এক বোনের ডেট অনুযায়ী পিরিয়ড হয়েছে কিন্তু ব্লাড ভাঙ্গেনি।হালকা দাগ আর মাঝেমধ্যে একটু দেখা যা

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 4660
Questioner: Samien Ibna rahamat
Question Asked: 31 Aug 2026, 04:49 AM
Reviewed & Published: 31 Aug 2026, 05:22 AM
Views: 10
Tokens: 4,517
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

এক বোনের ডেট অনুযায়ী পিরিয়ড হয়েছে কিন্তু ব্লাড ভাঙ্গেনি।
হালকা দাগ আর মাঝেমধ্যে একটু দেখা যায়। তিনদিন যাবত এমন। আগে এমন হয়নি।
সেক্ষেত্রে কি নামাজ পড়তে পারবে? এরকম প্রায় দুই/ তিনদিন যাবত হচ্ছে। দিনে এক দুইবার দেখা যাচ্ছে আবার সারাদিন ভালো।।
উনার নামাজ পড়ার হুকুম কি?? পড়লে কিভাবে পড়বে?? না পড়লে কতদিন যাবত পড়বে না??

Answer

উত্তরের সূচনা

প্রশ্নকারী বোনের জন্য দোয়া ও সহমর্মিতা জানিয়ে শুরু করছি। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। আসুন আমরা কুরআন, হাদিস এবং হানাফি মাযহাবের আলোকে এই বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নিই।


সংক্ষিপ্ত উত্তর

যদি ডেট অনুযায়ী পিরিয়ডের সময় হয় এবং রক্তের দাগ দেখা যায়, তবে তা হায়েজ (মাসিক) হিসেবে গণ্য হবে। এই অবস্থায় নামাজ, রোজা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে শর্ত হলো, রক্তের দাগ কমপক্ষে তিন দিন (৭২ ঘণ্টা) অব্যাহত থাকতে হবে। আপনার বোনের ক্ষেত্রে তিন দিন যাবত দাগ যাচ্ছে, তাই এটি হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে এবং তিনি নামাজ পড়বেন না।


বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. হায়েজের সংজ্ঞা ও ন্যূনতম সময়সীমা

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী হায়েজের ন্যূনতম সময়সীমা হলো তিন দিন (৩ দিন) এবং তিন রাত অর্থাৎ ৭২ ঘণ্টা। এর কম সময়ের রক্ত হায়েজ হিসেবে গণ্য হয় না, বরং তা ইস্তিহাজা (অস্বাভাবিক রক্তস্রাব) হিসেবে গণ্য হবে।

قال الإمام أبو حنيفة: أقل الحيض ثلاثة أيام وثلاث ليال

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: হায়েজের ন্যূনতম সময়সীমা হলো তিন দিন ও তিন রাত।

(বাদায়েউস সানায়ে, ১/৩৮; আল-হিদায়া, ১/৩০)

আল-হিদায়ায় উল্লেখ আছে:

وأقل الحيض ثلاثة أيام وثلاث ليال

হায়েজের ন্যূনতম সময়সীমা হলো তিন দিন ও তিন রাত।

(আল-হিদায়া, ১/৩০)

২. রক্তের রং ও প্রকৃতি

আপনার বোনের ক্ষেত্রে "হালকা দাগ" বা "মাঝেমধ্যে একটু দেখা যাওয়া" — এটি রক্ত হিসেবে গণ্য হবে। হানাফি মাযহাবে হায়েজের রক্তের রং সাধারণত কালো, গাঢ় লাল, হলুদ বা মাটি রঙের হতে পারে। তবে হলুদ বা মাটি রঙের স্রাবও হায়েজের সময়ে হায়েজ হিসেবে গণ্য হয়

عن أم عطية رضي الله عنها قالت: كنا لا نعد الكدرة والصفرة بعد الطهر شيئًا

উম্মে আতিয়্যা (রা.) থেকে বর্ণিত: আমরা পবিত্র হওয়ার পর হলুদ ও মাটি রঙের স্রাবকে কিছুই গণ্য করতাম না।

(সুনানে আবু দাউদ, ১/৮৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, ১/২০৬)

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ফুকাহায়ে কেরাম বলেন: পবিত্র অবস্থায় হলুদ বা মাটি রঙের স্রাব হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে না। কিন্তু হায়েজের সময়ে (অর্থাৎ যে সময়ে পিরিয়ড হওয়ার কথা) হলুদ বা মাটি রঙের স্রাবও হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে।

قال العلامة ابن عابدين: والكدرة والصفرة في زمن الحيض حيض

আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: হায়েজের সময়ে হলুদ ও মাটি রঙের স্রাবও হায়েজ হিসেবে গণ্য।

(রদ্দুল মুহতার, ১/২৯০)

৩. আপনার বোনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান

আপনার বোনের ক্ষেত্রে:

  • ডেট অনুযায়ী পিরিয়ডের সময় হয়েছে
  • হালকা দাগ এবং মাঝেমধ্যে রক্ত দেখা যাচ্ছে
  • তিন দিন যাবত এমন হচ্ছে
  • আগে এমন হয়নি

