অনলাইনে কুরআন শরীফ অর্ডার করা, কুরিয়ারে আসা, অজু ছাড়া স্পর্শ করা
Halal and Haram · Hanafi
Question
১. আমি অনলাইনে কুরআন শরীফ অর্ডার করেছিলাম এবং হাতেও পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ।
কুরআন শরীফ পুরো স্বচ্ছ বুদবুদ পলিথিনে মোড়ানো ছিল (bubble wrap)। উপরে medium sized হাতের লেখায় মার্কারের কালো কালিতে দুইবার লেখা ছিল যে - "সাবধান কোরআন আছে"।
আমি এইবার দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছি যে অনলাইনে অর্ডার করাটা কি ঠিক হয়েছে কিনা। কারণ কিভাবে তারা কুরআন শরীফকে অন্যান্য মালামালের সাথে কুরিয়ার সার্ভিসে এনেছে, যথাযথ সম্মানের সাথে এনেছে কিনা আমি জানি না। আমার কি গুনাহ্ হয়েছে এর দ্বারা? আমার কি কোনো কাফফরা দিতে হবে?
২. কুরআনের মুসহাফাটি পছন্দ হয়েছিল, তাই অর্ডার করি। কিন্তু যেদিন অর্ডার করি, সেদিন আমার মনে হচ্ছিল যে -
"যেভাবেই তারা কুরিয়ারে করে আনুক না কেন, হাতে পেলেই হয়। যদি তারা যথাযথ সম্মানের সাথে না আনে (মানে নাউজুবিল্লাহ যদি ছুড়ে ফেলে বা কুরআনের উপরে অন্য কিছু রাখে), তাহলে আমি পরে কাফ্ফারা দিয়ে দিবো বা এমন কিছু মনে হচ্ছিল।"
এখন আমার মনে হচ্ছে যে আমি সত্যিই গুনাহ্ করে ফেলেছি এইসব চিন্তা মনে পোষণ করে, আমার কি কাফফারা দিতে হবে? কিভাবে মাফ চাইবো?
তখন আমার একটা জিনিস মনে হচ্ছিল এবং আজকেও মনে হচ্ছে যে আমি স্রেফ নিজের খেয়াল খুশি মিটালাম আমার এই কাজ দ্বারা। আমার কুরআনের মুসহাফাটি ভালো লেগেছে, পড়বো তাই অর্ডার করেছি, সবই ঠিক আছে, কিন্তু এর যথাযথ সম্মানের সাথে কুরিয়ার সার্ভিসে আনবে কি আনবে না তার পরওয়া করি নাই। এখন অনুতপ্ত লাগছে।
৩. "কুরআন শরীফটি অনলাইন থেকে অর্ডার করেছি" - বলার দ্বারা কি কোনো গুনাহ্ হবে? কারণ কুরআন তো আর "অর্ডার" করা যায় না, আমি শুধু বুঝাচ্ছি যে আমি হাদিয়ার বিনিময়ে কুরআনের কপিটি হাতে পেয়েছি।
৪. কুরআন শরীফ নেয়ার সময় অজু ছিল না, কিন্তু ওপরে বাবল র্যাপ এর পলিথিন ছিল, আমার কি গুনাহ হয়
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার উদ্বেগ ও অনুতপ্ত হওয়া স্পষ্টভাবে আপনার ঈমান ও সংবেদনশীলতার পরিচয় দেয়। আল্লাহ তায়ালা আপনার এই অনুভূতিকে কবুল করুন এবং আপনার গুনাহ মাফ করুন। আসুন, আমরা হানাফি মাযহাবের আলোকে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিই।
১. অনলাইনে কুরআন অর্ডার করা ও কুরিয়ারে আসার পদ্ধতি নিয়ে দুশ্চিন্তা
উত্তর: অনলাইনে কুরআন শরীফ অর্ডার করা এবং হাতে পাওয়া সম্পূর্ণ বৈধ ও জায়েয। এটি কোনো গুনাহের কাজ নয়। কুরআন শরীফ কেনা-বেচা, অর্ডার করা বা হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করা ইসলামি শরিয়তে সম্পূর্ণ অনুমোদিত।
কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে কুরআন আসার সময় তারা কীভাবে এনেছে, যথাযথ সম্মান দেখিয়েছে কিনা—এই বিষয়ে আপনার জানা নেই বা সন্দেহ থাকলে আপনি দায়ী নন। আপনার দায়িত্ব ছিল কুরআন শরীফের প্রতি সম্মান রক্ষা করা, যা আপনি করেছেন। কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মচারীদের কাজের জন্য আপনি গুনাহগার হবেন না। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا "আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
আপনি যা জানেন না বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তার জন্য আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। তবে, ভবিষ্যতে আপনি যদি আবার অর্ডার করেন, তাহলে বিক্রেতাকে অনুরোধ করতে পারেন যেন কুরআন শরীফ যথাযথ সম্মানের সাথে প্যাকেট করে পাঠানো হয়।
কাফফারা: আপনার কোনো কাফফারা (শরিয়ত নির্ধারিত জরিমানা) দিতে হবে না। কারণ কাফফারা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু গুনাহের জন্য নির্ধারিত (যেমন: রমজানের রোজা ভঙ্গ, জিহার, ভুলে কাউকে হত্যা)। কুরআন অর্ডার করার জন্য কোনো কাফফারা নেই।
২. "যেভাবেই আনুক, হাতে পেলেই হয়" — এই চিন্তা ও অনুতাপ
উত্তর: আপনি যখন অর্ডার করেছিলেন, তখন আপনার মনে এই চিন্তা এসেছিল যে, "যেভাবেই তারা আনুক, হাতে পেলেই হয়।" এটি একটি ভুল চিন্তা ছিল, এবং এখন আপনি অনুতপ্ত। এই অনুতাপই আপনার জন্য যথেষ্ট। ইসলামে গুনাহের জন্য প্রকৃত তওবা (অনুতপ্ত হওয়া, গুনাহ ছেড়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে না করার সংকল্প) করলেই আল্লাহ মাফ করে দেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا "বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
কাফফারা: এই চিন্তার জন্যও কোনো কাফফারা নেই। আপনাকে যা করতে হবে:
- তওবা করুন: আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
- ইস্তিগফার পড়ুন: "আস্তাগফিরুল্লাহ" বেশি বেশি পড়ুন।
- ভবিষ্যতে সংকল্প করুন: ভবিষ্যতে কুরআন শরীফের সম্মান রক্ষায় আরও সচেতন হবেন।
আপনার এই অনুতপ্ত হওয়াটাই প্রকৃত তওবার লক্ষণ। আল্লাহ তায়ালা তওবাকারীদের ভালোবাসেন।
৩. "কুরআন শরীফটি অনলাইন থেকে অর্ডার করেছি" — বলা কি গুনাহ?
