ইসলামে সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে, কিন্তু সাথে সাথে অপচয় ও বিলাসিতাকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিস্তারিত জানতে চাই।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব খুবই স্বাভাবিক এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলামে সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে, কিন্তু সাথে সাথে অপচয় ও বিলাসিতাকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই একজন মুমিনের কর্তব্য। নিচে বিষয়টি কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
১. সুন্দর পোশাক বলতে কী বোঝায়?
ইসলামে সুন্দর পোশাক পরতে বলা হয়েছে, তবে এর অর্থ এই নয় যে, সামর্থ্য থাকলে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পোশাক কিনতেই হবে। বরং সুন্দর পোশাক বলতে পরিচ্ছন্ন, পবিত্র, শালীন এবং সমাজের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী যা পরা যায় এমন পোশাককে বোঝানো হয়েছে।
-
কুরআনের নির্দেশনা: আল্লাহ তায়ালা বলেন, "হে আদম সন্তান! আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান ঢেকে রাখে এবং সৌন্দর্যের উপকরণ। আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম।" (সূরা আল-আরাফ: ২৬)। এই আয়াতে পোশাকের দুটি উদ্দেশ্য বলা হয়েছে—(১) লজ্জা স্থান ঢাকা এবং (২) সৌন্দর্য। তবে তাকওয়াকে সর্বোত্তম বলা হয়েছে, অর্থাৎ পোশাকের বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে অন্তরের পরিচ্ছন্নতা ও আল্লাহভীতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
-
পুরনো পোশাক পরা: ইসলামে পুরনো পোশাক পরিধান করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়নি, বরং তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেও সাধারণ ও মাঝে মাঝে পুরনো পোশাক পরতেন। তবে তিনি যখন নতুন পোশাক পরতেন, তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন। তাই সামর্থ্য থাকলে নতুন পোশাক কেনা জায়েজ, তবে তা অপচয়ের পর্যায়ে যাওয়া উচিত নয়। মূল কথা হলো, পোশাক যেন পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন এবং শালীন হয়—নতুন বা পুরনো সেটা মুখ্য নয়।
২. ইসলামে বিলাসিতা (ইসরাফ) বলতে কী বোঝায়?
বিলাসিতা বা অপচয় (ইসরাফ) হলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করা বা বৈধ সীমা অতিক্রম করা। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।" (সূরা বনী ইসরাইল: ২৭)।
-
কখন কোনো বিষয় বিলাসিতা হবে?
- যখন কোনো জিনিস প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়।
- যখন তা অহংকার, প্রদর্শনী বা মানুষের কাছে বড় হওয়ার জন্য করা হয়।
- যখন তা হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে কেনা হয়।
- যখন তা অন্যের ক্ষতি বা হিংসার কারণ হয়।
- যখন তা ইবাদত বা দ্বীনি কাজে বাধা সৃষ্টি করে।
-
বিলাসিতার উদাহরণ: প্রয়োজনের অতিরিক্ত দামি পোশাক কেনা, ঘর সাজানোর জন্য অতিরিক্ত খরচ করা যা দেখে প্রতিবেশী বা আত্মীয়দের মনে কষ্ট হয়, অথবা এমন বিলাসবহুল জীবনযাপন করা যা ইসলামের সরলতা ও বিনয়ের শিক্ষার পরিপন্থী।
৩. দুনিয়া ও আখিরাতের ভারসাম্য কীভাবে করব?
দুনিয়া ও আখিরাতের ভারসাম্য রক্ষার মূলনীতি হলো—দুনিয়াকে আখিরাতের জন্য ব্যবহার করা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, "তোমার দুনিয়া এমনভাবে কাটাও যেন তুমি চিরকাল বেঁচে থাকবে, আর আখিরাতের জন্য এমনভাবে আমল করো যেন আগামীকালই মারা যাবে।" (মুসলিম)।
- ভারসাম্যের উপায়:
- নিয়তের সংশোধন: দুনিয়ার প্রতিটি বৈধ কাজ (খাওয়া, ঘুমানো, পোশাক পরা) যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করা হয়, তবে তা ইবাদতে পরিণত হয়। যেমন—সুন্দর পোশাক পরে আল্লাহর নিয়ামত প্রকাশ করা এবং মানুষের কাছে শালীনতা প্রদর্শন করা।
- প্রয়োজন ও বিলাসিতার পার্থক্য: নিজের প্রয়োজন বুঝে খরচ করা। প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা জায়েজ, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল জিনিসে অর্থ অপচয় না করা।
- অন্যের প্রতি দায়িত্ব: নিজের খরচের পাশাপাশি সমাজের গরিব-দুঃখী, এতিম ও মিসকিনদের অধিকার মনে রাখা। যারা নিজের জন্য ব্যয় করে কিন্তু অন্যের হক আদায় করে না, তারা ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়।
৪. কোনটা বিলাসিতা আর কোনটা আল্লাহ পছন্দ করেন—কীভাবে বুঝব?
