অন্য কারো এটেনডেন্স/হাজিরা দেওয়া কি যাবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
সব ভার্সিটিতেই মোটামুটি এটেনডেন্স মার্ক থাকে। তো এই মার্ক টা এটেনডেন্স শীটে সাইন করলে পাওয়া যায়। ক্লাসের শুরুতে একটা শীট দেওয়া হয় সবাই সেখানে সাইন করে।কোনো শিক্ষক নিজে নাম ডেকে এটেনডেন্স নেন যেটা আমার অনেক ভালো লাগে কারণ কেউ তার প্রক্সি দিতে পারেনা। আবার কিছু কিছু শিক্ষক ক্লাস শেষে গুনে নেন যে মোট সাইন আর উপস্থিতি সমান কিনা এটাও অনেক ভালো।কিন্তু সমস্যা হলো অনেকে আছেন যারা এসব কিছুই করেন নাহ।যাস্ট শীট টা দেন আর সবাই সাইন করে। কেউ কেউ প্রক্সি দেয়।আমার এক ফ্রেন্ড আছে যার কিছু সমস্যার কারনে ক্লাসে আসতে পারেনা তো সে তার এটেনডেন্স টা দিতে বলে যেহেতু এখানে মার্কের বিষয় আছে। তার এটেনডেন্স দেয়া টা কি ঠিক হবে। যদি না হয় তাহলে তাকে বুঝাব যে এটা ঠিক নয়। কারণ তার যেহেতু দীনের বুঝ নেই সে ভাববে আমি হিংসাবসত বা অন্য কোনো কারনে এমন করছি। এখন কি করবো
Answer
এটেনডেন্সে প্রক্সি দেওয়ার বিধান
প্রশ্নের উত্তর:
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। আসুন আমরা কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
প্রক্সি দেওয়ার বিধান
আপনার বন্ধুর পক্ষে এটেনডেন্সে সাইন করা বা প্রক্সি দেওয়া জায়েয নয় এবং এটি গুনাহের কাজ। এর কারণসমূহ নিম্নরূপ:
১. প্রতারণা ও মিথ্যার শামিল
এটেনডেন্সে প্রক্সি দেওয়া মূলত প্রতারণা ও মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটেনডেন্সের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত উপস্থিতি যাচাই করা। কেউ অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও উপস্থিত দেখানো সম্পূর্ণ প্রতারণা।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আমাদের মধ্যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সহিহ মুসলিম: ১০১)
২. আমানতে খিয়ানত
এটেনডেন্স শিট শিক্ষকের কাছে একটি আমানত। এতে সাইন করা মানে এই ঘোষণা দেওয়া যে, "আমি উপস্থিত আছি"। প্রক্সি দেওয়ার মাধ্যমে এই আমানতে খিয়ানত করা হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আমানতসমূহ তার প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দিতে আদেশ করেন।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
৩. অন্যায়ভাবে মার্ক/নম্বর গ্রহণ
প্রক্সি দেওয়ার মাধ্যমে যে মার্ক পাওয়া যায়, তা অন্যায়ভাবে সম্পদ/সুবিধা গ্রহণের শামিল। হাদিসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি এমন কাজ করবে যা আমাদের আদেশের (দ্বীনের) সাথে সাংঘর্ষিক, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।" (সহিহ বুখারী: ২৬৯৭)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও অন্যান্য হানাফি ফকিহগণ প্রতারণা ও মিথ্যার মাধ্যমে কোনো সুবিধা গ্রহণকে সম্পূর্ণ হারাম বলেছেন। **
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি) তে বলা হয়েছে:
"যে ব্যক্তি মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় বা প্রতারণা করে, সে গুনাহগার হবে এবং এর মাধ্যমে প্রাপ্ত কোনো সুবিধা তার জন্য হালাল নয়।"
আপনার করণীয়
১. বন্ধুকে বুঝানোর পদ্ধতি
আপনি আপনার বন্ধুকে নিম্নোক্তভাবে বুঝাতে পারেন:
-
ভালোবাসা ও সহানুভূতির সাথে: তাকে বলুন, "ভাই, আমি তোমার ভালোর জন্যই বলছি। ইসলামে মিথ্যা ও প্রতারণা হারাম। এটেনডেন্সে প্রক্সি দেওয়া একটি প্রতারণা, যা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়।"
-
দ্বীনের দৃষ্টিকোণ থেকে: তাকে বলুন, "আমরা যদি দুনিয়ার জন্য কিছু মার্ক পাই কিন্তু আখিরাতে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হয়, তাহলে এই মার্কের কোনো মূল্য থাকবে না।"
-
বিকল্প পরামর্শ দিন: তাকে বলুন, "তোমার সমস্যার কারণে ক্লাসে আসতে পারছ না, তুমি শিক্ষকের সাথে কথা বলে বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারো। শিক্ষক হয়তো তোমার সমস্যা বুঝবেন।"
২. নিজে প্রক্সি দেওয়া থেকে বিরত থাকুন
আপনি নিজেও কখনো কারো পক্ষে প্রক্সি দেবেন না, এমনকি বন্ধুর অনুরোধেও নয়। কারণ এটি আপনার জন্যও গুনাহের কাজ।
৩. শিক্ষককে বিষয়টি অবহিত করা
যদি সম্ভব হয়, আপনি শিক্ষককে জানাতে পারেন যে এটেনডেন্স শিটে প্রক্সি দেওয়া হচ্ছে। তবে এটি এমনভাবে করবেন যেন আপনার নামে কোনো অভিযোগ না আসে এবং আপনি ফিতনা সৃষ্টি না করেন।
গুরুত্বপূর্ণ নোট
- দ্বীনের বুঝ না থাকা: আপনার বন্ধুর দ্বীনের বুঝ না থাকার কারণে সে যদি আপনার কথা না মানে, তাহলে আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনি তাকে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন, এর বেশি আপনার দায়িত্ব নয়।
- হিংসার অভিযোগ: আপনি যদি তাকে ভালোবেসে ও নম্রভাবে বুঝান, তাহলে সে হিংসার অভিযোগ করবে না। তবে যদি তবুও সে ভুল বোঝে, তাহলে আপনার বিবেক পরিষ্কার থাকবে।
দোয়া ও তাওফিক
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্য কথা বলার এবং প্রতারণা থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সূরা আল-বাকারা (২:১৮৮): "আর তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং জেনে-শুনে মানুষের সম্পদের একাংশ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে শাসকদের কাছে পেশ করো না।"