সুস্থ বোনের রোল দিয়ে অন্য কেউ কি ক্লাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
একজন মারাত্মক অসুস্থ বোন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইলম শিক্ষাতে খুব কঠিন অবস্থা নিয়েও লেগে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে, দুনিয়াবী সার্টিফিকেট পাবার জন্য কিংবা দুনিয়ার খ্যাতির লোভেও নয়।পড়াশোনা নিয়ে তিনি আল্লাহর জন্য অত্যন্ত সিরিয়াস মাশাআল্লাহ। অসুস্থতার জন্য ক্লাস এটেন্ড করতে উনার প্রচন্ড কস্ট হয় তাও ফুল এটেন্ডেন্স উনার আলহামদুলিল্লাহ। বর্তমানে উনি প্রায় মূমুর্ষর আগের ধাপে আছেন। তাও ইলম থেকে মাহরুম হতে চাননা।আল্লাহ মায়া করে এতদিন উনাকে নিজ অনুগ্রহে ১-১০ এর ভিতর সিরিয়ালে থাকার তৌফিক দিয়েছেন বারাক আল্লাহু ফিকুম
বর্তমানে তিনি এতটাই সিক ক্লাস টেস্ট এর ২ টা এক্সাম দিতে পারেননি জরিমানা দিয়ে এক্সাম দেওয়ার চেষ্টা করবেন।
প্রশ্ন হলো উনার রোল দিয়ে অন্য কোন বোন যদি জয়েন হন এবং উনি সুস্থ হয়ে পড়া গুলো কাভার করে নেন এতে কী তিনি অন্য বোনদের হক নষ্টের জন্য গোনাহগার হবেন কিনা? যেহেতু তিনি মাজুর।
এটেন্ডেন্স মার্ক এর জন্য উনি যদি নেয্য মেহনত করেও পিছিয়ে যান তবে আল্লাহর জন্য করা মেহনতে হতাশা আসতে পারে কেননা তিনি মারাত্মক লেভেল এর সিহর এর রোগী। এতে ইলম অর্জন এর স্পিরিট কমে যাওয়ার আশংকা থাকে+ শয়তানের ফাঁদে পরার রিস্ক থেকে যায় উনার অবস্থা এতটাই সিরিয়াস।
উনার রোল দিয়ে উনার সেন্সলেস এবনরমাল অবস্থায় অন্য কেউ জয়েন হলে মাসালা কী হবে?অন্য বোনদের হক নস্ট হবে কী?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আপনার অসুস্থ বোনের ইলম অর্জনের আগ্রহ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই সংগ্রাম সত্যিই প্রশংসনীয়। আল্লাহ তাকে পূর্ণ শিফা দান করুন এবং তার এই নিয়্যতকে কবুল করুন। (আমিন)
আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় হলো: অসুস্থতার কারণে ক্লাসে উপস্থিত থাকতে না পারা এবং অন্য কেউ তার রোল নম্বরে (Roll Number) উপস্থিত হয়ে পরীক্ষা দেওয়া বা ক্লাস করা—এতে কি তার উপর অন্য ছাত্রীদের হক নষ্ট করার গুনাহ হবে?
এখানে কয়েকটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে:
১. রোল নম্বর দিয়ে অন্য কেউ উপস্থিত হওয়া (Proxy/Impersonation) এর বিধান:
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজের পরিচয় গোপন করে বা অন্য কারো নামে পরীক্ষা দেওয়া বা উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রতারণা (Ghish) এবং ধোঁকাবাজি। এটি সম্পূর্ণ হারাম ও গুনাহের কাজ।
- হাদীসের দলীল: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "যে ব্যক্তি আমাদের মধ্যে প্রতারণা করল, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০১)
- ফিকহের নীতি: এটি একটি মিথ্যা ও জালিয়াতি। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ভঙ্গ করা হয় এবং অন্য ছাত্রীদের সাথে প্রতারণা করা হয়। কারণ, পরীক্ষায় বা উপস্থিতিতে যে নম্বর পাওয়া যায়, তা মূলত সেই ব্যক্তির প্রাপ্য নয়, যে পরীক্ষা দিল বা উপস্থিত হলো না।
২. অন্য বোনদের হক নষ্টের গুনাহ:
আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, "উনার রোল দিয়ে অন্য কেউ জয়েন হলে অন্য বোনদের হক নষ্ট হবে কী?"
উত্তর: হ্যাঁ, এটি অন্য বোনদের হক নষ্টের কারণ হতে পারে। কারণ:
- মেধা তালিকা (Merit List) ও নম্বরের ন্যায্যতা: উপস্থিতির নম্বরের ভিত্তিতে মেধা তালিকা তৈরি হয়। যদি একজন অসুস্থ ছাত্রীর পক্ষে অন্য কেউ উপস্থিতি নিশ্চিত করে, তাহলে সে যে নম্বর পাবে তা তার প্রকৃত প্রাপ্য নয়। এর ফলে যে বোন প্রকৃতপক্ষে উপস্থিত হয়ে ভালো নম্বর পেয়েছে, সে তার সঠিক অবস্থান (Rank) থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এটি স্পষ্টতই অন্য ছাত্রীদের হক নষ্ট করা।
- শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের হক: শিক্ষক মূল্যায়ন করেন সেই ছাত্রীকে, যে ক্লাসে ছিল না। ফলে শিক্ষকের মূল্যায়নও ভুল হয়। এটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ও শিক্ষকের হক নষ্ট করার সামিল।
৩. "মাজুর" (অপারগ) হওয়ার কারণে কি এই কাজ জায়েজ হবে?
