পড়া মনে রাখার আমল
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি আগে অনেক ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম। সব সময় ভালো করতাম পড়াশোনায়। দ্বীনি পড়াশুনা তেও ভালো ছিলাম । এখন কেন জানি কোনো পড়া মুখস্থ করতে অনেক সময় লাগে। মনোযোগ ধরে রাখতে পারি না। এমন পড়া যেগুলো বুঝে পড়তে হয় সেগুলো বুঝতেও অনেক সময় লাগে। মনে থাকে না কিছু।
প্রশ্ন: কোনো আমল আছে কি? পড়াশুনা আবার যেন আগের মতো করতে পারি।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্ন করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া এবং মুখস্থ করতে সমস্যা হওয়া একটি সাধারণ সমস্যা, যা অনেক শিক্ষার্থীরই হয়ে থাকে। এটি নিয়ে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ইসলামী পদ্ধতিতে এর কিছু কার্যকর সমাধান রয়েছে।
আপনার সমস্যার সমাধানে নিম্নোক্ত আমলগুলো নিয়মিত করার চেষ্টা করুন, ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুতই উপকার পাবেন।
১. দোয়া ও যিকির
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পড়াশোনার শুরুতে এবং কঠিন বিষয় বুঝতে নিম্নোক্ত দোয়াগুলো পড়তে বলেছেন:
-
পড়া শুরুর দোয়া:
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ، اَللّٰهُمَّ افْتَحْ عَلَيَّ فُتُوْحَ الْعَارِفِيْنَ উচ্চারণ: "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আল্লাহুম্মাফতাহ আলাইয়্যা ফুতুহাল আরিফিন।" অর্থ: "শুরু করছি আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু। হে আল্লাহ! আমার জন্য জ্ঞানীদের জ্ঞানের দরজাসমূহ খুলে দিন।"
-
জ্ঞান বৃদ্ধির দোয়া (কুরআনের আয়াত):
رَبِّ زِدْنِيْ عِلْمًا উচ্চারণ: "রাব্বি যিদনী ইলমা।" অর্থ: "হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।" (সূরা ত্বহা: ১১৪)
-
বোধশক্তি ও স্মরণশক্তি বৃদ্ধির দোয়া:
اَللّٰهُمَّ اجْعَلْ قَلْبِيْ نُوْرًا وَبَصَرِيْ نُوْرًا وَسَمْعِيْ نُوْرًا উচ্চারণ: "আল্লাহুম্মাজ'আল কালবী নূরান, ওয়া বাসারী নূরান, ওয়া সাম'ঈ নূরান।" অর্থ: "হে আল্লাহ! আমার অন্তরকে আলোকিত করুন, আমার দৃষ্টিকে আলোকিত করুন, আমার শ্রবণশক্তিকে আলোকিত করুন।"
২. নামাজের পরের আমল
প্রতিটি ফরজ নামাজের পর নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়ার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এটি স্মরণশক্তি ও বোধশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক:
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيْمِ، اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ بِحَقِّ مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ أَنْ تُوْفِقَنِيْ لِمَا يُرْضِيْكَ উচ্চারণ: "সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম। আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা বিহাক্কি মুহাম্মাদিন ওয়া আ-লি মুহাম্মাদিন আন তুওয়াফফিক্বনী লিমা ইয়ারযীক্বা।" অর্থ: "আল্লাহ পবিত্র ও তাঁর প্রশংসা সহকারে। মহান আল্লাহ পবিত্র। হে আল্লাহ! আমি মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পরিবারের উসিলায় আপনার কাছে প্রার্থনা করছি, আপনি আমাকে এমন বিষয়ে তাওফিক দিন যা আপনার সন্তুষ্টি লাভের উপায়।"
৩. গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ম ও পরামর্শ
শুধু আমলই নয়, কিছু ব্যবহারিক নিয়ম মেনে চললেও পড়াশোনায় মনোযোগ ফিরে আসবে:
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি যত্নবান হোন: নামাজের মাধ্যমে অন্তরের প্রশান্তি লাভ হয়, যা মনোযোগ বৃদ্ধিতে সহায়ক। আল্লাহ তাআলা বলেন, "জেনে রাখো, আল্লাহর যিকিরেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।" (সূরা রাদ: ২৮)
- তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ুন: ফজরের আগে উঠে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এই সময়ে পড়া মুখস্থ করতে খুবই কার্যকর।
- গুনাহ থেকে বেঁচে থাকুন: গুনাহের কারণে অন্তরে অন্ধকার সৃষ্টি হয়, যা জ্ঞান অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।
- পরিমিত খাবার গ্রহণ করুন: অতিরিক্ত খাবার খেলে শরীর ভারী হয় এবং ঘুম ঘুম ভাব আসে, যা পড়াশোনায় মনোযোগ কমিয়ে দেয়।
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন: রাতে ৬-৮ ঘণ্টা ঘুমানো জরুরি। ঘুম কম হলে মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ করে না।
- পড়ার সময় নির্দিষ্ট করুন: ফজরের পর বা অন্য কোনো সময় নির্ধারণ করুন। এই সময়গুলোতে মনোযোগ সবচেয়ে ভালো থাকে।
- বুঝে পড়ার চেষ্টা করুন: শুধু মুখস্থ না করে অর্থ বুঝে পড়ার চেষ্টা করুন। অর্থ বুঝলে মনে রাখতে সহজ হয়।
- বিরতি নিয়ে পড়ুন: একটানা অনেকক্ষণ না পড়ে ২৫-৩০ মিনিট পড়ে ৫ মিনিট বিরতি নিন। এতে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হবে।
- আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন: গুনাহ মাফের পাশাপাশি ইস্তিগফার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, যা জ্ঞান অর্জনে সহায়ক।
৪. একটি বিশেষ আমল
হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়বে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর তৈরি করবেন এবং তার স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করবেন:
اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَصْبَحْتُ أُشْهِدُكَ وَأُشْهِدُ حَمَلَةَ عَرْشِكَ وَمَلَائِكَتَكَ وَجَمِيْعَ خَلْقِكَ أَنَّكَ أَنْتَ اللهُ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ وَحْدَكَ لَا شَرِيْكَ لَكَ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُكَ وَرَسُوْلُكَ উচ্চারণ: "আল্লাহুম্মা ইন্নী আসবাহতু উশহিদুকা ওয়া উশহিদু হামালাতা আরশিকা ওয়া মালাইকাতাকা ওয়া জামী'আ খলকিকা আন্নাকা আনতাল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা আন্তা ওয়াহদাকা লা শারিকা লাকা ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুকা ওয়া রাসূলুক।" অর্থ: "হে আল্লাহ! আমি সকালে উপনীত হয়েছি (সন্ধ্যায় বলবেন: আমি সন্ধ্যায় উপনীত হয়েছি) এবং আপনাকে সাক্ষী করছি, আপনার আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের, আপনার ফেরেশতাদের এবং আপনার সকল সৃষ্টিকে সাক্ষী করছি যে, আপনিই আল্লাহ, আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি একক, আপনার কোনো শরিক নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আপনার বান্দা ও রাসূল।"
মনে রাখবেন: ধৈর্য ধরুন এবং নিয়মিত আমল চালিয়ে যান। হঠাৎ করে ফল না পেলে হতাশ হবেন না। আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। আপনার জন্য দোয়া করছি, আল্লাহ তাআলা আপনাকে আবারও আগের মতো পড়াশোনায় সফলতা দান করুন। আমিন।