যেহেতু এটি ডেট অনুযায়ী পিরিয়ডের সময় এবং তিন দিন যাবত রক্তের দাগ যাচ্ছে, তাই এটি হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে। কারণ:

১. এটি পিরিয়ডের নির্ধারিত সময়ে হচ্ছে ২. তিন দিন (৭২ ঘণ্টা) পূর্ণ হয়েছে ৩. রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছে (যদিও হালকা)

قال العلامة ابن عابدين: إذا رأت الدم في زمن العادة فهو حيض ما لم يتجاوز أكثر الحيض

আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: যদি নির্ধারিত সময়ে রক্ত দেখে, তবে তা হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে, যতক্ষণ না তা সর্বোচ্চ সময়সীমা (১০ দিন) অতিক্রম করে।

(রদ্দুল মুহতার, ১/২৮৫)

৪. নামাজের বিধান

যেহেতু এটি হায়েজ হিসেবে গণ্য হচ্ছে, তাই নামাজ পড়া যাবে না। হায়েজ অবস্থায় নামাজ, রোজা, তাওয়াফ ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা ফরজ।

قال الله تعالى: وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ ۖ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ

আল্লাহ তাআলা বলেন: আর তারা আপনাকে হায়েজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, তা অশুচি। সুতরাং তোমরা হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকো।

(সূরা আল-বাকারা: ২২২)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

أَلَيْسَ إِذَا حَاضَتْ لَمْ تُصَلِّ وَلَمْ تَصُمْ

যখন নারীর হায়েজ হয়, তখন সে কি নামাজ পড়ে না এবং রোজা রাখে না?

(সহিহ বুখারী, ১/৬৩; সহিহ মুসলিম, ১/১৮৩)

৫. কতদিন নামাজ পড়বে না?

হায়েজের সর্বোচ্চ সময়সীমা হানাফি মাযহাবে ১০ দিন। এর মধ্যে রক্ত বন্ধ হয়ে গেলে গোসল করে নামাজ শুরু করবে। যদি ১০ দিনের বেশি রক্ত চলতে থাকে, তবে তা ইস্তিহাজা (অস্বাভাবিক রক্তস্রাব) হিসেবে গণ্য হবে এবং তখন নামাজ পড়তে হবে।

قال الإمام أبو حنيفة: أكثر الحيض عشرة أيام

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: হায়েজের সর্বোচ্চ সময়সীমা ১০ দিন।

(আল-হিদায়া, ১/৩০; বাদায়েউস সানায়ে, ১/৩৮)

আপনার বোনের ক্ষেত্রে:

  • যদি ১০ দিনের মধ্যে রক্ত বন্ধ হয়ে যায়, তবে গোসল করে নামাজ শুরু করবে
  • যদি ১০ দিনের বেশি রক্ত চলতে থাকে, তবে ১০ দিনই হায়েজ গণ্য হবে এবং এরপর ইস্তিহাজা হিসেবে নামাজ পড়তে হবে

৬. গুরুত্বপূর্ণ নোট

১. রক্ত বন্ধ হওয়ার পর: রক্ত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে (শুকনো বা সাদা স্রাব দেখা গেলে) গোসল করে নামাজ শুরু করবে। রক্ত বন্ধ হওয়ার পর গোসল করা ফরজ।

২. মাঝে মাঝে বন্ধ হলে: যদি একদিন রক্ত যায়, একদিন বন্ধ থাকে, আবার যায় — তবে যতদিন রক্ত যাচ্ছে ততদিন হায়েজ চলবে, তবে মোট ১০ দিনের বেশি নয়।

৩. ইস্তিহাজার ক্ষেত্রে: যদি ১০ দিনের বেশি রক্ত চলে, তবে ১০ দিন হায়েজ গণ্য হবে এবং বাকি দিনগুলোতে ইস্তিহাজার বিধান প্রযোজ্য হবে। ইস্তিহাজার ক্ষেত্রে নামাজ পড়তে হবে এবং প্রতিটি নামাজের জন্য নতুন ওযু করতে হবে।


উপসংহার

আপনার বোনের ক্ষেত্রে যেহেতু ডেট অনুযায়ী পিরিয়ডের সময় এবং তিন দিন যাবত রক্তের দাগ যাচ্ছে, তাই এটি হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে। তিনি নামাজ পড়বেন না। রক্ত বন্ধ হয়ে গেলে গোসল করে নামাজ শুরু করবেন। যদি ১০ দিনের বেশি রক্ত চলে, তবে ১০ দিনের পর থেকে নামাজ পড়তে হবে (ইস্তিহাজার বিধান অনুযায়ী)।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।


রেফারেন্সসমূহ

  1. আল-কুরআন: সূরা আল-বাকারা: ২২২
  2. সহিহ বুখারী: ১/৬৩
  3. সহিহ মুসলিম: ১/১৮৩
  4. সুনানে আবু দাউদ: ১/৮৩
  5. সুনানে ইবনে মাজাহ: ১/২০৬
  6. আল-হিদায়া: ১/৩০
  7. বাদায়েউস সানায়ে: ১/৩৮
  8. রদ্দুল মুহতার: ১/২৮৫, ১/২৯০
  9. ফাতাওয়া আলমগীরি: ১/৩৬-৩৭
  10. বেহেশতী জেওর: ১/৮০-৮৫


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.