এটি বুঝার জন্য কয়েকটি মানদণ্ড রয়েছে:
১. নিয়ত (ইন্তেনশন): আপনি যদি সৌন্দর্যকে আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে দেখে শুকরিয়া আদায়ের নিয়তে পোশাক পরেন বা ঘর সাজান, তবে তা প্রশংসনীয়। কিন্তু যদি তা অহংকার, প্রদর্শনী বা মানুষের চোখে বড় হওয়ার জন্য হয়, তবে তা বিলাসিতা ও অপছন্দনীয়।
২. সীমা (লিমিট): ইসলামের শিক্ষা হলো মধ্যমপন্থা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "আর যারা খরচ করে, তারা না অপচয় করে, না কার্পণ্য করে, বরং এর মাঝামাঝি পথ অবলম্বন করে।" (সূরা আল-ফুরকান: ৬৭)। অর্থাৎ, নিজের সামর্থ্যের মধ্যে থেকে খরচ করা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত না করা।
৩. সমাজের প্রভাব: আপনার সাজসজ্জা বা পোশাক যদি সমাজে হিংসা, প্রতিযোগিতা বা অশান্তির কারণ হয়, তবে তা বিলাসিতা। কিন্তু যদি তা অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা হয় এবং সমাজের রীতি-নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য।
৫. ঘর সাজানো ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাদিস
আপনি যে হাদিসের কথা উল্লেখ করেছেন, তা সম্ভবত এই—রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একবার একটি মসজিদে গিয়ে দেখলেন সেখানে কার্পেট বিছানো ও সুন্দর সাজসজ্জা করা হয়েছে। তখন তিনি বললেন, "আমার উম্মতের যুগে এগুলো থাকবে না।" অথবা তিনি ঘরের দেয়ালে চুনকাম ও সাজসজ্জা দেখে বলেছিলেন, "এসব সরিয়ে ফেলো, কারণ এগুলো আমার উম্মতের জন্য ক্ষতিকর।" (আবু দাউদ, মিশকাত)।
-
হাদিসের ব্যাখ্যা: এই হাদিসের মূল উদ্দেশ্য হলো অতিরিক্ত সাজসজ্জা ও বিলাসিতা থেকে বিরত থাকা, যা মানুষের অন্তরকে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত করে তোলে এবং আখিরাতের কথা ভুলিয়ে দেয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ঘর সাজানো সম্পূর্ণ হারাম বা অপছন্দনীয়।
-
সুন্দরভাবে ঘর সাজানো: ইসলামে পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যকে পছন্দ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ সৌন্দর্য পছন্দ করেন।" (মুসলিম)। তাই যদি কেউ পরিমিত খরচে, বৈধ উপায়ে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে ঘর সাজায়, তবে তা জায়েজ এবং প্রশংসনীয়। তবে যদি তা অতিরিক্ত খরচ করে, প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে এবং অহংকারের সাথে করা হয়, তবে তা বিলাসিতা ও অপছন্দনীয়।
-
আপনার দ্বিধার সমাধান: আপনি যদি মনে করেন, আপনার ঘর সাজানো আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া এবং পরিবারের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে, তবে তা জায়েজ। কিন্তু যদি মনে হয়, এটি অহংকার বা প্রতিযোগিতার জন্য হচ্ছে, তবে তা পরিহার করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেও সাধারণ জীবনযাপন করতেন, কিন্তু তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করতেন। তিনি বলেছেন, "যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (মুসলিম)। তাই মূল বিষয় হলো অহংকার ও প্রদর্শনী থেকে বেঁচে থাকা।
৬. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি ফিকহের ইমামগণ (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ) সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতাকে উৎসাহিত করেছেন, তবে বিলাসিতা ও অপচয়কে নিষিদ্ধ করেছেন।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের জন্য সুন্দর পোশাক পরে, এটি তার জন্য প্রশংসনীয়। কিন্তু যে ব্যক্তি অহংকার ও প্রদর্শনীর জন্য পরে, এটি তার জন্য অপছন্দনীয়।"
- ইবনে আবিদীন (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার এ বলেছেন, "ঘর সাজানো বা সুন্দর পোশাক পরা যদি অপচয়ের পর্যায়ে না যায় এবং অহংকারের কারণ না হয়, তবে তা জায়েজ।"
৭. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ
১. পোশাক ও ঘর সাজানো—পরিচ্ছন্ন, শালীন এবং পরিমিত খরচে করা জায়েজ। নতুন পোশাক কেনা বা ঘর সাজানো যদি আপনার সামর্থ্যের মধ্যে হয় এবং তা আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে করেন, তবে তা প্রশংসনীয়।
২. বিলাসিতা—প্রয়োজনের অতিরিক্ত, অহংকার ও প্রদর্শনীর জন্য খরচ করাই বিলাসিতা। এটি পরিহার করা wajib (আবশ্যক)।
৩. ভারসাম্য—দুনিয়ার বৈধ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করুন, তবে আখিরাতের জন্য আমল করতে ভুলবেন না। মনে রাখবেন, দুনিয়া হলো আখিরাতের ক্ষেত। তাই দুনিয়ার প্রতিটি কাজকে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করুন।
৪. নিয়তের গুরুত্ব—প্রতিটি কাজের আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন: "আমি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছি, নাকি মানুষের প্রশংসার জন্য?" নিয়ত শুদ্ধ হলে ইনশাআল্লাহ সবকিছুই ইবাদতে পরিণত হবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।