বর্ণিত পরিস্থিতি কি হ্যালুসিনেশন?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 4650
Questioner: Smity Smity
Question Asked: 30 Aug 2026, 10:45 PM
Reviewed & Published: 31 Aug 2026, 01:13 AM
Views: 21
Tokens: 11,174
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমি ভয়ংকর জ্বিন এবং কালোজাদু তে আক্রান্ত। দীর্ঘ দুইমাস যাবত রুকইয়াহ করছি। কিন্তু রুকইয়াহ চলাকালীন আমার সাথে কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। যেমন আমি খুব সুন্দর কিছু আওয়াজ শুনতে পেতাম। যখন রুকইয়াহ চলাকালীন আমার খুব যন্ত্রণা হলে হঠাৎ একটা আওয়াজ আসতো। আর আমার সব কষ্ট যেনো নিঃশেষ হয়ে যেতো। যেমন: একদিন বাসায় রাক্বীদের দেয়া নিয়ম অনুযায়ী আমি সেলফ রুকইয়াহ শেষ করি। সমস্ত অডিও শোনা এবং বড়ই পাতার গোসল করার পর তখন আমার অনেক অসুস্থ আর খারাপ লাগতেছিলো। আমি স্বাভাবিক ভাবে দাড়াতে পারছিলাম নাহ। আমার হাত পা বাকা হয়ে যাচ্ছিল। মাথা ঘুরছিলো। বমি বমি লাগছিলো। সাথে তখন আমার নিজেরও অনেক কান্না আসতেছিলো নিজের এই অবস্থার জন্য। তখন আমি জানালার গ্রিল ধরে আকাশের দিকে তাকাই। তখন রাত ৮টার মতো। হঠাৎ একটা আওয়াজ আসে, "সবকিছুরই একটা শেষ আছে, ( এরপর আরেকটা লাইন বলেছিলো যেটা ভুলে গেছি), নিশ্চয়ই তোমার রবের সাথে তোমার সাক্ষাৎ অতি শীঘ্রই "। আর অদ্ভুত ভাবে কি যেনো একটা হলো। আমি গ্রিল ছেড়ে দেই। সাথে সাথে আমার সব মনঃকষ্ট দূর হয়ে গেলো। আমার বমি বমি ভাবও দূর হয়ে গেলো। মাথা ঘুরানো বন্ধ হয়ে গেলো, হাত পা মোচড়ানো, বাকানো, সব বন্ধ হয়ে গেলো। আমি নিজেকে পরিপূর্ণ সুস্থ অনুভব করলাম। সাথে আমার খুব খুশি লাগতেছিলো। এমন অদ্ভুত ঘটনা আমার সাথে চারবার ঘটেছে। মানে আমি চারবার খুব খারাপ পরিস্থিতিতে এমন আওয়াজ শুনেছি আর স্বাভাবিক হয়ে গেছি। আর হ্যা, অবশ্যই রুকইয়াহ করাকালীন, মানে রুকইয়াহ করতে করতে যখন আমার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছিলো তখন আমি এমন আওয়াজ শুনতাম। আরেকদিন আমার অবস্থা অনেক খারাপ ছিলো, ঐদিন আমি বাসার উপরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখি, চতুর্দিক আলোকিত হয়ে গেছে। এটা আকাশ, আর হঠাৎ দুটো ডানাওয়ালা অবয়ব এলো, ওদের শরীরে উজ্জ্বল আলো এতো বেশি ছিলো যে ওদের চেহারা দেখতে পাচ্ছিলাম নাহ। এরপর ওরা দুজন একটা বোর্ডের মতো কি জানি একটা দাড় করালো। তখন আমি প্রথমে দেখলাম একটা অন্ধকার রুম, জানালা দিয়ে জোছনার আলো ঢুকছে, খুব সুন্দর পরিবেশ। আমার স্বামী আর আমি জানালার পাশে দাড়ানো। সে আমাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিচ্ছে। এরপর দেখলাম আরেকটা সিন, এটা ছিলো আমি আর আমার ছেলেকে নিয়ে। একটা খাটের চতুর্দিকে আমি আমার ছোট্ট ছেলের পিছনে দৌড়াচ্ছি। দৌড়াতে দৌড়াতে আমি আমার ছেলেকে ধরে কোলে তুলে নিয়েছি। তারপর আমি আর আমার ছেলে খিলখিল করে হাসছি। তারপর আরেকটা সিন চলে এলো, সেখানে দেখলাম ঐ বোর্ডটা আর নেই। সামনে একটা দরজার মতো খুলে গেছে। সেখান থেকে উজ্জ্বল আলো বের হচ্ছে। আর সিঁড়ির মতো কিছু একটা উপরের দিকে উঠে গেছে। আর ঐ দুইটা ডানাওয়ালা উজ্জ্বল আলো ওয়ালা অবয়ব, দুইজন দুইদিকে আমার দুই হাত ধীরে আমাকে ধরে নিয়ে এই সিড়ি টা দিয়ে উপরে চলে যাচ্ছে। এরপর দরজাটা বন্ধ হয়ে গেলো। আর দেখলাম আকাশের সিনটাও গায়েব। আর চতুর্দিকের উজ্জ্বল আলো মিলিয়ে গেলো। আর আমি তখন ঘোর থেকে বের হয়ে আসলাম। মানে আমার সামনে যখন এসব ভাসে তখন আমি চাইলেও কোনোভাবেই এটা দেখা বন্ধ করতে পারি নাহ। নিজেকে এই ঘোরটা থেকে বের করতে পারি নাহ। যে দিকে এই দৃশ্য টা দেখছি, সেই দিকটা বাদে অন্য দিকে তাকাতেও পারি নাহ। দীর্ঘদিন যাবত কালোজাদু আর জ্বিনের জন্য আমার কি হরমোনাল পরিবর্তন হয়ে গেছে? আর এজন্য রুকইয়াহ করার সময় আমার এসব hallucination হচ্ছে? আমার কি সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো উচিত

