ঈসালে সাওয়াবের নিয়ত
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
ঈসালে সাওয়াবের নিয়তে কোরআন তেলাওয়াতের বিধান
প্রশ্নের উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ, প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ঈসালে সাওয়াব অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির রূহের কাছে কোরআন তেলাওয়াতের সাওয়াব পৌঁছে দেওয়া—এটি একটি উত্তম ও সওয়াবের কাজ। হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, কোরআন তেলাওয়াতের সাওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছায় এবং তা তাদের জন্য উপকারী।
মূল উত্তর
হ্যাঁ, একসাথে করা যাবে। আপনার নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াতের সাথে সাথে কারো জন্য ঈসালে সাওয়াবের নিয়ত করা যাবে। এতে আপনার নিয়মিত তেলাওয়াতের সাওয়াবও হবে এবং মৃত ব্যক্তির কাছেও সাওয়াব পৌঁছাবে। দুইটি আলাদা করে পড়ার প্রয়োজন নেই।
দলিল ও উল্লেখযোগ্য উক্তি
১. কোরআন তেলাওয়াতের সাওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ)-এর মতে, কোরআন তেলাওয়াতের সাওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়। ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) বলেন:
"পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের সাওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়।"
(রদ্দুল মুহতার, ১ম খণ্ড, ৬০৬ পৃষ্ঠা)
২. দোয়া ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে সাওয়াব পৌঁছানো
ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহঃ) রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ করেছেন:
"যদি কেউ কোরআন তেলাওয়াত করে এবং এর সাওয়াব মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করে পৌঁছে দেয়, তবে তা মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছায় এবং এতে তেলাওয়াতকারীর নিজের সাওয়াবও কমে না।"
(রদ্দুল মুহতার, ২য় খণ্ড, ২৪২ পৃষ্ঠা)
৩. নিয়তের গুরুত্ব
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।"
(সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৯০৭)
সুতরাং আপনি যখন নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করছেন এবং সাথে সাথে কারো জন্য ঈসালে সাওয়াবের নিয়ত করছেন, তখন আপনার নিয়ত অনুযায়ী সাওয়াব হবে এবং মৃত ব্যক্তির কাছেও তা পৌঁছাবে।
৪. হানাফী ফিকহের নির্দেশনা
ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ (আলমগীরী) তে উল্লেখ আছে:
"কোরআন তেলাওয়াত করে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা মুস্তাহাব। তেলাওয়াতকারী নিজেও সাওয়াব পাবে এবং মৃত ব্যক্তির কাছেও সাওয়াব পৌঁছাবে।"
(ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ, ১ম খণ্ড, ১৮৮ পৃষ্ঠা)
৫. মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহঃ)-এর বক্তব্য
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহঃ) তার মা'আরিফুল কোরআন এ উল্লেখ করেছেন:
"মৃত ব্যক্তির জন্য কোরআন তেলাওয়াতের সাওয়াব পৌঁছানো জায়েয এবং তা মৃত ব্যক্তির জন্য উপকারী। তেলাওয়াতকারীর নিজের সাওয়াবও কমে না।"
৬. মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম)-এর বক্তব্য
মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) তার ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন:
"নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াতের সাথে সাথে ঈসালে সাওয়াবের নিয়ত করা যাবে। এতে তেলাওয়াতকারীর নিজের সাওয়াবও হবে এবং মৃত ব্যক্তির কাছেও সাওয়াব পৌঁছাবে। দুইটি আলাদা করে পড়ার প্রয়োজন নেই।"
গুরুত্বপূর্ণ নোট
১. নিয়তের বিশুদ্ধতা: ঈসালে সাওয়াবের নিয়ত করার অর্থ এই নয় যে, আপনি শুধুমাত্র মৃত ব্যক্তির জন্য পড়ছেন। বরং আপনি নিজেও তেলাওয়াতের সাওয়াব পাবেন এবং সেই সাওয়াব মৃত ব্যক্তির জন্য হাদিয়া (পাঠিয়ে) দিচ্ছেন।
২. নিয়মিত তেলাওয়াতের ফজিলত: নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াতের নিজস্ব ফজিলত রয়েছে। হাদীসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি কোরআনের একটি অক্ষর পড়বে, তার জন্য একটি নেকী রয়েছে এবং একটি নেকী দশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।"
(সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ২৯১০)
৩. সর্বোত্তম পদ্ধতি: তেলাওয়াত শেষে এই দোয়া করা উত্তম:
"আল্লাহুম্মা আওসিল সাওয়াবা মা ক্বারাতুহু ইলা রূহি (অমুক ব্যক্তির নাম)..."
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমি যা তেলাওয়াত করলাম তার সাওয়াব অমুকের রূহের কাছে পৌঁছে দাও।"
উপসংহার
সুতরাং প্রশ্নে উল্লেখিত পরিস্থিতিতে—যেখানে কেউ নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করছে এবং ২০ পারায় পৌঁছেছে—সে চাইলে এই তেলাওয়াতের সাওয়াব কারো জন্য ঈসালে সাওয়াবের নিয়ত করতে পারবে। দুইটি আলাদা করে পড়ার প্রয়োজন নেই। তবে মনে রাখতে হবে, ঈসালে সাওয়াবের নিয়ত করলে নিজের সাওয়াব কমে না, বরং উভয়ের জন্যই সাওয়াব লেখা হয়।
আল্লাহু তা'আলাই সর্বজ্ঞ।