জেনা করার পর তওবার মাধ্যমে কীভাবে আল্লাহর ক্ষমা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া যায়?
Family Life · Hanafi
Question
এখন কি ভাবে সে এক জন ভালো বান্দা হতে পারবে। আল্লাহুর আজাব থেকে রক্ষা পাবে জানতে চাই।
Answer
জেনা সম্পর্কে ফতোয়া
প্রশ্ন: যদি কোনো অবিবাহিত ব্যক্তি জেনা (ব্যভিচার) করে ফেলে, তবে তার জন্য কি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার কোনো পথ নেই? বাংলাদেশে তো কোনো ইসলামি শাসক নেই। এখন কীভাবে সে একজন ভালো বান্দা হতে পারবে এবং আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা পাবে?
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর রহমত অপরিসীম। জেনা একটি গুরুতর গুনাহ হলেও, তওবার দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
"বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছে, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
জেনার শাস্তি ও তওবার শর্ত
১. দুনিয়ার শাস্তি (হদ্দ):
ইসলামি রাষ্ট্রে অবিবাহিত ব্যক্তির জন্য জেনার শাস্তি হলো ১০০টি বেত্রাঘাত (সূরা আন-নূর: ২)। তবে এই শাস্তি প্রযোজ্য তখনই, যখন:
- চারজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেবে অথবা
- ব্যক্তি নিজে স্বেচ্ছায় চারবার স্বীকারোক্তি দেবে
বাংলাদেশে ইসলামি শাসক না থাকায় এবং শরিয়তের আদালত না থাকায় এই হদ্দ কার্যকর করা সম্ভব নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, গুনাহ মাফের পথ বন্ধ।
২. তওবার শর্তাবলী:
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, তওবার জন্য তিনটি শর্ত:
- গুনাহ থেকে বিরত থাকা (যদি গুনাহটি আল্লাহর হকের সাথে সম্পর্কিত হয়)
- কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া
- ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা
যেহেতু জেনা আল্লাহর হকের সাথে সম্পর্কিত গুনাহ, তাই তওবার জন্য শুধু এই তিনটি শর্তই যথেষ্ট। কারো কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন নেই।
জেনাকারী ব্যক্তির জন্য করণীয়:
১. তওবা করা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ مِنْكَ وَلَا أُبَالِي
আল্লাহ তাআলা বলেন: "হে আদম সন্তান! তুমি যতক্ষণ আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে আশা করবে, ততক্ষণ আমি তোমার গুনাহ মাফ করে দেব, আমি পরোয়া করব না।" (তিরমিজি: ৩৫৪০)
২. গোপন রাখা:
জেনার গুনাহ প্রকাশ না করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
"যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে গোপন রাখবেন।" (মুসলিম: ২৫৯৯)
৩. নেক আমল বৃদ্ধি করা:
গুনাহের পর নেক আমল করলে তা গুনাহ মিটিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا
"গুনাহের পর নেক কাজ করো, তা গুনাহ মিটিয়ে দেবে।" (তিরমিজি: ১৯৮৭)
৪. বিবাহ করা:
অবিবাহিত ব্যক্তির জন্য উত্তম পথ হলো বিবাহ করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ
"হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে।" (বুখারি: ৫০৬৫)
গুরুত্বপূর্ণ নোট:
১. জেনার শাস্তি (হদ্দ) প্রসঙ্গে: ইসলামি রাষ্ট্রে হদ্দ কার্যকর করার জন্য কঠোর সাক্ষ্যপ্রমাণ প্রয়োজন। ব্যক্তি নিজে গুনাহ গোপন রাখলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) মাঈয (রা.)-কে বলেছিলেন: "তুমি হয়তো শুধু চুমু দিয়েছ বা স্পর্শ করেছ" — যেন তিনি স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করেন।
২. হতাশ না হওয়া: শয়তান মানুষকে হতাশ করে তওবা থেকে বিরত রাখতে চায়। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া নিজেই একটি বড় গুনাহ।
৩. গোপন রাখা ও তওবা: জেনার পর গোপন রেখে তওবা করাই উত্তম। প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই।
উপসংহার:
জেনা করার পরও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আন্তরিক তওবা করলে, গুনাহ থেকে বিরত থাকলে, অনুতপ্ত হয়ে ভবিষ্যতে না করার সংকল্প করলে আল্লাহ তা মাফ করে দেবেন। ইসলামি শাসক না থাকার কারণে হদ্দ কার্যকর না হওয়া মানে এই নয় যে, গুনাহ মাফের পথ বন্ধ। বরং তওবার দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত।
وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।