বিদেশে রেস্তোরাঁয় শেফ হিসেবে হারাম খাবার বিক্রির প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে উপার্জন হারাম হবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তি বিদেশে একটি রেস্তোরাঁয় শেফ হিসেবে চাকরি করছেন, যেখানে হারাম খাবার (যেমন শূকরের মাংস, জবাইকৃত নয় এমন প্রাণী, মদ বা নেশাজাতীয় দ্রব্য) বিক্রি হয়। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, এমন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা এবং তা থেকে উপার্জন করা হারাম ও নাজায়েজ। নিম্নে এর বিস্তারিত দলিল ও করণীয় উল্লেখ করা হলো:
১. উক্ত ব্যক্তির উপার্জনের বিধান
-
হারাম উপার্জন: যেহেতু তিনি এমন একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করছেন যেখানে হারাম খাবার প্রস্তুত ও বিক্রি হয়, তাই তাঁর পুরো বেতন বা উপার্জন হারাম হবে। এমনকি যদি তিনি শুধুমাত্র হালাল পদ রান্না করেন, তবুও প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসা হারাম হওয়ায় তাঁর উপার্জন পবিত্র নয়।
দলিল:- কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না।" (সূরা বাকারা: ১৮৮)
- হাদিসে এসেছে: "নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।" (মুসলিম, ১০১৫)
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: "যে ব্যক্তি হারাম কাজে সহযোগিতা করে, তার উপার্জন হারাম।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৪)
-
শরিয়াহ সমাধান:
- তাকে তওবা করে এই চাকরি ছেড়ে দিতে হবে এবং হালাল উপার্জনের পথ খুঁজতে হবে।
- পূর্বের উপার্জিত অর্থ যদি এখনও তার কাছে থাকে, তবে তা ছেড়ে দিতে হবে (অর্থাৎ তার মালিকানা থেকে বের করে দিতে হবে)। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে সাদাকাহ করে দেবে, কিন্তু নিজে ব্যবহার করবে না।
- ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: "হারাম উপার্জন তওবার পর সাদাকাহ করা ওয়াজিব।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৪)
২. পরিবারের সদস্যদের করণীয়
যখন তিনি বিদেশ থেকে আসবেন এবং পরিবারের সাথে ঘুরতে যাবেন বা খাবার খাবেন, তখন নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মেনে চলা জরুরি:
ক. হারাম অর্থে খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকা
-
পরিবারের সদস্যরা তাঁর হারাম উপার্জনের অর্থে কেনা কোনো খাবার বা পানীয় গ্রহণ করতে পারবে না। এটি নিজেদের জন্য হারাম হবে।
দলিল:- কুরআনে ইরশাদ: "তোমরা হারাম জিনিস খেয়ো না।" (সূরা মায়িদা: ৮৮)
- হাদিস: "যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে এবং সেটা নিজে খায়, তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।" (তিরমিজি, ১২১৫)
-
পরিবারের কর্তব্য:
- তাকে সদাচারের সাথে বুঝিয়ে তওবা ও হালাল পেশায় আসার পরামর্শ দেওয়া।
- তাঁর সাথে ঘোরাফেরা বা খাওয়া-দাওয়ায় হালাল অর্থে (যেমন নিজেদের বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের হালাল উপার্জন) খরচ করা।
- যদি তিনি নিজের অর্থে খাবার কিনতে চান, তবে পরিবারের সদস্যরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেবেন যে তারা তাঁর হারাম অর্থে তৈরি বা কেনা খাবার গ্রহণ করবেন না। তবে সম্পর্কের কারণে তাকে দূরে ঠেলে দেওয়া যাবে না; বরং ভালোবাসা ও হিকমতের সাথে বুঝাতে হবে।
খ. সদাচার ও দ্বীনি নসিহত
- পরিবারের সদস্যদের উচিত তাকে ভালোবাসা ও সম্মানের সাথে হারাম উপার্জনের ভয়াবহতা বোঝানো।
- হাদিস: "তোমরা পরস্পর ভালোবাসো এবং নেক কাজের আদেশ করো।" (বুখারি, ৫৭৭)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৫) তে এসেছে: "হারাম উপার্জনকারীর সাথে সংশ্লিষ্টতা রাখা জায়েজ, তবে তার অর্থ ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।"
গ. তওবা ও সংশোধনের উৎসাহ
- তাকে হালাল পেশায় (যেমন শুধুমাত্র হালাল খাবার পরিবেশনকারী রেস্তোরাঁ বা অন্য বৈধ কাজ) চাকরি নিতে উৎসাহিত করা।
- কুরআন: "আল্লাহ তোমাদের জন্য জীবিকা হালাল করেছেন।" (সূরা ত্বাহা: ৮১)
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
- উক্ত ব্যক্তির উপার্জন: আংশিক হারাম। যতটকু সে হারাম খাবার সরবরাহ করে,ততটুকু কাজের ইনকাম হারাম। যতটকু সে হালাল খাবার সরবরাহ করে,ততটুকু কাজের ইনকাম হালাল। তাকে অবিলম্বে চাকরি ছেড়ে তওবা করতে হবে এবং পূর্বের অর্থ সাদাকাহ করতে হবে।
- পরিবারের করণীয়: তার হারাম অর্থে কোনো খাবার গ্রহণ করবে না। তাকে ভালোবেসে নসিহত করবে এবং হালাল পেশায় আসতে সাহায্য করবে। তার সাথে ঘুরতে গেলে নিজেদের হালাল অর্থে খরচ করবে।
আল্লাহ তওবা কবুল করেন এবং হালাল রিজিকের ব্যবস্থা করেন।
উল্লেখিত কিতাব:
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৩২)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৫)
- রদ্দুল মুহতার (৬/৩৮৩-৩৮৪)
- বেহেশতি জেওর (৩/২৪)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ (৫/৩৪৫)