শ্বশুরের সাথে হাত লাগলে কি হয়?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার হাজবেন্ডের অপারেশনের পর ওরে উঠে বসানোর চেষ্টা করছিলাম আমি তখন আমার শশুর সাহায্য করতে আসে। আমি মনে মনে বলছিলাম হাত যেনো না লাগে হাত যেনো না লাগে কিন্তু শেষ পর্যন্ত আব্বুর সঙ্গে আমার হাত লাগে।
পরে আমার শশুর শাশুড়ি কে স্টেশনে রাখতে যাওয়ার সময় আমরা ইজি বাইক/অটো রিকশা নেই। আব্বু ড্রাইভারের পাশে বসে ছিল আর আমি ড্রাইভারের সিটের পিছনে। পরে মনে হয় আব্বু বসে আছে ড্রাইভারের পাশে। এখন আমার মনে হচ্ছে আমি নাকি আব্বু বসে আছে এইটা বুঝার পর ইচ্ছা করে আব্বুর সঙ্গে টাচ করছি। কিন্তু আমিতো হুরমত ব্যাপারে জানি তাহলে আমি এমন কেনো করবো আমি বুঝে পাচ্ছি না। আর কাপড়ের উপর টাচ লাগলে সমস্যা হওয়ার কথা না।
প্ল্যাটফর্মে ব্যাগ রাখা ছিল। ব্যাগ ধরতে যেয়ে আব্বু আর আমার হাত টাচ করে। এর পর আমার হঠাৎ প্রচুর প্রসাবের বেগ পাই যা কিছু সময় পর আবার ঠিক হয়ে যায়। কিত্নু এখন আমার মনে অনেক চিন্তা কাজ করছে। মনে হচ্ছে টাচ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রসাবের বেগ আসছে। মানুষ উত্তেজিত হলে প্রসাবের বেগ আসে। কিভাবে টাচ লাগার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হাত হটাতে পারে।হাত হটানোর আগে প্রসাবের বেগ আসছে। কিন্তু আমার যা মনে হচ্ছে যে আমি হাত হটানোর পর প্রসাবের বেগ আসে। কারণ আমি তখন পড়ছিলাম যে টাচ লাগার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা কাজ করতে হয় পরে কাজ করলে হয় না।কিন্তু ২-২.৫ মাস আগের ঘটনা হওয়ায় আমি ভুলে গেছি।
পরে আবার ট্রেনে উঠে আব্বুর হাতের সঙ্গে টাচ লাগে ব্যাগের জন্য /অন্য কোনো কারণে।
এখন এইসব বিষয় আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। আমি হুরমত ব্যাপারে জানার পর থেকে আমার শ্বশুরের সঙ্গে কথা ও কম বলি। গ্রামে গেলে উনার থেকে দূরে দূরে থাকি। কিন্তু আমার হাজবেন্ডের অপারেশনের জন্য উনাদের স্টেশনের রাখতে যাওয়া লাগছে আর এইসব হয়েছে। আমাকে সঠিক পরামর্শ দিলে উপকৃত হবো।
আমার হাজবেন্ড যদি আমার চুল / চুলের ধরন কে আমার আম্মা,নানীর চুলের ধরনের সঙ্গে তুলনা করে তাহলে কি জিহার হবে?
