সূরা ফাতিহায় মাদ (টান) কম পড়লে নামাজ ভঙ্গ হয় কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
সূরা ফাতিহা পড়ার সময় মা-লিকিন ইয়াও মিদ্দীন।
মা তে টান দেই নি মনে হচ্ছিল তবে লাইন শেষ করে আবার রিপিট করি নি। সিওর ছিলাম না আবার পরে ফেলছি আবার সাহু সিজদা দিতে,হবে এইটা মনে হচ্ছিল। এখন দেখলাম ১ আলিফ টান দিতে হতো..
নামাজ কী আবার পড়া লাগবে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি যে, নামাজের মধ্যে কিরাতের (পড়ার) ক্ষেত্রে ছোটখাটো ভুল-ত্রুটি হয়ে গেলে সাধারণত নামাজ ভঙ্গ হয় না, বরং কিছু ক্ষেত্রে সাহু সিজদা (ভুলের সিজদা) দিলেই নামাজ শুদ্ধ হয়ে যায়।
আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ:
আপনি সূরা ফাতিহার আয়াত مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ (মালিকি ইয়াওমিদ্দীন) পড়ার সময় "মা" (مَ)-তে টান (মাদ) দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ আপনি সম্ভবত مَلِكِ (মালিক) এর পরিবর্তে مَالِكِ (মালিক) পড়তে গিয়ে "মা" এর জায়গায় "মা" (ছোট আলিফ) টান না দিয়ে পড়েছেন, অথবা টান দিতে সন্দেহ হয়েছে। পরে আপনি দেখেছেন যে, সেখানে ১ আলিফ (এক মাত্রা) টান দেওয়ার কথা ছিল।
হানাফি মাযহাবের নিয়ম:
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে (যেমন: রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া) উল্লেখ আছে যে, কিরাতে (পড়ায়) যদি কোনো হরফ (অক্ষর) বদলে যায় বা হারাকাত (জবর, জের, পেশ) বদলে যায়, যার কারণে অর্থের পরিবর্তন ঘটে, তাহলে নামাজ ফাসিদ (ভঙ্গ) হয়ে যায়। কিন্তু যদি শুধু মাদ (টান) কম-বেশি হয়, অর্থাৎ হরফ বা হারাকাত ঠিক থাকে, শুধু টানার পরিমাণে ভুল হয়, তাহলে নামাজ ভঙ্গ হয় না।
আপনার ক্ষেত্রে:
- আপনি مَالِكِ (মালিক) পড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু "মা" তে টান দিতে সন্দেহ হয়েছে।
- যদি আপনি مَلِكِ (মালিক) পড়ে থাকেন (অর্থাৎ ছোট আলিফ বাদ পড়ে যায়), তাহলে অর্থ বদলে যায়। مَالِكِ অর্থ "মালিক" এবং مَلِكِ অর্থ "রাজা/বাদশাহ"। উভয় অর্থই আল্লাহ তা'আলার জন্য সঠিক এবং কুরআনে উভয় শব্দই এসেছে (সূরা ফাতিহায় কিরআতে مَالِكِ এবং مَلِكِ দুটোই বিশুদ্ধভাবে পড়া যায়)।
- যেহেতু আপনি পড়ার সময় "মনে হচ্ছিল টান দিইনি" এবং পরে দেখেছেন "১ আলিফ টান দিতে হতো", কিন্তু আপনি লাইন শেষ করে আবার রিপিট করেননি, বরং পরের অংশ পড়ে ফেলেছেন।
হুকুম (সিদ্ধান্ত):
হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, মাদ (টান) কম-বেশি হওয়ার কারণে নামাজ ভঙ্গ হয় না। কারণ মাদ বা টানার পরিমাণ কিরাতের মূল অংশ নয়, বরং এটি তিলাওয়াতের সৌন্দর্য ও বিশুদ্ধতার অংশ। হরফ ও হারাকাত (জবর-জের-পেশ) ঠিক থাকলে নামাজ সহীহ হয়ে যায়।
তবে, যেহেতু আপনি مَالِكِ এর পরিবর্তে مَلِكِ পড়েছেন (যদি টান না দিয়ে থাকেন), এবং উভয় শব্দই কুরআনে আছে এবং অর্থও আল্লাহর জন্য সঠিক, তাই আপনার নামাজ ভঙ্গ হবে না। নামাজ সহীহ হয়ে গেছে।
সাহু সিজদার প্রয়োজন আছে কি?
যেহেতু নামাজ ভঙ্গ হয়নি এবং এটি এমন একটি ভুল যা দ্বারা নামাজ ফাসিদ হয় না, তাই সাহু সিজদা দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। আপনি যে সময় মনে করেছিলেন সাহু সিজদা দিতে হবে, কিন্তু দেননি, সেটিও ঠিক আছে। কারণ এটি এমন ভুল নয় যাতে সাহু সিজদা ওয়াজিব হয়।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
আপনার নামাজ সহীহ হয়েছে, আবার পড়তে হবে না। ইনশাআল্লাহ।
তবে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকবেন। কিরাত পড়ার সময় মাদ (টান) এর দিকে খেয়াল রাখবেন। যদি মনে হয় ভুল হয়েছে, তাহলে সেই আয়াতটি বা শব্দটি পুনরায় সঠিকভাবে পড়ে নেওয়া উত্তম, যতক্ষণ না রুকুতে যান। রুকুতে চলে গেলে আর ফিরে আসা যাবে না (সাহু সিজদা ব্যতীত)।
দলিল (রেফারেন্স):
১. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): কিরাতে মাদ কম-বেশি করলে নামাজ ফাসিদ হয় না, যতক্ষণ না হরফ বা হারাকাত পরিবর্তন হয়। (রদ্দুল মুহতার, ১/৬৩৩) ২. ফাতাওয়া হিন্দিয়া: "যদি কেউ কিরাতে মাদ কম পড়ে বা বেশি পড়ে, তাহলে তার নামাজ ফাসিদ হবে না, যদি হরফের গঠন বা হারাকাত পরিবর্তন না হয়।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৭৮) ৩. ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি): কিরাতে লাহনে খফির কারণে নামাজ ভঙ্গ হয় না, তবে অর্থের পরিবর্তন ঘটালে ভঙ্গ হয়। মাদ কম-বেশি করলে অর্থের পরিবর্তন না ঘটলে নামাজ সহীহ। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৩৪)
সারকথা: আপনার নামাজ সহীহ হয়েছে, পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।