জ্বীন ও শয়তানের পার্থক্য, কারিন জ্বীন, হায়েজ অবস্থায় রুকইয়াহ করা ও করানোর বিধান—হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
ওস্তায,
প্রশ্ন:
১। জ্বীন এবং শয়তানের মধ্যে পার্থক্য কি?
২। জন্মের পর থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে একজন কারিন জ্বীন থাকে এমনটাই শুনেছিলাম। তবে সম্প্রতি একজন আলেমের থেকে শুনলাম একজন কারিন জ্বীন এবং একজন কারিন শয়তান থাকে। ঐ ব্যক্তির মৃত্যুর পর কারিন জ্বীন ইল্লিয়্যিন/সিজ্জিনে চলে যায় এবং কারিন শয়তান ঐ ব্যক্তির কবর বা দুনিয়াবি কোনো নোংরা যায়গায় বসবাস করে। আলেমের কথা কতটুকু সত্য?
৩। রাক্বী তার হায়েজ অবস্থায় রুকইয়াহ করাতে পারবে?
৪। হায়েজগ্রস্থ অবস্থায় কোনো রোগীর রুকইয়াহ করানো যাবে?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
১. জ্বীন এবং শয়তানের মধ্যে পার্থক্য:
জ্বীন একটি সৃষ্টিজগতের নাম, যা আগুন থেকে সৃষ্ট। এদের মধ্যে মুমিন, কাফির, ফাসিক সব ধরনের মানুষ পাওয়া যায়। অপরদিকে, শয়তান হলো জ্বীন জাতিরই একটি দল, যারা কুফরি ও পথভ্রষ্টতায় নিমগ্ন। শয়তান শব্দটি মূলত এমন প্রতিটি জ্বীন বা মানুষকে বোঝানো হয় যে আল্লাহর অবাধ্য ও পথভ্রষ্টকারী। পবিত্র কুরআনে ইবলিশকে জ্বীন বলা হয়েছে (সূরা আল-কাহফ: ৫০)। সুতরাং, প্রত্যেক শয়তান জ্বীন, কিন্তু প্রত্যেক জ্বীন শয়তান নয়। (তাফসিরে মা'আরিফুল কুরআন, সূরা আল-বাকারা: ১৪; সূরা আন-নাস: ৬)
২. কারিন জ্বীন ও কারিন শয়তান সম্পর্কে আলেমের বক্তব্য:
আপনি যে কথা শুনেছেন, তা আংশিক সঠিক। হাদিসে এসেছে, প্রত্যেক মানুষের সাথে একটি করে কারিন (সঙ্গী) জ্বীন নিয়োজিত থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে যে কারিন ছিল, আল্লাহ তাকে ইসলাম গ্রহণে সহায়তা করেছেন, ফলে তিনি তার কাছে ভালো ছাড়া অন্য কিছু বলেন না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮১৪)
তবে "কারিন শয়তান" বলতে সাধারণত সেই জ্বীনকেই বোঝানো হয়, যে মানুষকে কুমন্ত্রণা দেয়। অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষের সাথে একজন করে জ্বীন থাকে; সে যদি মুমিন হয় তবে সে ভালো কাজে সহায়তা করে, আর যদি কাফির বা ফাসিক হয় তবে সে শয়তানের ভূমিকা পালন করে। (ফাতহুল বারী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩৩৭ পৃষ্ঠা)
মৃত্যুর পর কারিন জ্বীন ইল্লিয়্যিন বা সিজ্জিনে চলে যায় এবং কারিন শয়তান কবরে বা নোংরা জায়গায় বসবাস করে—এই কথাটি কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত নয়। এটি একটি অনুমানমূলক বা দুর্বল বক্তব্য। কুরআন ও হাদিসে এর কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই। তাই এই বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে কিছু বলা যাবে না। (ফাতাওয়া উসমানি, ১ম খণ্ড, ২৫৪ পৃষ্ঠা)
৩. রাক্বী (যে রুকইয়াহ করে) তার হায়েজ অবস্থায় রুকইয়াহ করানো:
হ্যাঁ, হায়েজ অবস্থায় নারী রাক্বী অন্য রোগীর উপর রুকইয়াহ করতে পারবে। রুকইয়াহ মূলত কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও দরুদ পাঠের মাধ্যমে হয়, যা মুখে উচ্চারণ করা হয়। হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা নিষিদ্ধ, তবে দোয়া, দরুদ, আয়াতুল কুরসি ইত্যাদি জিকির করা জায়েয। রুকইয়াহর ক্ষেত্রে যদি কুরআনের আয়াত মুখস্থ থাকে এবং তা দোয়া হিসেবে পড়া হয়, তবে তা জায়েয। তবে সরাসরি কুরআন স্পর্শ করা বা তিলাওয়াতের নিয়তে পড়া থেকে বিরত থাকবে। (রদ্দুল মুহতার, ১ম খণ্ড, ২৯৩ পৃষ্ঠা; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫ম খণ্ড, ৩৫৫ পৃষ্ঠা)
৪. হায়েজগ্রস্থ অবস্থায় কোনো রোগীর রুকইয়াহ করানো:
হ্যাঁ, হায়েজগ্রস্থ নারী রোগীকে রুকইয়াহ করাতে পারবে বা অন্য কেউ তার উপর রুকইয়াহ করতে পারবে। রুকইয়াহ করানো বা করানোর মধ্যে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। বরং রোগীকে কুরআনের আয়াত, দোয়া ও জিকির দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা জায়েয। হায়েজ হওয়ার কারণে রোগীর উপর রুকইয়াহ করা নিষিদ্ধ নয়। তবে রোগী নিজে যদি হায়েজ অবস্থায় কুরআন স্পর্শ করতে চায়, তবে তা করবে না; বরং মুখস্থ আয়াত বা দোয়া দ্বারা নিজে রুকইয়াহ করতে পারবে। (ফাতাওয়া উসমানি, ২য় খণ্ড, ১৮৫ পৃষ্ঠা; বেহেশতি জেওর, ২য় খণ্ড, ৩৮ পৃষ্ঠা)
উপসংহার: আপনার প্রশ্নগুলোর সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—জ্বীন ও শয়তান এক নয়, শয়তান জ্বীনেরই একটি দল। কারিন জ্বীন সম্পর্কে হাদিসে প্রমাণিত, তবে মৃত্যুর পর তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল নেই। হায়েজ অবস্থায় রুকইয়াহ করা ও করানো উভয়ই জায়েয, তবে কুরআন স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।