স্বামী তালাকের উদ্দেশ্য ছাড়া "এক ছাড়া দুই ছাড়া তিন ছাড়া" বললে কি তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথোপকথনের এক পর্যায়ে স্ত্রী বলেন "আপনি আমাকে ছেড়ে দেন তো"। এরপর স্বামী তালাকের উদ্দেশ্য ছাড়া হেসে হেসে "এক ছাড়া, দুই ছাড়া, তিন ছাড়া" উচ্চারণ করেন। এখন জানতে চাওয়া হয়েছে যে, তালাকের উদ্দেশ্য ছাড়া এভাবে "এক ছাড়া, দুই ছাড়া, তিন ছাড়া" বললে তালাক হবে কি না?
বিশ্লেষণ ও ফতোয়া
১. "তালাক" শব্দের ব্যবহার ও তার প্রভাব
ইসলামি ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, যদি কোনো স্বামী স্পষ্টভাবে "তালাক" শব্দ বা এর সমার্থক স্পষ্ট (সরীহ) শব্দ উচ্চারণ করেন, তবে তা তালাকের উদ্দেশ্য ছাড়া হলেও তালাক হয়ে যায়। কারণ, সরীহ (স্পষ্ট) শব্দে তালাক দিলে নিয়তের প্রয়োজন হয় না।
কিন্তু প্রশ্নে উল্লেখিত "এক ছাড়া, দুই ছাড়া, তিন ছাড়া" — এটি কি তালাকের সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ?
২. "ছাড়া" শব্দের ফিকহি অবস্থান
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে যে, "ছাড়া" বা "ত্যাগ করা" শব্দটি তালাকের কিনায়া (অস্পষ্ট/ইঙ্গিতপূর্ণ) শব্দ হিসেবে গণ্য। কিনায়া শব্দে তালাক হওয়ার জন্য নিয়ত (উদ্দেশ্য) শর্ত।
- সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ: তালাক, তালাক দিলাম, ছেড়ে দিলাম ইত্যাদি — এতে নিয়ত লাগে না।
- কিনায়া (অস্পষ্ট) শব্দ: ছাড়া, ত্যাগ, মুক্ত ইত্যাদি — এতে নিয়ত লাগে।
৩. "এক ছাড়া, দুই ছাড়া, তিন ছাড়া" বলার বিধান
আলোচ্য ক্ষেত্রে স্বামী "এক ছাড়া, দুই ছাড়া, তিন ছাড়া" বলেছেন। এটি তালাকের কিনায়া শব্দের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু স্বামীর তালাকের নিয়ত/উদ্দেশ্য ছিল না, বরং তিনি হেসে হেসে খেলার ছলে এ কথা বলেছেন, তাই তালাক পতিত হবে না।
৪. হানাফি ফিকহের দলিল
আল-হিদায়া ও রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
"কিনায়া শব্দে তালাক দেওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। যদি নিয়ত না থাকে, তবে তালাক পতিত হয় না।"
ফতোয়া আলমগীরী-তে বলা হয়েছে:
"যে সকল শব্দ তালাকের জন্য কিনায়া (অস্পষ্ট), সেগুলো দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত বা দালালাতুল হাল (পরিস্থিতির ইঙ্গিত) শর্ত।"
৫. স্ত্রীর "আপনি আমাকে ছেড়ে দেন তো" বলার প্রভাব
স্ত্রী কর্তৃক "আপনি আমাকে ছেড়ে দেন তো" বলা — এটি স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাকের আবেদন মাত্র। এতে তালাক পতিত হয় না। আর স্বামী যদি এর জবাবে তালাকের নিয়তে কিছু বলেন, তবে তালাক হবে; কিন্তু নিয়ত ছাড়া কিনায়া শব্দ বললে তালাক হবে না।
৬. স্বামীর "আমি জানতাম না" বলার প্রভাব
যেহেতু স্বামীর তালাকের নিয়ত ছিল না এবং তিনি খেলার ছলে বলেছেন, তাই তার "জানতাম না" বলার বিষয়টি এখানে প্রাসঙ্গিক। কিনায়া শব্দে নিয়ত না থাকায় তালাক পতিত হয়নি, তাই তার অজ্ঞতা বা জ্ঞান — কোনোটি দিয়েই তালাক পতিত হওয়ার প্রশ্ন নেই।
চূড়ান্ত ফতোয়া
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের উত্তর:
স্বামী যদি তালাকের উদ্দেশ্য ছাড়া হেসে হেসে "এক ছাড়া, দুই ছাড়া, তিন ছাড়া" বলেন, তবে তালাক পতিত হবে না। কারণ "ছাড়া" শব্দটি তালাকের কিনায়া (অস্পষ্ট) শব্দ, এবং কিনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। যেহেতু স্বামীর তালাকের নিয়ত ছিল না, তাই তালাক পতিত হয়নি। তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক অটুট থাকবে।
গুরুত্বপূর্ণ নসিহত
১. তালাকের বিষয়ে হাসি-তামাশা বা খেলার ছলে কোনো কথা বলা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তিনটি বিষয় গুরুত্বের সাথে করলে তা কার্যকর হয়, আর ঠাট্টা-তামাশা করলেও তা কার্যকর হয়ে যায় — তালাক, বিবাহ এবং রাজ'আত (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া)।" (আবু দাউদ, তিরমিজি)
তবে এই হাদিসটি সরীহ (স্পষ্ট) শব্দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিনায়া শব্দের ক্ষেত্রে নিয়ত শর্ত।
২. ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকা উচিত। তালাকের শব্দ উচ্চারণের আগে ১০ বার ভাবা উচিত।
৩. তালাক নিয়ে সন্দেহ হলে স্থানীয় মুফতি বা আলেমের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
والله أعلم بالصواب (আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত)