পুত্রের টাকা দিয়ে বাবা নিজের নামে জমি ক্রয় করে নিলে পরবর্তীতে করণীয় কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 4655
Questioner: Faheema Harun
Question Asked: 31 Aug 2026, 12:15 AM
Reviewed & Published: 31 Aug 2026, 01:18 AM
Views: 36
Tokens: 6,757
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমার বাবা দীর্ঘদিন হয় প্রবাসী হিসেবে সৌদি আছেন। আমার জন্মের পর গ্রামে কিছু জায়গা রাখার জন্য বাবা আমার দাদার কাছে টাকা পাঠান। আমার দাদা না জানিয়ে ওই জায়গায় নিজের নাম সহ আমার বাবার নামে রাখেন। তখন আমরা স্বপরিবার সৌদি থাকতাম। যে কারণে দেশে আসার পর যখন এই বিষয়ে জানা হয় এরপর থেকে বাবা নিজেই সব জায়গায় কিনেন। এবং দেশে আসলে এর একটা সমাধান করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আমার দাদা এর কয়েক বছরের মধ্যেই স্ট্রোক করে মারা যান। আমার দাদা অনুমতি ছাড়াই জায়গার মালিক হয়ে যান এবং যে কারণে মৃত্যুর পর উনার ওয়ারিস হিসাবে আমার ফুফু, দাদু, কাকা সবাই সম্পত্তির ভাগ পাবেন। আমার ফুফুরা জানেন আমার দাদা এর হকদার না, উনারা নিজ ইচ্ছায় ভাগ নিবেন না বলে দেন। তবে আমার বড় কাকা বলেছেন উনাকে পুরো অর্ধেক সম্পত্তি ভাগ করে দিয়ে দিতে হবে৷ আমার বাবা দীর্ঘদিন প্রবাসী হওয়ায় অনেক অসুস্থ, ঋণগ্রস্থ। এখন আমার বাবা যদি কাউকে সম্পত্তির ভাগ না দিয়ে নিজেই সবটুকু রাখেন, যেহেতু আগেও বলা হয়েছে আমার দাদা না জানিয়ে এমনটা করেছেন। সে ক্ষেত্রে আমার বাবা কি গুনাহগার হবেন? আমার বাবা হজ্জ করেছেন এবং এই বিষয়ে ভয় পান। যে কারণে জায়গা, সম্পত্তি বেচতেও ভয় পাচ্ছেন। যদি আমার বাবা আসলেই পুরোটার মালিক হয়ে থাকেন এবং ভাগ না দিলে কাকা যদি এই ব্যাপারে খারাপ আচরণ করেন। উনাকে কিভাবে বুঝানো যেতে পারে? বলে রাখা ভালো আমার কাকা আর্থিকভাবে আলহামদুলিল্লাহ অনেক সচ্ছল৷ তবে শুধুমাত্র দাদার হিসাবে উনি সম্পত্তির ভাগ পাবে দেখে ছাড়তে চাচ্ছেন না।

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আপনার প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, পরিস্থিতিটি কিছুটা জটিল, তবে ইসলামী আইন (ফিকহ) অনুযায়ী এর সমাধান স্পষ্ট। নিচে ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ ও উত্তর দেওয়া হলো:

১. জায়গার বৈধ মালিক কে?

আপনার বাবা তার অর্থ (টাকা) পাঠিয়েছিলেন জমি কেনার জন্য, এবং আপনার দাদা সেই টাকায় জমি কিনে নিজের নামে রেখেছিলেন। শরীয়তের দৃষ্টিতে, যে ব্যক্তি অর্থ প্রদান করে জমি ক্রয় করে, সেই জমির প্রকৃত মালিক সে-ই হবে, যদি না সে উপহার (হিবা) হিসেবে তা কাউকে দিয়ে দেয়।

  • মালিকানা নির্ধারণের নীতি: ইসলামী ফিকহে (বিশেষত হানাফি মাযহাবে) মালিকানা নির্ধারিত হয় ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি এবং অর্থ প্রদানের ভিত্তিতে। যেহেতু জমি কেনার টাকা আপনার বাবা দিয়েছিলেন, তাই জমির প্রকৃত মালিক আপনার বাবা। আপনার দাদা শুধুমাত্র একজন প্রতিনিধি (ওয়াকিল) হিসেবে কাজ করেছেন, যদিও তিনি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করেছেন।
  • দাদার কাজটি কী ছিল? আপনার দাদা আপনার বাবার টাকায় জমি কিনে নিজের নামে রেখে একটি খিয়ানত (আমানতের খিয়ানত/বিশ্বাসভঙ্গ) করেছেন। এটি একটি গুনাহের কাজ ছিল, তবে এর ফলে জমির মালিকানা আপনার দাদার কাছে স্থানান্তরিত হয়নি। মালিকানা আপনার বাবার কাছেই থেকে গেছে।

সুতরাং, আপনার বাবা এই জমির প্রকৃত এবং বৈধ মালিক।

২. দাদার মৃত্যুর পর ওয়ারিসদের (উত্তরাধিকারীদের) অধিকার

যেহেতু জমির মালিক আপনার বাবা, তাই আপনার দাদার মৃত্যুর পর এই জমি তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি (ওসিয়ত/উত্তরাধিকার) হিসেবে গণ্য হবে না। ফলে আপনার ফুফু, দাদু, কাকা বা অন্য কেউই শরীয়তের আইনে এই জমির ওয়ারিস হিসেবে কোনো অংশ পাবেন না। এটি সম্পূর্ণ আপনার বাবার সম্পত্তি।

