শিরক কী, জ্বিনের শর্ত পূরণ করা কি শিরক?
Faith and Belief · Hanafi
Question
কেউ যদি সরাসরি শিরকি কাজ করে তাহলে তাকে কিভাবে বুঝানো উচিত???
আরো যেহেতু গ্রামের মানুষ তারা সেটা বুঝতেই চাইবেনা এখন আমিও ছোট মানুষ কিভাবে বুঝাবো বুঝতে পারছিনা এসব শিরোকি কাজ করলে আল্লাহ হেদায়েত দিক মাফ করুক।
এখন আমি তাদের সামনা সামনি বলতেও পাইছিনা। এখন কোন উপায়ে বলবো??? আর যদি নাও বলি কিছু আমার কি গুনাহ হবে???
আর আমি যদি ই বিষয়ে লিখে দি আর কারো মাধ্যমে দি এটা কি ভালো হবে??? আর লিখলে কি কি লিখবো যাতে সেই কাজ টা আল্লাহর রহমতে না করে।
কাহিনী হচ্ছে যে একটা ছেলে আছে একটা মহিলার এখন ওই ছেলেটার নাকি ঘরে জীন ধরেছে। এখন সবাই যখন বলছে ওর ঘাড় থেকে বের হও তখন ওই জীন বলেছে আমার জন্যে একটা সাদা মোরগ আর সাদা মুরগি আর ১১ গজ কালো কাপড় চেয়েছে বলেছে একটা মহিলার কাছে দিতে এটা শিরোক না??? এখন আমি বুঝতে পারছিনা আমাকে হেল্প করেন
Answer
শিরক বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার উদ্বেগ ও দ্বীনি আগ্রহ সত্যিই প্রশংসনীয়। নিচে ধাপে ধাপে উত্তর দেওয়া হলো:
১. শিরক কী এবং এর গুরুত্ব
শিরক হলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে বা কোনো কিছুকে আল্লাহর সাথে শরীক করা। এটি ইসলামের সবচেয়ে বড় গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না; তবে তা ছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" (সূরা আন-নিসা: ৪৮)
২. জ্বিনের দেওয়া শর্ত (সাদা মোরগ, মুরগি ও কালো কাপড়) কি শিরক?
হ্যাঁ, এটি শিরক। কারণ:
- জ্বিনকে কিছু দেওয়ার বিনিময়ে তার শর্ত মানা আল্লাহর পরিবর্তে জ্বিনের আনুগত্য করা।
- জ্বিনকে সন্তুষ্ট করার জন্য পশু উৎসর্গ করা বা কাপড় দেওয়া—এটি জ্বিনের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ, যা শিরক।
- ইসলামে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই কুরবানী/উৎসর্গ করা যায়। আল্লাহ বলেন:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ "বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—সবই আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের রব।" (সূরা আল-আনআম: ১৬২)
রদ্দুল মুহতার (৫/২৭২) এ উল্লেখ আছে যে, জ্বিন বা অন্য কারো নামে পশু যবেহ করা হারাম ও শিরক।
৩. কীভাবে বুঝাবেন?
ক. কৌশল ও পদ্ধতি:
-
হিকমত ও নম্রতা সহকারে বুঝান। আল্লাহ বলেন:
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ "তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশ দ্বারা আহ্বান কর।" (সূরা আন-নাহল: ১২৫)
-
সরাসরি সমালোচনার বদলে ভালোবাসা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলুন।
-
কুরআন-হাদীসের সহজ দলীল উপস্থাপন করুন।
-
জ্বিন সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিন—জ্বিন আল্লাহর সৃষ্টি, তাদের কোনো ক্ষমতা নেই আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। আল্লাহ বলেন:
وَأَنَّهُ لَمَّا قَامَ عَبْدُ اللَّهِ يَدْعُوهُ كَادُوا يَكُونُونَ عَلَيْهِ لِبَدًا "আর যখন আল্লাহর বান্দা তাঁকে ডাকতে দাঁড়াল, তখন তারা (জ্বিনেরা) তার চারপাশে ভিড় জমালো।" (সূরা আল-জ্বিন: ১৯)
-
ভয় দেখানোর বদলে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার কথা বলুন।
খ. লিখিতভাবে বুঝানোর উপায়:
আপনি যদি সরাসরি বলতে না পারেন, তাহলে চিঠি বা লিফলেট লিখে দেওয়া উত্তম। এতে লজ্জা এড়ানো যায় এবং লেখা স্থায়ী থাকে। লিখতে পারেন:
- শিরকের ভয়াবহতা
- জ্বিনের প্রকৃত অবস্থা
- আল্লাহর কাছে সরাসরি সাহায্য চাওয়ার গুরুত্ব
- রুকইয়াহ (কুরআন দ্বারা চিকিৎসা) এর বৈধতা
৪. না বললে আপনার গুনাহ হবে কি?
আপনার উপর জ্ঞান দান করা ফরযে কেফায়া—যদি একজন আলেম বা অন্য কেউ বুঝিয়ে থাকে, তাহলে আপনার উপর থেকে দায়িত্ব সরে গেছে। তবে আপনি যদি জানেন এবং কেউ না বুঝায়, তাহলে আপনার উপরও দায়িত্ব আছে।
তবে মনে রাখবেন: কাউকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া ফরয হলেও, কারো গুনাহের দায়িত্ব আপনার উপর নেই। আপনি যদি নম্রভাবে বুঝানোর চেষ্টা করেন এবং তারা না শোনে, তাহলে আপনার কোনো গুনাহ হবে না। আল্লাহ বলেন:
وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ "রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।" (সূরা আন-নূর: ৫৪)
৫. জ্বিনের শর্ত পূরণ না করলে করণীয়
- জ্বিনের শর্ত পূরণ করা যাবে না—এটা শিরক।
- আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন—আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ুন।
- আলেম বা মুফতির কাছে যান—যিনি কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী রুকইয়াহ করতে পারেন।
- মসজিদের ইমাম বা স্থানীয় আলেমকে বিষয়টি জানান।
৬. সংক্ষিপ্ত পরামর্শ
| করণীয় | বর্জনীয় | |---------|----------| | নম্রভাবে বুঝানো | রাগ বা তর্ক করা | | কুরআন-হাদীসের দলীল দেওয়া | কুসংস্কার ছড়ানো | | আল্লাহর কাছে দোয়া করা | জ্বিনের শর্ত মানা | | আলেমের সাহায্য নেওয়া | নিজে ঝুঁকি নেওয়া |
৭. দোয়া
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ "হে আমাদের রব! আমাদের হৃদয়কে সৎপথে প্রতিষ্ঠিত রাখার পর বক্র করো না এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান কর। নিশ্চয়ই তুমিই মহাদাতা।" (সূরা আলে ইমরান: ৮)
আল্লাহ তাআলা আপনাকে এবং সেই পরিবারকে হেদায়েত দান করুন। আমীন।