আপনি উল্লেখ করেছেন, "যেহেতু তিনি মাজুর।" ইসলামী ফিকহে অসুস্থতা একটি বৈধ ওজর (excuse)। কিন্তু এই ওজর তাকে প্রতারণা করার অনুমতি দেয় না।
- মাজুরের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা: ইসলাম তাকে যে সুযোগ দিয়েছে তা হলো, সে অসুস্থতার কারণে ক্লাস করতে না পারলে বা পরীক্ষা দিতে না পারলে, সে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যেমন:
- অসুস্থতার ছুটি (Medical Leave) নেওয়া।
- শিক্ষকের সাথে সরাসরি কথা বলে বিষয়টি জানানো এবং তার অনুমতি নেওয়া।
- গুরুত্বপূর্ণ নীতি: "আল-মাজুরু লা ইয়াকুনু মাজুরান ফি হুকমিল গিশ" অর্থাৎ, যে ব্যক্তি অপারগ, তার অপারগতা তাকে প্রতারণার অনুমতি দেয় না। অসুস্থতা তার জন্য গুনাহ মাফের কারণ হতে পারে, কিন্তু অন্য কারো হক নষ্ট করার অনুমতি নয়।
৪. হতাশা ও শয়তানের প্ররোচনা সম্পর্কে:
আপনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, ন্যায্য মেহনত করেও পিছিয়ে গেলে তার মনে হতাশা আসতে পারে এবং শয়তানের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা আছে।
- হতাশা না করা: ইসলামে নিরাশা ও হতাশা হারাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন: "আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।" (সূরা যুমার: ৫৩)।
- নিয়তের মূল্য: আল্লাহর জন্য করা মেহনতের ফলাফল দুনিয়ার নম্বর বা সার্টিফিকেট নয়, বরং আল্লাহর কাছে তার নিয়ত ও চেষ্টার মূল্যায়ন হয়। হাদীসে আছে, "নিয়ত অনুযায়ীই আমলের ফল হয়ে থাকে।" (সহীহ বুখারী: ১)।
- শয়তানের ফাঁদ: শয়তান মানুষকে হতাশ করে এবং হারাম পথে পরিচালিত করতে চায়। তাই অসুস্থ বোনকে বুঝাতে হবে যে, অসুস্থতার কারণে যদি সে পিছিয়েও পড়ে, তবে তার জন্য আল্লাহর কাছে সওয়াব রয়েছে। তার জন্য উত্তম পথ হলো, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে চলা এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা। হারাম পথে (প্রতারণা করে) নম্বর পাওয়ার চেয়ে, ন্যায্য পথে কম নম্বর পাওয়া অনেক উত্তম এবং বরকতময়।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও মাসআলা:
১. উনার রোল দিয়ে অন্য কেউ জয়েন করা বা পরীক্ষা দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম, গুনাহের কাজ এবং প্রতারণা। এটি কোনো অবস্থাতেই জায়েজ নয়, যদিও তিনি মারাত্মক অসুস্থ হন। ২. এতে অন্য বোনদের হক নষ্ট হবে। যারা প্রকৃতপক্ষে পরীক্ষা দিচ্ছে বা ক্লাস করছে, তাদের নম্বর ও অবস্থানের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে। ৩. তিনি "মাজুর" হলেও এই প্রতারণার গুনাহ থেকে রেহাই পাবেন না। অসুস্থতা তার জন্য বৈধ বিকল্প ব্যবস্থা (যেমন: মেডিকেল সার্টিফিকেট দিয়ে ছুটি নেওয়া, শিক্ষকের সাথে কথা বলা) গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু হারাম কাজের অনুমতি দেয় না। ৪. তার করণীয়: উনার উচিত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষের সাথে তার অসুস্থতার কথা খোলাখুলি বলা এবং তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া। ইনশাআল্লাহ, তারা তার জন্য কোনো বৈধ ব্যবস্থা (যেমন: আলাদা পরীক্ষার সময়, বা উপস্থিতির জন্য বিশেষ ছাড়) করে দেবেন। আর যদি তাতে পিছিয়েও পড়তে হয়, তাহলে তা আল্লাহর কাছে তার জন্য উত্তম হবে, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তায়ালা তাকে পূর্ণ সুস্থতা দান করুন এবং তার ইলম অর্জনের এই পবিত্র নিয়তকে কবুল করুন। (আমিন)