ব্যাংকারের বাড়ীর খাবার খাওয়ার বিধান
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমাদের সাথে ইউনিভার্সিটিতে পড়ে একজন বড় আপু.. উনি বিবাহিত। উনার স্বামী ব্যাংকার।
উনি একদিন বাসা থেকে কিছু নাস্তা রান্না করে ক্লাসে এনে আপ্যায়ন করতে চাইছেন।
এখন উনার রান্না করা সেই খাবার খাওয়া যাবে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো: একজন বিবাহিত মহিলা, যার স্বামী ব্যাংকার (যিনি সুদী লেনদেনের সাথে জড়িত), তিনি যদি নিজ হাতে রান্না করে ক্লাসে এনে আপ্যায়ন করেন, তাহলে সেই খাবার খাওয়া জায়েজ হবে কি না?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ, উক্ত মহিলার রান্না করা খাবার খাওয়া **জায়েজ (যদি তার স্বামীর ইনকামে হালাল অংশও থাকে) ** হবে, যদি না সেখানে অন্য কোনো শরয়ী সমস্যা থাকে (যেমন: খাবারে হারাম উপাদান মেশানো) এবং ব্যাংকের হারাম টাকা দ্বারা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া না যায়। কারণ একজন ব্যক্তির হালাল টাকাও থাকে। তবে যদি এ ব্যাপারে নিশ্চিত জানা যায় যে, ব্যাংকের হারাম টাকা দ্বারা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে বা তাদের পুরো ইনকাম হারাম টাকা, তাহলে খাওয়া জায়েজ হবে না।
কারণ, কারো কাছে হারাম সম্পদ থাকার কারণে তার হাতের স্পর্শ বা তার রান্না করা খাবার অপরের জন্য হারাম হয়ে যায় না। যতক্ষণ পর্যন্ত না জানা যায় যে, নির্দিষ্ট খাবারটি হারাম অর্থ দিয়ে কেনা হয়েছে।
বিস্তারিত কারণ ও দলিল:
আপনার প্রশ্নটি মূলত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল: ১. ব্যাংকারের উপার্জিত অর্থের বিধান। ২. সেই অর্থে কেনা জিনিস দ্বারা রান্না করা খাবার খাওয়ার বিধান।
১. ব্যাংকারের উপার্জিত অর্থের বিধান: সুদ (ব্যাংক ইন্টারেস্ট) একটি গুরুতর গুনাহের কাজ। ইসলামে সুদ খাওয়া, দেওয়া, লিখে দেওয়া এবং সাক্ষী থাকা—সবই হারাম। (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫-২৭৯; সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৮৬)। তাই একজন ব্যাংকার যদি সুদী লেনদেনের মাধ্যমে বেতন পান, তাহলে তার সেই উপার্জিত অর্থের মধ্যে হারামের অংশ থাকবে।
২. সেই অর্থে কেনা জিনিস দ্বারা রান্না করা খাবার খাওয়ার বিধান: এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি নীতি প্রযোজ্য। ইসলামী ফিকহের নিয়ম হলো:
"الْحَرَامُ لَا يَتَعَدَّى إِلَى الْغَيْرِ" (হারাম বস্তু অপরের দিকে সম্প্রসারিত হয় না)
অর্থাৎ, কারো কাছে হারাম সম্পদ থাকার কারণে তার হাতের স্পর্শ বা তার রান্না করা খাবার অপরের জন্য হারাম হয়ে যায় না। যতক্ষণ পর্যন্ত না জানা যায় যে, নির্দিষ্ট খাবারটি হারাম অর্থ দিয়ে কেনা হয়েছে।
হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে বিশ্লেষণ:
-
রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী): ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) উল্লেখ করেছেন যে, কোনো ব্যক্তির সম্পদ মিশ্রিত (হালাল-হারাম) হলে তার কাছ থেকে হাদিয়া গ্রহণ করা বা তার দাওয়াতে অংশগ্রহণ করা মাকরূহ নয়, বরং জায়েজ। তবে যদি জানা যায় যে, নির্দিষ্ট জিনিসটি হারাম অর্থে কেনা, তাহলে তা খাওয়া জায়েজ নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৯তম খণ্ড, ৫৩০-৫৩১ পৃষ্ঠা)
-
ইমদাদুল ফাতাওয়া: হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহঃ) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "যে ব্যক্তির উপার্জনে হালাল-হারাম মিশ্রিত, তার রান্না করা খাবার খাওয়া যাবে কি?" উত্তরে তিনি বলেন, "যদি জানা না যায় যে, এই খাবারটি হারাম টাকায় কেনা হয়েছে, তবে খাওয়া জায়েজ। কারণ, হারাম সম্পদের সম্পর্ক নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে, খাবারের সাথে নয়।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫ম খণ্ড)
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত:
- আপনার আপু স্বয়ং কোনো গুনাহের কাজ করছেন না, তিনি শুধু রান্না করছেন।
- তার স্বামী ব্যাংকার বলে তার প্রতিটি খাবারই যে হারাম টাকায় কেনা, তা প্রমাণিত নয়। ব্যাংকের বেতনের মধ্যে হয়তো অল্প কিছু হালাল অংশও আছে, আবার হারাম অংশও (সুদী লেনদেনের প্রসেসিং ফি) আছে। এটি একটি মিশ্রিত (মাখলুত) সম্পদ।
- যেহেতু আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন না যে, এই নির্দিষ্ট খাবারটি হারাম টাকায় কেনা হয়েছে, তাই এটি খাওয়া জায়েজ।
তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নসীহত:
১. ভালোবাসা ও সহানুভূতির সাথে নিষেধ করা: আপনার উচিত তাকে ভালোবেসে এবং নম্রভাবে বোঝানো যে, তার স্বামীর ব্যাংক চাকরি সুদী লেনদেনের সাথে জড়িত, যা ইসলামে হারাম। তিনি যেন তার স্বামীকে উৎসাহিত করেন একটি হালাল পেশা বা চাকরি বেছে নেওয়ার জন্য। এটি একটি সাওয়াবের কাজ হবে।
২. খাবার গ্রহণ: যেহেতু খাবারটি জায়েজ, তাই আপনি তা খেতে পারেন। তবে মনে মনে এই বিশ্বাস রাখবেন না যে, এটি হারাম। বরং এটিকে একটি সাধারণ হালাল খাবার হিসেবেই গ্রহণ করুন।
৩. সতর্কতা: যদি কোনো দিন নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, নির্দিষ্ট খাবারটি হারাম টাকায় কেনা হয়েছে, তাহলে সেদিন তা খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।