অভিভাবক ছাড়া বিয়ের বিধান
Halal and Haram · Hanafi
Question
এখনের প্রশ্ন: ছেলেটি ভাবছে মেয়েটির সাথে বেইনসাফ করা হয়েছে। ছেলের ফ্যামিলি মেয়েটার মান সম্মান নষ্ট করছে পুরো এলাকায়। এজন্য ছেলেটি মা বাবার অবাধ্য হয়ে বিয়ে করছে। তাহলেও সে গুনাহগার হবে?
Answer
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
মূলনীতি
ইসলামী শরীয়তে বিবাহ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সুন্নত। বিবাহের বৈধতার জন্য নিম্নোক্ত শর্তসমূহ পূরণ হওয়া আবশ্যক:
১. ইজাব-কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) - সাক্ষীদের উপস্থিতিতে ২. দুইজন পুরুষ সাক্ষী বা একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষী
হানাফী মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) ও সুস্থ মস্তিষ্কের নারী নিজের বিবাহের জন্য অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া নিজেই সম্মতি দিতে পারেন, তবে এটি মাকরূহ (অপছন্দনীয়) বলে গণ্য হবে। কিন্তু যদি কোনো নারী নিজের সম্মতিতে বিবাহ করে এবং তা বৈধ সাক্ষীদের উপস্থিতিতে হয়, তবে বিবাহটি সহীহ (শুদ্ধ) হবে।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের বিবাহের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখেন। তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া নারীর বিবাহ সহীহ নয়।
রদ্দুল মুহতার (৫ম খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়) এ উল্লেখ আছে:
"المرأة البالغة العاقلة إذا زوجت نفسها من كفء جاز عند أبي حنيفة"
অর্থাৎ, "প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের নারী যদি নিজেকে সমকক্ষ (কুফু) ব্যক্তির সাথে বিবাহ দেয়, তবে তা ইমাম আবু হানীফার মতে জায়েয।"
ছেলেটির পিতামাতার অবাধ্যতা প্রসঙ্গে
ইসলামে পিতামাতার আনুগত্য করা ফরজ, তবে পিতামাতার আনুগত্য সীমাবদ্ধ - তা কখনো আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করে হতে পারে না। পিতামাতাকে অসন্তুষ্ট করা সাধারণত গুনাহ, কিন্তু যদি পিতামাতা কোনো বৈধ কাজে বাধা দেন এবং তা শরীয়তসম্মত হয়, তবে সেক্ষেত্রে পিতামাতার অবাধ্যতা করা যেতে পারে।
হাদীসে আছে:
"لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ" "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীর ক্ষেত্রে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসনাদ আহমাদ)
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিবাহ নিজেই কোনো গুনাহ নয়, বরং এটি একটি বৈধ ও পছন্দনীয় কাজ। তাই পিতামাতার অমতে বিবাহ করা নিজে গুনাহ নয়, কিন্তু পিতামাতাকে কষ্ট দেওয়া এবং তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা গুনাহ হতে পারে।
ফিজিক্যাল সম্পর্কের বিধান
যদি বিবাহটি শরীয়তসম্মতভাবে সম্পন্ন হয় (অর্থাৎ ইজাব-কবুল, সাক্ষী থাকে), তবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ বৈধ (হালাল) হবে।
তবে যদি বিবাহটি শরীয়তসম্মত না হয় (যেমন: সাক্ষী না থাকা), তবে শারীরিক সম্পর্ক হারাম হবে।
আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর
১. ছেলেটি পিতামাতার অবাধ্য হয়ে বিয়ে করলে তা কি গুনাহ?
বিবাহ নিজেই গুনাহ নয়, বরং এটি একটি বৈধ কাজ। তবে পিতামাতার অবাধ্যতা এবং তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করা গুনাহ। ছেলেটির উচিত পিতামাতাকে বোঝানোর চেষ্টা করা এবং তাদের সম্মতি আদায় করা। যদি পিতামাতা অন্যায়ভাবে বাধা দেন, তবে সেক্ষেত্রে বিবাহ করা জায়েয, তবে পিতামাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করে বরং তাদের সম্মান বজায় রাখা উচিত।
২. ফিজিক্যাল সম্পর্ক হারাম হবে কি?
যদি বিবাহটি শরীয়তসম্মতভাবে সম্পন্ন হয় (সাক্ষী, ইজাব-কবুল সহ), তবে ফিজিক্যাল সম্পর্ক হালাল হবে। কিন্তু যদি বিবাহটি শরীয়তসম্মত না হয়, তবে তা হারাম হবে।
৩. ছেলেটির গুনাহ হবে কি?
বিবাহ করা নিজে গুনাহ নয়। কিন্তু পিতামাতার অবাধ্যতা এবং তাদের কষ্ট দেওয়া গুনাহ। ছেলেটির উচিত:
- পিতামাতার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা
- তাদের সম্মান করা
- তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা
- প্রয়োজনে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করা
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
১. অভিভাবকের সম্মতি নেওয়ার চেষ্টা করুন - উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হলে তা অধিক বরকতময় হবে।
২. বিবাহের পূর্বে শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকুন - বিবাহের আগে কোনো শারীরিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ হারাম।
৩. পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না - পিতামাতার অবাধ্যতা ও তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা মারাত্মক গুনাহ।
৪. বিবাহের পরও পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করুন - তাদের খোঁজখবর নিন, তাদের সম্মান করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।