নামাজে/কুরআন পড়ার সময় সুরা ফাতিহা পড়ার আগে শুধু বিসমিল্লাহ পড়লে হবে? আমার বিসমিল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু পড়ার সময় আমার হাজবেন্ডের কথা মনে হয় শুধু আর নামাজ পড়তে মন চাই না তখন বিরক্ত লাগে।
আমার ফুপু আমাকে জিজ্ঞেস করছিল আমি কয়টা টিউশন করি? আমি আঙুলের সাহায্যে ৩ দেখাইছি।(আমি টিউশন করি না। মিথ্যা বলা লাগছে বাধ্য হয়ে)। পরে মনে হলো একটি দূরে আমার হাজবেন্ড বসে আছে। আমি আঙুলের দেখালমা।দিয়ে আমার ওয়াসওয়াসা আসে।
হাজবেন্ড কে একটা ভিডিও দিয়ে মেসেজ লিখছি দেখো ব্যায়াম(এর ইংলিশ শব্দ প্রথম দুই অক্ষর) লিখে আমার ওয়াসওয়াসা আসছে
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার দীর্ঘ প্রশ্নটি মনোযোগ সহকারে পড়েছি। আপনি অনেকগুলো বিষয়ে জানতে চেয়েছেন এবং কিছু বিষয়ে ওয়াসওয়াসা (মনের খটকা/সন্দেহ) তৈরি হয়েছে। আমরা ধাপে ধাপে প্রতিটি বিষয়ের উত্তর দিচ্ছি, ইনশাআল্লাহ।
১. শ্বশুরের সাথে আকস্মিক স্পর্শ ও হুরমতের বিধান
আপনি লিখেছেন যে, আপনার শ্বশুরের সাথে আপনার হাত লেগেছে। ইসলামী ফিকহের (হানাফি মাযহাব) নিয়ম অনুযায়ী, মহিলার সাথে তার স্থায়ীভাবে হারাম (মাহরাম) সম্পর্কযুক্ত পুরুষদের (যেমন: শ্বশুর, বাবা, ভাই, চাচা) স্পর্শে হুরমত বা বিবাহ হারাম হয় না।
- শ্বশুর (স্বামীর বাবা) আপনার মাহরাম। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তোমাদের স্ত্রীদের মাতা (শাশুড়ি) এবং তোমরা যাদের সাথে সহবাস করেছ তাদের কন্যারা তোমাদের উপর হারাম..." (সূরা আন-নিসা: ২৩)। এই আয়াতের ভিত্তিতে শাশুড়ি ও শ্বশুর (স্বামীর পিতা) চিরকালের জন্য মাহরাম।
- মাহরাম পুরুষের সাথে স্পর্শে (ত্বকের সাথে ত্বক লাগলেও) হুরমত বা বিবাহ হারাম হয় না। এটি কোনো জিহারও নয়। জিহার শুধুমাত্র স্ত্রীকে এমন শব্দ বলার মাধ্যমে হয়, যেমন: "তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো" বা "তুমি আমার মায়ের মতো"।
- আকস্মিক, অনিচ্ছাকৃত বা প্রয়োজনের তাগিদে (যেমন রোগীকে উঠানো) স্পর্শ হয়ে গেলে কোনো গুনাহও নেই। আপনি মনে মনে "হাত যেন না লাগে" বলছিলেন, এটি প্রমাণ করে আপনার নিয়ত ছিল পবিত্র। এটি সম্পূর্ণরূপে অনিচ্ছাকৃত ছিল। তাই এতে কোনো সমস্যা নেই, কোনো গুনাহ নেই, এবং আপনার বিবাহের উপর কোনো প্রভাব পড়বে না।
আপনার দ্বিতীয় প্রশ্ন: "টাচ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রসাবের বেগ আসা" এটি সম্পূর্ণ ওয়াসওয়াসা (শয়তানের প্ররোচনা)। উত্তেজনা বা ভয়ের কারণে প্রস্রাবের বেগ আসতে পারে, কিন্তু এটি কোনো ফিকহি (আইনগত) সমস্যা নয়। আপনি যখনই এই ধরনের চিন্তা করবেন, শয়তান আপনার মনে এই সন্দেহ ঢুকিয়ে দেবে যে "টাচের কারণে বেগ এসেছে"।
- ফিকহের নিয়ম: কোনো ব্যক্তির শরীর থেকে বের হওয়া জিনিস (পেশাব, পায়খানা, বায়ু) সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তা অপবিত্র (নাপাক) বলে গণ্য হবে না। শুধু সন্দেহ বা মনের খটকা থাকলে নামাজ ভঙ্গ হবে না। (ফতোয়া আলমগীরী, ১/১৪)
- আপনি যদি নিশ্চিত না হন যে পেশাব বের হয়েছে, তাহলে আপনার নামাজ, পবিত্রতা সবকিছুই ঠিক আছে। এই ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য এই নিয়মটি মনে রাখুন: "যতক্ষণ না চোখে দেখা যায় বা গন্ধ পাওয়া যায় বা নিশ্চিতভাবে জানা যায়, ততক্ষণ পবিত্রতাই মূল।" (সহীহ বুখারী, হাদিস: ১৩৭)
২. স্বামীর সাথে চুলের তুলনা করা কি জিহার?
আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, স্বামী যদি আপনার চুলের সাথে আপনার আম্মা বা নানীর চুলের তুলনা করে, তাহলে কি জিহার হবে?
- উত্তর: না, এটি জিহার হবে না। জিহার শুধুমাত্র তখনই হয় যখন স্বামী স্ত্রীকে বলে, "তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো" বা "তুমি আমার মায়ের মতো" (অর্থাৎ শরীরের এমন অঙ্গ যা দেখা সাধারণত হারাম এবং যা দ্বারা সহবাস বোঝানো হয়)।
- শুধুমাত্র চুল, হাত, পা বা চেহারার সাথে তুলনা করলে জিহার হয় না। (রদ্দুল মুহতার, ৪/৫১৩; ফতোয়া হিন্দিয়া, ২/৫৪০)। তাই এই বিষয়ে আপনার চিন্তার কোনো কারণ নেই।
৩. নামাজে সূরা ফাতিহার আগে শুধু বিসমিল্লাহ পড়া
- হ্যাঁ, জায়েজ আছে। নামাজে সূরা ফাতিহা পড়ার আগে "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" পড়া সুন্নত। এরপর সূরা ফাতিহা পড়া ফরজ। আপনি যদি শুধু বিসমিল্লাহ পড়ে সূরা ফাতিহা পড়েন, তাহলে আপনার নামাজ সহীহ হবে।
- তবে মনে রাখবেন, সূরা ফাতিহা পড়া ফরজ। বিসমিল্লাহ পড়া তার আগে একটি সুন্নত অংশ। তাই বিসমিল্লাহ পড়ে অবশ্যই সূরা ফাতিহা পড়তে হবে। (আল-হিদায়া, ১/৪৬)
৪. নামাজে মনোযোগ ও স্বামীর কথা মনে পড়া
নামাজে বা কুরআন পড়ার সময় স্বামীর কথা মনে পড়া এবং মনোযোগ নষ্ট হওয়া একটি সাধারণ সমস্যা। এটি গুনাহ নয়, তবে নামাজের সওয়াব কমে যায়।
- সমাধান: নামাজে দাঁড়ানোর আগে দুনিয়ার সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করুন। মনে মনে এতেকাফের নিয়ত করুন। শয়তান যখনই নামাজে এসব কথা মনে করাবে, তখন "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন এবং সিজদায় গিয়ে বেশি বেশি "সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা" পড়ুন। ধীরে ধীরে মনোযোগ বাড়বে। এটি কোনো ফিকহি সমস্যা নয়, এটি একটি মানসিক ও আত্মিক প্রশিক্ষণের বিষয়।
৫. টিউশন সম্পর্কে মিথ্যা বলা ও ওয়াসওয়াসা
আপনার ফুপুকে টিউশন করার সংখ্যা জিজ্ঞেস করায় আপনি মিথ্যা বলেছেন (৩ দেখিয়েছেন)। এটি একটি গুনাহ। আপনার উচিত আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং ভবিষ্যতে সত্য বলা। তবে এই মিথ্যা বলার কারণে আপনার নামাজ, রোজা বা বিবাহের উপর কোনো প্রভাব পড়বে না।
- ওয়াসওয়াসা: "আঙুলের ইশারায় ৩ দেখানো" বা "ব্যায়াম (EX)" লেখার কারণে আপনার মনে যে ওয়াসওয়াসা আসছে, এটি সম্পূর্ণ শয়তানের কাজ। এর কোনো ভিত্তি নেই। ইশারা বা লেখার মাধ্যমে কোনো হারাম কাজ হয় না। আপনি এই বিষয়ে কোনো গুরুত্ব দেবেন না।
