আমানতের টাকা নিজে খরচ করার বিধান
Halal and Haram · Hanafi
Question
কারো টাকা আমার কাছে জমা থাকলে আমি কি সেই টাকা আমার প্রয়োজনে খরচ করতে পারবো? উনি যখন টাকা চাইবেন তখন যদি আমি সাথে সাথে উনার টাকা ফিরিয়ে দিতে পারি। এমনটা করা কি জায়েয হবে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো: না, আপনার কাছে গচ্ছিত (আমানত) রাখা অন্য কারো টাকা আপনার নিজের প্রয়োজনে খরচ করা জায়েয নয়। এটি করা সম্পূর্ণ হারাম ও গুনাহের কাজ।
দলিল ও ব্যাখ্যা:
আপনার কাছে অন্য কেউ টাকা জমা রাখলে ইসলামী পরিভাষায় তা "আমানত" (Trust/Deposit) হিসেবে গণ্য হয়। আমানতের মূল শর্ত হলো, তা যেভাবে আছে সেভাবে হিফাজত করা এবং যখন মালিক চাইবে, তখনই তা ফেরত দেওয়া। আমানতের টাকা ব্যবহার করার কোনো অনুমতি আপনার নেই।
১. কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার প্রাপককে ফিরিয়ে দাও।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
এই আয়াতে আমানত ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি এর হেফাজতের নির্দেশও নিহিত। আমানত খরচ করলে তা হেফাজতের খেলাফ হয়।
২. হাদিসের নির্দেশ: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
أَدِّ الْأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ، وَلَا تَخُنْ مَنْ خَانَكَ "যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে, তার আমানত ফিরিয়ে দাও এবং যে তোমার সাথে খিয়ানত করেছে, তুমি তার সাথে খিয়ানত করো না।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৩৫; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২৬৪)
আমানতের টাকা নিজের প্রয়োজনে খরচ করা হলো সুস্পষ্ট খিয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা)।
৩. হানাফি ফিকহের বিধান: হানাফি মাযহাবের প্রামাণ্য কিতাবসমূহে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, আমানতকারীর অনুমতি ছাড়া আমানত ব্যবহার করা জায়েয নয়। রদ্দুল মুহতার (ফতোয়ায়ে শামী) -এ উল্লেখ আছে, আমানত রাখা ব্যক্তি যদি আমানতের মাল ব্যবহার করে, তবে সে আমানতের জামিন (Guarantor) হয়ে যাবে। অর্থাৎ, এরপর যদি টাকা নষ্ট হয় বা চুরি যায়, তাহলে তাকে তা ফেরত দিতে হবে। এমনকি ব্যবহার করার কারণে সে গুনাহগারও হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৫/৬৮৪)
আপনার প্রশ্নের যে অংশে বলেছেন, "উনি যখন টাকা চাইবেন তখন যদি আমি সাথে সাথে উনার টাকা ফিরিয়ে দিতে পারি" — এটি কোনো বৈধতা দেয় না। কারণ, আপনি যখন টাকাটি খরচ করবেন, তখন আপনার কাছে সেই টাকা থাকবে না। আপনি তখন অন্য টাকা দিয়ে তার টাকা শোধ করবেন। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি বৈধ নয়, কারণ:
- আপনি তার সম্পদ তার অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলেন, যা জুলুম ও খিয়ানত।
- আপনি তার টাকার নিরাপত্তা নষ্ট করলেন। যদি আপনার কাছে অন্য টাকা না থাকে বা কোনো কারণে দিতে না পারেন, তাহলে আপনি তার হক নষ্ট করলেন।
- এটি একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। অনেক সময় মানুষ এভাবে টাকা খরচ করে পরে ফেরত দিতে পারে না, ফলে বিবাদ ও অশান্তি সৃষ্টি হয়।
ব্যতিক্রম: শুধুমাত্র একটি ক্ষেত্রে তা জায়েয হতে পারে, যদি আমানতকারী (যে টাকা রেখেছে) আপনাকে আগে থেকেই স্পষ্টভাবে অনুমতি দেয় যে, "তুমি টাকাটা ব্যবহার করতে পারো, যখন দিতে পারবে তখন দিবে।" তবে এই অনুমতির পরও টাকাটি আর আমানত থাকবে না, বরং তা কারজ (ঋণ) হিসেবে গণ্য হবে। আর কারজের বিধান হলো, তা ফেরত দিতে হবে, তবে এতে কোনো লাভ (বাড়তি টাকা) দেওয়া বা নেওয়া জায়েয নেই।
সারকথা: আপনার কাছে কেউ টাকা জমা রেখেছেন, এটি একটি আমানত। এই টাকা আপনার জন্য সম্পূর্ণ হারাম। আপনার কর্তব্য হলো, টাকাটি নিরাপদে রাখা এবং যখন মালিক চাইবে, তখনই হুবহু ফেরত দেওয়া। নিজের প্রয়োজনে তা খরচ করা থেকে বিরত থাকুন। যদি আপনার জরুরি প্রয়োজন হয়, তাহলে মালিকের কাছে অনুমতি চান; তিনি অনুমতি দিলে তবেই ব্যবহার করুন, অন্যথায় নয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আমানত রক্ষার তাওফিক দিন। (আমিন)