প্রস্রাবের পর ফোটা পড়ার সমস্যায় করণীয় কি?
Taharah Purity · Hanafi
Question
আমি কিছু বছর যাবৎ একটা সমস্যায় আছি, দৈনিক ৫-৬ বার প্রসাব করার পর পানি দিয়ে ধুয়ে পবিত্র হয়ে এসে আমি যদি কোথায় বসি বা নামাযের সেজদায় যায় অথবা হাটলে তখন ১বা ২ ফোটা প্রসাব এর ফোটা বের হয় প্রসাবের নালী হতে। বিষয়টি খুবই বিরক্তিকর। কেননা অনেক সময় দেখা যায় প্রসাব শেষে ওযু করার পর জামাতে সেজদায় গেলে, সেজদা অবস্হায় সে প্রসাবের ফোটা বের হয়ে অপবিত্র করে দেয়।
এখন আমাকে কিছু জওয়াব দিয়ে সাহায্য করুন।
১| প্রসাবের অতিরিক্ত ফোটা দ্রত বের হওয়ার জন্য কি কি উপায় অবলম্বন করা উচিত? সবচেয়ে কার্যকর উপায়টি বললে খুশি হবো।
২| আমার এমন অবস্থায় বার বার পানি দিয়ে ধৌত করা কষ্টকর এবং প্যান্ট ভিজিয়ে দেয়। এখন আমি যদি সেই বের হওয়ার অতিরিক্ত ১/২ ফোটা প্রসাব টিস্যু পেপার দিয়ে মুছে ফেলি তাহলে পবিত্র অর্জন হবে কি?
৩| টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলার পর আর পানি ব্যবহার না করে সোজা ওযু করে ফেললে ওযু হবে কিনা?
আপনাদের উত্তরের আশায়।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার সমস্যাটি (প্রস্রাবের পর ফোটা ফোটা প্রস্রাব বের হওয়া) চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় "Post-Micturition Dribble" (PMD) নামে পরিচিত। এটি অনেক পুরুষের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে এবং এটি একটি পরিচিত সমস্যা। ফিকহের দৃষ্টিতে এটি উযর (অপারগতা/বাধ্যতামূলক অবস্থা) হিসেবে গণ্য হবে যদি এটি এমন পরিমাণে হয় যে, প্রতিটি ওয়াক্তের নামাজের সময় অন্তত একবার বা তার বেশি এই সমস্যা হয় এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।
আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর নিম্নরূপ:
১. প্রস্রাবের অতিরিক্ত ফোটা দ্রুত বের হওয়ার উপায়:
আপনি যে সমস্যায় ভুগছেন, তা দূর করার জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানসম্মত কিছু উপায় অবলম্বন করা জরুরি। ফিকহের দৃষ্টিতে এর জন্য ইস্তিফারাগ (استفراغ) বা প্রস্রাব সম্পূর্ণরূপে বের করে দেওয়ার পদ্ধতি অনুসরণ করা সুন্নত।
সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলো হলো:
- ইস্তিফারাগ (Istifaragh): প্রস্রাব শেষে প্রস্রাবের নালীতে (মাথায়) ৩ বার চাপ দেওয়া বা টোকা দেওয়া, যাতে ভেতরে থাকা শেষ ফোঁটাগুলো বেরিয়ে আসে। এটি করার পর কিছুক্ষণ (যেমন: ১-২ মিনিট) হাঁটাহাঁটি করা বা কাশি দেওয়া, যাতে ভেতরে জমে থাকা পানি বা প্রস্রাব বেরিয়ে যায়।
- চিকিৎসকের পরামর্শ: এটি একটি শারীরিক সমস্যা। তাই একজন ভালো ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রোস্টেটের সমস্যা, মূত্রনালীর সংকোচন বা অন্যান্য শারীরিক কারণ থাকলে তা চিকিৎসার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। এটিই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
- পানি পান: পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করলে প্রস্রাবের ঘনত্ব কমে যায়, ফলে ফোঁটা পড়ার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে।
২. টিস্যু পেপার দিয়ে মুছে ফেললে পবিত্র হবে কি?
হ্যাঁ, হবে। ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, পবিত্রতা অর্জনের জন্য পানি দিয়ে ধোয়া (ইস্তিঞ্জা) এবং টিস্যু/পাথর/কাগজ দিয়ে মুছে ফেলা (ইস্তিজমার) — উভয়টিই বৈধ।
- শর্ত: টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলার সময় অন্তত ৩ বার মুছতে হবে (অথবা যতবার মুছলে স্থানটি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায় এবং কোনো আর্দ্রতা/দাগ না থাকে ততবার)। যদি ৩ বার মুছার পরও ভেজা ভাব থাকে, তাহলে আরও মুছতে হবে যতক্ষণ না স্থানটি শুকিয়ে যায়।
- বিস্তারিত: টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলার পর যদি স্থানটি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায় এবং কোনো প্রকার আর্দ্রতা বা প্রস্রাবের চিহ্ন না থাকে, তাহলে পবিত্রতা অর্জিত হবে। (রদ্দুল মুহতার, ১/৩৪৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৭)
৩. টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলার পর পানি ব্যবহার না করে ওযু করলে ওযু হবে কি?
হ্যাঁ, ওযু হবে। যদি আপনি টিস্যু দিয়ে ভালোভাবে মুছে স্থানটি শুকিয়ে ফেলেন, তাহলে আর পানি দিয়ে ধোয়ার প্রয়োজন নেই। এরপর সরাসরি ওযু করলে ওযু সহীহ হবে।
- গুরুত্বপূর্ণ নোট: আপনার সমস্যা যদি উযর (অপারগতা) পর্যায়ে পৌঁছে যায়, অর্থাৎ প্রতিটি নামাজের সময় অন্তত একবার এই ফোঁটা বের হয় এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা আপনার পক্ষে সম্ভব হয় না, তাহলে আপনার জন্য প্রতিটি ওয়াক্তের নামাজের জন্য নতুন করে ওযু করা জরুরি। অর্থাৎ, যোহরের ওযু দিয়ে যোহরের নামাজ পড়বেন, আসরের ওয়াক্ত শুরু হলে আবার নতুন ওযু করবেন। এই অবস্থায় ওযুর পর যদি সামান্য ফোঁটা বের হয়, তাহলে আপনার ওযু ভঙ্গ হবে না এবং আপনি সেই ওযু দিয়েই নামাজ পড়তে পারবেন। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৪২; রদ্দুল মুহতার, ১/৩০৫)
সংক্ষিপ্ত সমাধান:
- চিকিৎসা নিন: এটি মূল সমস্যার সমাধান করবে।
- ইস্তিফারাগ করুন: প্রস্রাবের পর নালীতে চাপ দিয়ে শেষ ফোঁটা বের করে নিন।
- টিস্যু ব্যবহার করুন: বের হওয়া ফোঁটা টিস্যু দিয়ে ৩ বার বা স্থান শুকানো পর্যন্ত মুছে ফেলুন। এতে পবিত্রতা অর্জিত হবে।
- উযরের বিধান: যেহেতু এটি দীর্ঘদিনের সমস্যা, তাই সম্ভবত আপনি উযরের (অপারগতার) পর্যায়ে পড়েছেন। প্রতিটি ওয়াক্তের জন্য নতুন ওযু করুন এবং ওযুর পর ফোঁটা বের হলেও নামাজ পড়ুন। এতে আপনার নামাজ সহীহ হবে এবং আপনি মানসিক প্রশান্তি পাবেন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সম্পূর্ণ সুস্থতা দান করুন এবং আপনার সমস্যা দূর করে দিন। আমিন।