৬. শ্বশুরের সাথে কথা কম বলা ও দূরত্ব বজায় রাখা
আপনি হুরমতের কথা জেনে শ্বশুরের সাথে কম কথা বলা এবং দূরত্ব বজায় রাখাকে সঠিক মনে করছেন। এটি ভুল ধারণা। শ্বশুর আপনার মাহরাম। মাহরামের সাথে কথা বলা, প্রয়োজনে সাহায্য করা, সেবা করা ইসলামে সম্পূর্ণ জায়েজ এবং সওয়াবের কাজ।
- আপনি যদি মনে করেন শ্বশুর মাহরাম নন, তাহলে এটি ভুল। শ্বশুর চিরকালের জন্য মাহরাম। তাই আপনি স্বাভাবিকভাবে, শালীনতা বজায় রেখে, প্রয়োজনে তার সাথে কথা বলতে পারেন এবং সাহায্য করতে পারেন। এতে কোনো গুনাহ নেই। বরং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা গুনাহ। (সূরা আন-নিসা: ২৩)
৭. হাজবেন্ডের অপারেশন ও স্টেশনে যাওয়ার ঘটনা
আপনার হাজবেন্ডের অপারেশনের সময় শ্বশুর সাহায্য করতে এসে হাত লেগেছে এবং স্টেশনে যাওয়ার সময় ব্যাগ ধরতে গিয়ে হাত লেগেছে। এই সবগুলোই আকস্মিক, অনিচ্ছাকৃত এবং প্রয়োজনের তাগিদে ঘটেছে। ইসলামে এমন আকস্মিক স্পর্শে কোনো গুনাহ নেই। আপনি যেহেতু নিয়ত করেননি, তাই আপনি সম্পূর্ণ পবিত্র।
সারসংক্ষেপ:
- শ্বশুর মাহরাম, তাই তার সাথে স্পর্শে হুরমত বা বিবাহ হারাম হয় না।
- জিহার শুধুমাত্র নির্দিষ্ট শব্দে হয়, চুলের তুলনায় নয়।
- আকস্মিক স্পর্শে কোনো গুনাহ নেই।
- প্রসাবের বেগের সন্দেহ ওয়াসওয়াসা, পবিত্রতাই মূল।
- নামাজে শুধু বিসমিল্লাহ পড়ে ফাতিহা পড়া জায়েজ।
- মিথ্যা বলার জন্য তওবা করুন, তবে এতে বিবাহের কোনো ক্ষতি নেই।
আপনার জন্য পরামর্শ: আপনি একজন ধার্মিক ও সচেতন মুসলিম মহিলা। শয়তান আপনাকে ওয়াসওয়াসায় ফেলে মানসিকভাবে কষ্ট দিচ্ছে। এই ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য: ১. "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" বেশি বেশি পড়ুন। ২. প্রতিদিন নামাজের পর "আয়াতুল কুরসি" পড়ুন। ৩. এই বিষয়গুলো নিয়ে আর চিন্তা করবেন না। যেহেতু ফিকহের দৃষ্টিতে সবকিছু বৈধ, তাই আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। ৪. প্রয়োজনে একজন আলেমের সাথে সরাসরি কথা বলুন, ইনশাআল্লাহ আপনার মন সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে যাবে।
আল্লাহ তাআলা আপনার মন থেকে সব ওয়াসওয়াসা দূর করুন এবং আপনার পরিবারে শান্তি বজায় রাখুন। আমিন।