  • আপনার কাকার দাবি: আপনার কাকা যে বলেছেন "উনাকে পুরো অর্ধেক সম্পত্তি ভাগ করে দিতে হবে" — এটি শরীয়তসম্মত নয়। যেহেতু জমিটি আপনার দাদার সম্পত্তি নয়, তাই তিনি (কাকা) এর কোনো অংশের দাবিদার নন। তার এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

৩. আপনার বাবার করণীয় ও গুনাহের প্রশ্ন

যেহেতু জমির মালিক আপনার বাবা, তাই তিনি যদি কাউকে ভাগ না দিয়ে নিজে রেখে দেন, তবে তিনি গুনাহগার হবেন না। বরং তিনি তার নিজের সম্পত্তির পূর্ণ মালিক এবং তার ইচ্ছামতো তা ব্যবহার বা বিক্রি করতে পারবেন।

  • দাদার গুনাহ: আপনার দাদা যে কাজটি করেছেন (অনুমতি ছাড়া নিজের নামে রেখে দেওয়া) তা ছিল গুনাহের কাজ। কিন্তু আপনার বাবার উপর এর কোনো প্রভাব নেই। আপনার বাবা যদি এই বিষয়টি নিয়ে ভয় পান, তবে তাকে বুঝিয়ে বলা উচিত যে, তিনি প্রকৃত মালিক, তাই তার কোনো গুনাহ নেই। বরং তিনি যদি চান, দাদার এই খিয়ানতের কারণে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাই তিনি নিজের সম্পত্তি ফেরত নিতে পারেন।

৪. কাকাকে বোঝানোর উপায়

আপনার কাকা আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং শুধুমাত্র দাদার ওয়ারিস হিসেবে ভাগ পেতে চাচ্ছেন। তাকে বোঝানোর জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বলা যেতে পারে:

১. প্রমাণ উপস্থাপন: তাকে বোঝান যে, জমি কেনার টাকা আপনার বাবা পাঠিয়েছিলেন। যদি সম্ভব হয়, টাকা পাঠানোর রেকর্ড (ব্যাংক ট্রান্সফার, রসিদ ইত্যাদি) দেখান। এটি সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ। ২. শরীয়তের আইন: তাকে বুঝান যে, ইসলামী আইনে মালিকানা নির্ধারিত হয় অর্থ প্রদানকারীর ভিত্তিতে। যেহেতু টাকা আপনার বাবা দিয়েছেন, তাই জমির মালিক আপনার বাবা। দাদার নামে রেজিস্ট্রি করা একটি ভুল ছিল, যা শরীয়তে সমর্থনযোগ্য নয়। ৩. পারিবারিক সম্পর্ক: তাকে বোঝান যে, এই জিনিসটি নিয়ে ঝগড়া বা মনোমালিন্য করা উচিত নয়। যেহেতু তিনি আর্থিকভাবে সচ্ছল, তাই তার উচিত ভাইয়ের (আপনার বাবার) অসুস্থতা ও ঋণগ্রস্ততার কথা চিন্তা করে তাকে সাহায্য করা, বরং তার সম্পত্তি দাবি করা নয়। ৪. ভয় দেখানো নয়, বোঝানো: তাকে হুমকি বা ভয় দেখানো যাবে না, বরং কুরআন-হাদিসের আলোকে বোঝাতে হবে যে, কারো সম্পত্তি অন্যায়ভাবে ভোগ করা হারাম এবং এর জন্য আখিরাতে কঠিন জবাবদিহি করতে হবে।

৫. চূড়ান্ত সমাধান ও পরামর্শ

  • আইনি পদক্ষেপ: যেহেতু আপনার দাদা মারা গেছেন, তাই জমির মালিকানা আপনার বাবার নামে আনতে হলে আদালতের মাধ্যমে বা পারিবারিক সমঝোতার মাধ্যমে নামজারি (রেজিস্ট্রি) করতে হবে। আপনার বাবা দেশে এলে তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় নিজের নামে জমি রেজিস্ট্রি করিয়ে নেযার চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
  • পারিবারিক সমঝোতা: যদি সম্ভব হয়, পরিবারের সবার সাথে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা উচিত। আপনার ফুফুরা ইতিমধ্যে সম্মতি দিয়েছেন যে তারা ভাগ নেবেন না। আপনার কাকাকে বোঝানোই মূল চ্যালেঞ্জ। তাকে বোঝান যে, এটি দাদার সম্পত্তি নয়, তাই তার কোনো অংশ নেই।
  • বিক্রয়ের ক্ষেত্রে: আপনার বাবা জমি বিক্রি করতে চাইলে তিনি তা করতে পারবেন, কারণ তিনি মালিক। তবে বিক্রির আগে আইনগতভাবে নিজের নামে রেজিস্ট্রি করিয়ে নিতে হবে।

সংক্ষিপ্ত উত্তর: আপনার বাবা এই জমির প্রকৃত মালিক। তিনি কাউকে ভাগ না দিলে গুনাহগার হবেন না। আপনার কাকার দাবি শরীয়তসম্মত নয়। তাকে বোঝানোর জন্য ধৈর্য ধরে প্রমাণ ও ইসলামী আইনের কথা বলা উচিত।

আল্লাহ তায়ালা আপনার বাবাকে সুস্থতা দান করুন এবং এই বিষয়টি সহজ করে দিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.