধনের চেষ্টা করা এবং ধৈর্য ধারণ করা কর্তব্য।
والله أعلم بالصواب