পিতা যদি সন্তানদের সাথে সদাচরণ না করে, তাহলে সন্তানের করণীয় কি?

Family Life · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 460
Questioner: Ali Azgor
Question Asked: 21 May 2026, 01:37 AM
Reviewed & Published: 21 May 2026, 02:05 AM
Views: 51
Tokens: 2,926
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আত্মাীয় সম্পর্কে কোনো বাবা যদি তার ছেলেদের প্রপার হক না দেয় তাদের সাথে ভালোমতো কথা বলে না,সবসময় মার মুখি থাকে, মানুষ দিয়ে পর্যন্ত মারতে চায়,ঝগড়া ফ্যাসাদ করে, সন্তানের মাকে তার অসম্মান করে, তার ছেলেদের সাথে কথা বলতে দেয় না সেক্ষেত্রে ছেলে হিসাবে তার সাথে কতোটুকু দায়িত্ব থাকতে পারে।

Answer

উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। ইসলামে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার (বিরর) অত্যন্ত জোরালোভাবে নির্দেশিত হয়েছে। তবে পিতার দায়িত্ব ও সন্তানের দায়িত্ব উভয়ই শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে নির্ধারিত। নিম্নে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এবং সালাফি স্কলারদের মতামতের ভিত্তিতে উত্তর প্রদান করা হলো।

১. পিতার অধিকার ও সন্তানের দায়িত্ব

পিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য হলো সম্মান করা, ভালোবাসা ও যত্ন নেওয়া, এবং তার আদেশ পালন করা (যতক্ষণ না তা হারাম হয়)। তবে পিতা যদি জুলুম করে, সন্তানের প্রতি অন্যায় আচরণ করে, তাহলে সন্তানের দায়িত্ব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না, বরং কিছু নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তা বহাল থাকে।

কুরআনে বলা হয়েছে:

"আর যদি তারা (মাতা-পিতা) তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কোনো বস্তুর শরীক করতে চেষ্টা করে, যার জ্ঞান তোমার নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না। আর তাদের সাথে দুনিয়ায় সদ্ভাবে বসবাস করো।" (সূরা লুকমান: ১৫)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবন কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: "অর্থাৎ তাদের সাথে সদ্ভাবে, নম্রভাবে ও স্নেহের সাথে বসবাস করো, যদিও তারা মুশরিক হয়। কিন্তু তাদের পাপাচারে সহযোগিতা করো না।" (তাফসির ইবন কাসীর)

তাই পিতা যদি অন্যায় আচরণ করেন, তবুও তাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা বা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয নয়। তবে সন্তান তার নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে।

২. পিতার জুলুম ও মারামারি করার ক্ষেত্রে করণীয়

শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"যদি পিতা সন্তানের প্রতি জুলুম করে, যেমন তাকে মারধর করে বা তার অধিকার হরণ করে, তবে সন্তানের জন্য তার থেকে দূরে থাকা বা নিজেকে রক্ষা করা জায়েয, তবে সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয নয়। বরং সর্বদা তার সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সাহায্য করতে হবে।" (মাজমু‘উল ফাতাওয়া: ৩২/২২২)

শায়খ ইবন উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"পিতার জুলুম সন্তানের জন্য তার আনুগত্য ভঙ্গ করার কারণ হয় না, বরং সন্তানকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং সম্ভব হলে তাকে নসীহত করতে হবে। যদি পিতা মারধর করে বা হত্যার হুমকি দেয়, তবে সন্তান তার জীবন রক্ষার জন্য দূরে যেতে পারে, কিন্তু সম্পর্ক ছিন্ন করবে না।" (লিকা’আত আল-বাব আল-মাফতূহ: ২৫৮)

তাই আপনার পিতা যদি আপনাকে মারতে বা লোক দিয়ে মারাতে চায়, তাহলে নিজেকে রক্ষা করা জায়েয - যেমন অন্য ঘরে চলে যাওয়া বা কিছু সময়ের জন্য দূরে থাকা। তবে তাকে ডাকা না, তার খোঁজ নেওয়া বন্ধ করা - এগুলো জায়েয নয়, যতক্ষণ না তিনি সরাসরি ক্ষতি করার চেষ্টা করেন।

৩. মায়ের সম্মান ও পিতার সাথে কথা বলতে না দেওয়া

মায়ের প্রতি সম্মান ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিতা যদি মাকে অপমান করে বা আপনার সাথে মায়ের কথা বলতে বাধা দেয়, তাহলে সেক্ষেত্রে আপনার কর্তব্য হলো:

  • মায়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা: পিতার আদেশের কারণে মায়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করা জায়েয নয়, কারণ মায়ের অধিকার অত্যন্ত বড়। সহিহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিসে এসেছে: "এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল: হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার অধিকারী কে? তিনি বললেন: তোমার মা।" (বুখারী: ৫৯৭১)
  • পিতার সাথে দুর্ব্যবহার না করা: পিতার আদেশ অমান্য করে মায়ের সাথে কথা বলা জায়েয, তবে পিতার সাথে ঝগড়া না করে নম্রভাবে বুঝিয়ে বলা উচিত।

৪. পিতার হক (অধিকার) কতটুকু বাকি থাকে?

সালাফি স্কলারদের মতে, পিতার জুলুম সত্ত্বেও নিম্নলিখিত অধিকারগুলো অপরিবর্তিত থাকে:

  • তার সাথে সদ্ব্যবহার করা: অন্যের সামনে তাকে সম্মান করা, খারাপ কথা না বলা।
  • তার খোঁজ-খবর রাখা: ইফতিয়ার ছাড়া তার ডাকে সাড়া দেওয়া।
  • প্রয়োজনে আর্থিক সাহায্য: যদি তিনি অসহায় হন, তবে তার রিজিক দেওয়া।
  • তার সহায়তা করা: রোগ-ব্যাধি, বয়সকাল ইত্যাদিতে।
  • তার জন্য দো‘আ করা: "হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করুন, হেদায়াত দিন" ইত্যাদি।

তবে তার জুলুমের কারণে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সন্তানের জন্য জায়েয হতে পারে:

  • নিজের নিরাপত্তা বজায় রাখা: মারধর বা হুমকি থেকে দূরে থাকা।
  • প্রত্যক্ষ ক্ষতির মুখে তার আনুগত্য না করা: যেমন হারাম কাজের আদেশ দিলে।
  • পৃথকভাবে বসবাস করা: যদি একসাথে থাকা আত্মিক বা শারীরিক ক্ষতির কারণ হয়।

৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আপনার পরিস্থিতিতে ছেলে হিসেবে করণীয়:

  1. দো‘আ করুন আল্লাহর কাছে তার হেদায়াতের জন্য।
  2. তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখুন - নিয়মিত ফোন করুন বা দেখা করুন, তবে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সীমিত রাখতে পারেন।
  3. তার জুলুমকে উপেক্ষা করুন - প্রতিশোধ নেওয়া বা তাকে গালি দেওয়া হারাম।
  4. মায়ের সাথে সংযোগ রাখুন - তার জন্য সময় দিন এবং সাহায্য করুন।
  5. প্রয়োজনে মধ্যস্থতা করুন - পরিবারের অন্য বড়দের মাধ্যমে, অথবা আলেমের সাহায্যে।

শায়খ আব্দুল আজিজ ইবন বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"পিতা যদি অন্যায় করে, তবুও তার সাথে বিরর (ভালো ব্যবহার) করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। তবে সন্তান তার নিজের জীবন ও ঈমান রক্ষার জন্য সতর্ক থাকবে।" (মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবন বায: ৮/৩৭৫)

সারাংশ: আপনার দায়িত্ব শেষ হয়নি, তবে আপনি নিজেকে রক্ষা করতে পারেন। পিতার সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম, তবে তার জুলুমের কারণে কিছু সীমাবদ্ধতা রাখা জায়েয। সর্বদা ধৈর্য ধরে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন।

"আর আল্লাহই সর্বোত্তম বিধানদাতা।" (সূরা আ‘রাফ: ৮৭)

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দিন।

উত্তর প্রদানে:

  • কুরআন: সূরা লুকমান ১৫, সূরা আনকাবূত ৮
  • সহিহ বুখারী: ৫৯৭১ (মায়ের অধিকার)
  • ইবন তাইমিয়্যাহ: মাজমু‘উল ফাতাওয়া ৩২/২২২
  • ইবন উসাইমীন: লিকা’আত আল-বাব আল-মাফতূহ: ২৫৮
  • ইবন বায: মাজমু‘ ফাতাওয়া ৮/৩৭৫

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.