উত্তর: "অর্ডার করেছি" বলাটা একটি প্রচলিত ভাষা, যা দ্বারা আপনি বোঝাতে চেয়েছেন যে আপনি অনলাইনে কুরআনের একটি কপি ক্রয় করেছেন বা হাদিয়া হিসেবে পেয়েছেন। এটি কোনো গুনাহের কাজ নয়। ভাষার এই ব্যবহারকে গুনাহ বলা হবে না, কারণ আপনার নিয়ত বা উদ্দেশ্য ছিল কুরআন শরীফ সংগ্রহ করা, কোনো অসম্মান করা নয়।
ইসলামে আমলসমূহের মান নির্ভর করে নিয়তের উপর। হাদিসে আছে:
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ "নিশ্চয় সকল কাজের ফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।" (সহীহ বুখারী: ১)
আপনার নিয়ত ছিল ভালো, তাই এই কথা বলায় কোনো গুনাহ হবে না।
৪. অজু ছাড়া কুরআন শরীফ স্পর্শ করা
উত্তর: আপনার প্রশ্নটি হলো, অজু ছাড়া কুরআন শরীফ নেওয়ার সময় উপরে বাবল র্যাপ (পলিথিন) ছিল, এতে কি গুনাহ হয়েছে?
বিস্তারিত উত্তর: হানাফি মাযহাবের নিয়ম অনুযায়ী, পবিত্র কুরআনের মূল আরবি লেখা (মুসহাফ) স্পর্শ করার জন্য পবিত্রতা (অজু) থাকা ফরজ বা ওয়াজিব। কিন্তু যদি কুরআনের উপর কোনো আবরণ (যেমন: পলিথিন, কাপড়, বা অন্য কোনো জিনিস) থাকে, তাহলে সেই আবরণের উপর হাত রাখলে অজু ছাড়া স্পর্শ করা জায়েয আছে।
আপনি যখন কুরআন শরীফ হাতে নিয়েছিলেন, তখন উপরে বাবল র্যাপ (পলিথিন) ছিল। সুতরাং, আপনি সরাসরি কুরআনের পাতা স্পর্শ করেননি, বরং পলিথিন স্পর্শ করেছেন। তাই আপনার কোনো গুনাহ হয়নি। এটি সম্পূর্ণ জায়েয।
তবে, ভবিষ্যতে কুরআন শরীফ পড়ার সময় বা সরাসরি স্পর্শ করার সময় অবশ্যই অজু থাকা জরুরি।
সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ
- অনলাইনে কুরআন অর্ডার করা জায়েয এবং এতে কোনো গুনাহ নেই।
- কুরিয়ারের কর্মচারীদের কাজের জন্য আপনি দায়ী নন। আপনার কোনো কাফফারা দিতে হবে না।
- আপনার ভুল চিন্তার জন্য অনুতপ্ত হওয়াই যথেষ্ট। তওবা করুন এবং ইস্তিগফার পড়ুন। কোনো কাফফারা নেই।
- "অর্ডার করেছি" বলা গুনাহ নয়। এটি একটি প্রচলিত ভাষা।
- অজু ছাড়া পলিথিনে মোড়ানো কুরআন স্পর্শ করা জায়েয এবং এতে কোনো গুনাহ নেই।
আপনার করণীয়:
- আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন।
- কুরআন শরীফ পড়ার সময় পবিত্রতা (অজু) সহকারে পড়ুন এবং যথাযথ সম্মান রক্ষা করুন।
- ভবিষ্যতে কুরআন শরীফ কেনার সময় বিক্রেতাকে অনুরোধ করুন যেন যথাযথ সম্মানের সাথে প্যাকেট করা হয়।
আল্লাহ তায়ালা আপনার এই সংবেদনশীলতা ও দ্বীনদারি কবুল করুন এবং আপনার সকল গুনাহ মাফ করে দিন। আমিন।
দলিলসমূহ:
- সূরা আল-বাকারা (২:২৮৬) - সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব না দেওয়ার বিষয়ে।
- সূরা আয-যুমার (৩৯:৫৩) - আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়ার বিষয়ে।
- সহীহ বুখারী (১) - নিয়তের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিস।
- ফতোয়া আলমগীরী (১/৫৪) - কুরআন স্পর্শ করার শর্ত সম্পর্কে।
- রদ্দুল মুহতার (১/১৭১) - আবরণসহ কুরআন স্পর্শ করার বিধান সম্পর্কে।