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার কষ্টের কথা জানতে পেরে আমি সত্যিই মর্মাহত। আপনি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা অত্যন্ত কঠিন। আল্লাহ আপনাকে শীঘ্রই সম্পূর্ণ সুস্থতা দান করুন, আমিন।

প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার: আপনি যে অভিজ্ঞতাগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন, সেগুলোকে 'হ্যালুসিনেশন' (Hallucination) বলা ইসলামী পরিভাষায় সঠিক নয়। ইসলামী আকীদা ও ফিকহের পরিভাষায়, জিনের প্রভাবে বা আধ্যাত্মিক কারণে এমন দৃশ্য ও শব্দ উপলব্ধি করাকে বলা হয় 'ওয়াসওয়াসা' (Waswasa) বা 'খেয়াল' (Khayal)। এটি একটি বাস্তব বিষয় এবং জিনের প্রভাবের অন্যতম লক্ষণ।

আপনার বর্ণিত ঘটনাগুলো (সুন্দর আওয়াজ শোনা, আকাশ আলোকিত দেখা, ডানাওয়ালা অবয়ব দেখা, নিজের ভবিষ্যৎ বা সুখী দৃশ্য দেখা) মূলত জিনের পক্ষ থেকে আসা প্রতারণা ও ধোঁকা। শয়তান ও জিনের একটি কাজ হলো মানুষকে সঠিক পথ থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য মিথ্যা আশ্বাস ও ভয় দেখানো। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ "শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ দেয়।" (সূরা আল-বাকারা: ২৬৮)

আপনি যখন রুকইয়াহ করছেন, তখন জিনের পক্ষ থেকে আপনার মনে এই মিথ্যা আশ্বাস ও সুন্দর দৃশ্য দেখানো হচ্ছে, যাতে আপনি রুকইয়াহ ছেড়ে দেন বা বিভ্রান্ত হন। এটি একটি পরিচিত কৌশল। জিন যখন দেখে যে রুকইয়াহর মাধ্যমে তার প্রভাব কমছে, তখন সে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে, যার মধ্যে এই ধরনের "ভালো" বা "আধ্যাত্মিক" অনুভূতি দেখানোও একটি।

আপনার প্রশ্নের উত্তর:

১. হরমোনাল পরিবর্তন ও হ্যালুসিনেশন: দীর্ঘদিন জিনের আক্রমণ ও কালোজাদুর কারণে আপনার শরীরে দুর্বলতা, মানসিক চাপ এবং কিছু শারীরিক পরিবর্তন হতে পারে। তবে আপনি যা দেখছেন এবং শুনছেন, তা সাধারণ মানসিক রোগ (Psychiatric Hallucination) নয়, বরং এটি জিনের প্রভাবের একটি অংশ। রুকইয়াহর সময় এই ধরনের দৃশ্য দেখানো জিনের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ কৌশল।

২. সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো: যেহেতু আপনার সমস্যার মূল কারণ আধ্যাত্মিক (জিন ও কালোজাদু), তাই সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর প্রয়োজন নেই, যদি না আপনি নিশ্চিত হন যে এটি সম্পূর্ণ মানসিক রোগ। তবে, আপনি যদি মনে করেন যে আপনার শারীরিক বা মানসিক অবস্থা খুব খারাপ, তাহলে একজন ভালো ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন। তবে মূল চিকিৎসা হলো রুকইয়াহ, যা আপনি ইতিমধ্যে করছেন।

আপনার করণীয়:

১. রুকইয়াহ চালিয়ে যান: আপনি যে রুকইয়াহ করছেন, তা ধৈর্যের সাথে চালিয়ে যান। জিনের এই কৌশলগুলো দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। মনে রাখবেন, এগুলো জিনের প্রতারণা।

২. আইন ও সুন্নাহর আমল: নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত (বিশেষ করে সূরা বাকারা, সূরা ফালাক, সূরা নাস, আয়াতুল কুরসি), এবং সকাল-সন্ধ্যার যিকির (আযকার) করুন। এগুলো জিনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

৩. রাক্বীর পরামর্শ মেনে চলুন: যিনি আপনার রুকইয়াহ করাচ্ছেন, তার দেওয়া প্রতিটি নির্দেশনা মেনে চলুন। প্রয়োজনে তাকে আপনার এই অভিজ্ঞতার কথা জানান।

৪. ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল: আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখুন এবং ধৈর্য ধরুন। জিনের প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে সময় লাগতে পারে। হতাশ হবেন না।

৫. বিশ্বাস রাখুন: দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন যে, আল্লাহই একমাত্র নিরাময়কারী। কুরআন ও দুআর মাধ্যমে তিনি আপনাকে শিফা দেবেন।

মনে রাখবেন: জিনের এই দৃশ্যগুলো দেখে ভয় পাবেন না বা বিভ্রান্ত হবেন না। এগুলো তার দুর্বলতার লক্ষণ। আপনি যত বেশি রুকইয়াহ ও যিকিরে মগ্ন থাকবেন, জিন ততই দুর্বল হবে এবং এই ধরনের কৌশল অবলম্বন করবে। আল্লাহ আপনার ধৈর্য ও ইবাদতের মাধ্যমে আপনাকে সম্পূর্ণ সুস্থতা দান করুন, আমিন।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.