রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে তালাক দেওয়ার পর অস্বীকার করলে কি তালাক গণ্য হবে?
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্নকারী বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার স্বামী রাগের মাথায় একাধিকবার তালাক দিয়েছেন এবং পরে বলেছেন যে তিনি মনে করতে পারছেন না কী বলেছেন। এই বিষয়ে ইসলামী বিধান অনুযায়ী নিম্নে উত্তর প্রদান করা হলো:
মূলনীতি: রাগের অবস্থায় তালাক
রাগের অবস্থায় তালাক দেওয়া সম্পর্কে ইসলামী পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উল্লেখ করা হলো:
১. চরম রাগ (যা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে)
যদি রাগ এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, ব্যক্তি তার কথা ও কাজ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকে, নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখন সেই অবস্থায় দেওয়া তালাক বৈধ নয় বলে অধিকাংশ পণ্ডিতগণ মত দিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لَا طَلَاقَ وَلَا عِتَاقَ فِي إِغْلَاقٍ "বন্ধ অবস্থায় তালাক নেই এবং দাসমুক্তিও নেই।" (আবু দাউদ: ২১৯৩, ইবনে মাজাহ: ২০৪৬)
ইমাম আহমাদ ও অন্যান্য পণ্ডিতগণ "إغلاق" (ইগলাক) দ্বারা চরম রাগকে বুঝিয়েছেন, যা ব্যক্তির জ্ঞান ও নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেয়।
২. মাঝারি রাগ (যা নিয়ন্ত্রণে থাকে)
যদি রাগ থাকে কিন্তু ব্যক্তি তার কথা সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, তবে সেই অবস্থায় দেওয়া তালাক বৈধ বলে গণ্য হবে।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
"যদি রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ব্যক্তি কী বলছে তা জানে না, তখন তালাক কার্যকর হবে না। কিন্তু যদি সে জানে যে সে তালাক দিচ্ছে, তবে রাগ থাকা সত্ত্বেও তালাক কার্যকর হবে।"
৩. শয়তানের প্ররোচনায় তালাক
শয়তানের প্ররোচনায় তালাক দেওয়া হলে তা কার্যকর হবে, কারণ শয়তানের প্ররোচনা ব্যক্তির ইচ্ছা ও জ্ঞানকে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে না। তবে যদি শয়তানের প্ররোচনা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, তখন ভিন্ন কথা।
আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- আপনার স্বামী রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন
- নিজের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না
- এমনকি নিজের ক্ষতি ভাঙচুর পর্যন্ত করেন
- পরে মনে করতে পারেন না তিনি কী বলেছেন
যদি বাস্তবেই তিনি রাগের সময় সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং নিজের কথা সম্পর্কে সচেতন না থাকেন, তবে সেই অবস্থায় দেওয়া তালাক কার্যকর হবে না। কারণ এটি "ইগলাক" (বন্ধ অবস্থা) এর অন্তর্ভুক্ত।
তবে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত: এটি প্রমাণ করতে হবে যে তিনি সত্যিই এমন চরম রাগে ছিলেন যে, তিনি নিজের কথা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। শুধু "আমার মনে নেই" বলা যথেষ্ট নয়।
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ)-এর মত
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
"রাগ তিন প্রকার: ১. এমন রাগ যা জ্ঞান সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দেয় - এ অবস্থায় তালাক কার্যকর হয় না। ২. এমন রাগ যা জ্ঞান নষ্ট করে না কিন্তু নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমিয়ে দেয় - এ অবস্থায় তালাক কার্যকর হয়। ৩. মাঝামাঝি অবস্থা - এখানে বিচারক বা পণ্ডিতদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফয়সালা হবে।"
করণীয়
১. বিচারক বা স্থানীয় ইসলামী পণ্ডিতের কাছে যান: আপনার এলাকার কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা ইসলামী বিচারকের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করুন। তারা স্বামীর অবস্থা মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত দেবেন।
২. স্বামীর অবস্থা যাচাই: স্বামী সত্যিই রাগের সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন কিনা তা যাচাই করা জরুরি। যদি তিনি বারবার একই অবস্থার সৃষ্টি করেন এবং পরে বলেন "মনে নেই", তাহলে এটি সন্দেহজনক।
৩. তালাকের সংখ্যা গণনা: যদি তালাকগুলো কার্যকর হয়, তাহলে কয়টি তালাক হয়েছে তা গণনা করা জরুরি। তিন তালাক হলে স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যান (তালাকে মুগাল্লাযা)।
৪. সতর্কতা: ভবিষ্যতে রাগের সময় তালাক না দেওয়ার জন্য স্বামীকে সতর্ক থাকতে হবে এবং রাগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ নোট
-
তিন তালাক একসাথে: অনেক সালাফি পণ্ডিত (যেমন শায়খ ইবনে বাজ, শায়খ আলবানী, শায়খ ইবনে উসাইমীন) মনে করেন যে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া হারাম এবং এটি একটি তালাক হিসেবেই গণ্য হবে। তবে এটি কার্যকর হবে এবং স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য নতুন নিকাহ প্রয়োজন।
-
ভুল ধারণা: "আমি জানতাম না" বা "আমি ইচ্ছা করি নাই" বলা তালাককে অকার্যকর করে না যদি ব্যক্তি সচেতন অবস্থায় তা বলে থাকে।
সর্বশেষ পরামর্শ
আপনার উচিত একজন বিশ্বস্ত আলেমের কাছে সরাসরি বিষয়টি উপস্থাপন করা। তারা স্বামীর সাথে কথা বলে প্রকৃত অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত দেবেন। ইনশাআল্লাহ, যদি স্বামী সত্যিই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন রাগের সময়, তাহলে তালাক কার্যকর হবে না এবং আপনাদের সম্পর্ক ঠিক থাকবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
দলিলসমূহ:
- সূরা আন-নিসা: ১৯
- সূরা আত-তালাক: ১
- আবু দাউদ: ২১৯৩
- ইবনে মাজাহ: ২০৪৬
- তিরমিযী: ১১৭৭