আল্লাহর সিফতি নামে মানুষের নাম রাখা নিয়ে মন্তব্যের বিধান।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি: কুদ্দুস তো আল্লাহর সিফতি নাম
আমার স্ত্রী : ঠিক আছে, কিন্তু নাম টা একটু বুড়া মার্কা, আল্লাহর সিফতি নাম তো আরো সুন্দর সুন্দর আছে যা যুগের সাথে মানান সই,যেমন রাফি।
আমার স্ত্রী :(কিছুক্ষন পর) আমাদের বাপ চাচারা এই নাম গুলো রাখতে রাখতে পছাইলাইছে।।
আমার স্ত্রীর কথায় কি আল্লাহর সাথে বেয়াদবি মূলক কথা হয়? সে কি কাফের হয়ে গেছে.
(মূলত আল্লাহর কিছু নির্দিষ্ট নামের মিল রেখে বর্তমানে ছেলেদের নাম রাখা নিয়ে বলেছে,সকল নাম বা আল্লাহর উপর কোনো অবজ্ঞা ছিলো না)
Answer
আল্লাহর সিফতি নামে সন্তানের নাম রাখা এবং স্ত্রীর মন্তব্য প্রসঙ্গে
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আল্লাহর সিফতি নাম (যেমন: কুদ্দুস) সন্তানের নাম হিসেবে রাখা এবং স্ত্রীর এ সংক্রান্ত মন্তব্য নিয়ে বিধান জানতে চাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে স্ত্রীর উক্তিতে আল্লাহর সাথে বেয়াদবি হয়েছে কি না এবং সে কাফের হয়ে গেছে কি না—এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে।
উত্তর
১. আল্লাহর সিফতি নামে সন্তানের নাম রাখার বিধান
আল্লাহ তাআলার সিফতি নাম (গুণবাচক নাম) যেমন: কুদ্দুস, রহমান, রহিম, করিম ইত্যাদি নামে সন্তানের নাম রাখা জায়েয। তবে শর্ত হলো—নামের পূর্বে "আব্দ" (দাস) শব্দ যোগ করা যাবে না, যেমন: আব্দুল কুদ্দুস (কুদ্দুসের দাস) বলা যাবে না, বরং শুধু "কুদ্দুস" নাম রাখা যাবে। কারণ আল্লাহর গুণবাচক নামগুলো মানুষের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায়, যেমন: রহিম (দয়ালু), করিম (মহানুভব) ইত্যাদি।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন,
"আল্লাহর গুণবাচক নামসমূহ যেমন: রহিম, করিম, হাকিম ইত্যাদি নামে নাম রাখা জায়েয, কারণ এগুলো আল্লাহর যাতি নাম নয়, বরং সিফতি নাম।"
(রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪১৭)
২. "কুদ্দুস" নামের বিধান
"কুদ্দুস" (الْقُدُّوسُ) আল্লাহ তাআলার একটি সিফতি নাম, যার অর্থ "পবিত্র" বা "সমস্ত দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত"। এই নামে সন্তানের নাম রাখা জায়েয। সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে সালেহীনদের মধ্যে অনেকের নামই আল্লাহর সিফতি নামে ছিল।
৩. স্ত্রীর মন্তব্য সম্পর্কে বিধান
স্ত্রীর উক্তিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
১. "নামটা একটু বুড়া মার্কা" — এটি একটি সাধারণ মতামত বা রুচির প্রকাশ। এতে আল্লাহর সাথে বেয়াদবি নেই।
২. "আল্লাহর সিফতি নাম তো আরো সুন্দর সুন্দর আছে যা যুগের সাথে মানান সই, যেমন রাফি" — এটি আল্লাহর নামের মধ্যে তুলনা বা কোনো নামকে খারাপ বলা নয়, বরং তিনি আরও ভালো নাম পছন্দ করার কথা বলেছেন। এটি একটি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়।
৩. "আমাদের বাপ চাচারা এই নামগুলো রাখতে রাখতে পছাইয়া গেছে" — এটি একটি সাধারণ সামাজিক পর্যবেক্ষণ, যা অনেকেই করে থাকেন।
স্ত্রীর উক্তিতে শিরক বা কুফরি কিছু নেই। তিনি আল্লাহর কোনো নামকে অবজ্ঞা করেননি, আল্লাহর সাথে কোনো বেয়াদবি করেননি, বরং তিনি নামের আধুনিকতা ও সৌন্দর্যের কথা বলেছেন। এটি একটি স্বাভাবিক মানবিক পছন্দের বিষয়।
৪. কাফের হওয়ার প্রশ্নে
স্ত্রী কাফের হয়ে গেছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর হলো: না, সে কাফের হয়নি। তার উক্তিতে কুফরি বা শিরকের কোনো উপাদান নেই। ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, কাউকে কাফের বলার জন্য স্পষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নীতি হলো—যতক্ষণ না স্পষ্ট কুফরি কথা প্রমাণিত হয়, ততক্ষণ কোনো মুসলমানকে কাফের বলা যাবে না।
ইমাম তাহাবী (রহ.) বলেন
"আমরা কোনো মুসলমানকে কাফের বলি না, যতক্ষণ না তার কুফরি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।"
(আকীদা তাহাবী, বর্ণনা ৮৫)
৫. করণীয়
১. স্ত্রীকে বোঝানো উচিত যে, "কুদ্দুস" একটি পবিত্র ও অর্থবহ নাম, যা আল্লাহর সিফতি নাম। এই নামে নাম রাখা জায়েয এবং এতে কোনো দোষ নেই।
২. তবে স্ত্রীর পছন্দ অনুযায়ী "রাফি" (الرَّافِعُ - সম্মান প্রদানকারী) নামটিও আল্লাহর সিফতি নাম এবং এটি একটি সুন্দর নাম। এ নামেও সন্তানের নাম রাখা যেতে পারে।
৩. স্ত্রীকে কাফের বলা বা এমন অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। বরং তাকে বুঝিয়ে বলা উচিত যে, তার কথায় কোনো সমস্যা নেই, তবে "কুদ্দুস" নামটিও ভালো।
৪. সন্তানের নাম রাখার ক্ষেত্রে উভয়ের সম্মতিতে একটি সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখা উত্তম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"কিয়ামতের দিন তোমাদের নিজ নিজ নাম ও পিতার নামে ডাকা হবে। সুতরাং তোমরা সুন্দর নাম রাখো।"
(আবু দাউদ, হাদীস: ৪৯৪৮)
উপসংহার
স্ত্রীর উক্তিতে আল্লাহর সাথে বেয়াদবি বা অবজ্ঞা নেই, এবং সে কাফের হয়নি। এটি একটি সাধারণ মতামত ও পছন্দের বিষয়। সন্তানের নাম রাখার ক্ষেত্রে উভয়ের সম্মতিতে একটি সুন্দর নাম রাখা উত্তম। "কুদ্দুস" এবং "রাফি" উভয়ই আল্লাহর সিফতি নাম এবং উভয় নামে নাম রাখা জায়েয।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।