মালয়েশিয়ায় Tourist/Student Visa নিয়ে কাজ করা কি যাবে? এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কি অবস্থান করা যাবে কি?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 4217
Questioner: Tisa Moni
Question Asked: 20 Aug 2026, 07:05 PM
Reviewed & Published: 20 Aug 2026, 07:10 PM
Views: 24
Tokens: 7,107
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

মালয়েশিয়ায় বর্তমানে শ্রমিক ভিসা বন্ধ থাকায় একজন ব্যক্তি টাকা উপার্জনের উদ্দেশ্যে Tourist/Student Visa নিয়ে মালয়েশিয়ায় যেতে চান। সেখানে তাঁর নিকটাত্মীয় তাঁর জন্য একটি কাজের ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

১. শ্রমিক ভিসা ছাড়া Tourist/Student Visa নিয়ে মূলত কাজ করার উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়ায় যাওয়া কি শরিয়তসম্মত হবে?

২. উক্ত ভিসার মেয়াদ ৩–৪ মাস। এই সময়ের মধ্যে বৈধভাবে Work Visa করার চেষ্টা করার নিয়তে সেখানে থাকা যাবে কি? এবং Work Visa না হওয়া পর্যন্ত কাজ করে উপার্জন করা যাবে কি?

৩. যদি ভিসার মেয়াদের মধ্যে Work Visa করা সম্ভব না হয়, তাহলে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কয়েক মাস সেখানে থেকে Work Visa করার চেষ্টা ও নিয়ত রেখে কাজ করা যাবে কি? যেহেতু ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেখানে থাকা সরকারি আইনে অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে।

৪. এভাবে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবৈধভাবে অবস্থান করে কাজ করলে, সেই কাজটি নিজে হালাল হওয়া সত্ত্বেও উপার্জিত টাকা কি হারাম হবে?

৫. যদি ওই সময়ের উপার্জন হারাম হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তীতে তওবা করে সেই টাকা সদকা করে দিলে কি দায়মুক্ত হওয়া যাবে?

৬. ব্যক্তিটির আর্থিক অবস্থা খুবই সংকটপূর্ণ এবং সেখানে তাঁর নিকটাত্মীয় ও কাজের ব্যবস্থা রয়েছে। তাই শরিয়তের দৃষ্টিতে কোন পর্যায় পর্যন্ত সেখানে যাওয়া, থাকা ও কাজ করা বৈধ হবে এবং কোন পর্যায় থেকে তা নাজায়েয/হারাম হবে—বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। বর্তমান সময়ে অনেক মুসলিম ভাই-বোন এই ধরনের জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। আমি হানাফি মাযহাবের প্রামাণ্য কিতাব এবং ফতোয়ার আলোকে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।

১. Tourist/Student Visa নিয়ে মূলত কাজ করার উদ্দেশ্যে যাওয়া

Tourist বা Student Visa নিয়ে মূলত কাজ করার উদ্দেশ্যে কোনো দেশে যাওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। কারণ, এটি দেশের আইন ভঙ্গ করার শর্তে প্রবেশ করা। ইসলামে চুক্তি ও আইন মেনে চলার নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ "হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ১)

যখন কোনো ব্যক্তি Tourist Visa নেয়, তখন সে দেশের সরকারের সাথে এই মৌখিক/লিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যে, সে শুধু পর্যটনের উদ্দেশ্যে আসছে এবং কাজ করবে না। এই চুক্তি ভঙ্গ করা এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা ধোঁকা ও প্রতারণা এর অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا "যে আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সহিহ মুসলিম: ১০১)

তাই, শ্রমিক ভিসা ছাড়া Tourist/Student Visa নিয়ে মূলত কাজ করার উদ্দেশ্যে যাওয়া শরিয়তসম্মত নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৯/৫৫৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫১)


২. ভিসার মেয়াদের মধ্যে Work Visa করার চেষ্টা ও কাজ করা

ভিসার মেয়াদের মধ্যে বৈধভাবে Work Visa করার চেষ্টা করা এবং সেই নিয়তে থাকা জায়েয হতে পারে, যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হয়:

১. প্রবেশের সময় মূল উদ্দেশ্য কাজ না হয়ে পর্যটন/অধ্যয়ন হয়, কিন্তু পরে পরিস্থিতির কারণে Work Visa করার প্রয়োজন দেখা দেয়। ২. Work Visa না হওয়া পর্যন্ত কাজ করা যাবে না। কারণ, Tourist Visa-তে কাজ করা আইনত অবৈধ এবং এটি চুক্তি ভঙ্গের শামিল।

তবে, যদি কেউ প্রথম থেকেই Tourist Visa নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করে, তাহলে সেটি সম্পূর্ণ নাজায়েয। কিন্তু যদি কেউ বৈধভাবে ভিসা নিয়ে যায় এবং পরে সেখানে গিয়ে দেখে যে, তার জন্য Work Visa করার সুযোগ আছে, তাহলে সে চেষ্টা করতে পারে, তবে Work Visa হওয়ার আগ পর্যন্ত কাজ করা জায়েয নয়


৩. ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবস্থান ও কাজ করা

ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেখানে অবস্থান করা স্পষ্টতই হারাম ও নাজায়েয। কারণ, এটি দেশের আইন ভঙ্গ করা এবং সেখানে অবস্থান করা সম্পূর্ণ অবৈধ হয়ে যায়। রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ আছে:

"দেশের আইন ভঙ্গ করা এবং শাসকের আদেশ অমান্য করা জায়েয নয়, যতক্ষণ না তা আল্লাহর আদেশের পরিপন্থী হয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/২৬৩)

ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেখানে থেকে Work Visa করার চেষ্টা করা এবং কাজ করা সম্পূর্ণ হারাম। কারণ, তখন সে দেশটিতে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে অবস্থান করছে। এই অবস্থায় তার উপার্জনও হারাম হবে।


৪. অবৈধভাবে অবস্থান করে কাজ করলে উপার্জিত টাকা হারাম হবে কি?

যদি কাজটি নিজে হালাল হয় (যেমন: দোকানে কাজ করা, অফিসের কাজ ইত্যাদি), কিন্তু সেটি অবৈধভাবে অবস্থান করে করা হয়, তাহলে উপার্জিত টাকা হারাম হবে। কারণ, উপার্জনের পদ্ধতি বা মাধ্যমটি বৈধ নয়।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) বলেন:

"কোনো কাজ যদি নিজে হালাল হয় কিন্তু তা অর্জনের পথ বা মাধ্যম হারাম হয়, তাহলে সেই উপার্জন হারাম।" (রদ্দুল মুহতার, ৯/৫৫৬)

তবে, এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়: যদি কেউ জোরপূর্বক বা অনিচ্ছায় এই অবস্থায় পড়ে যায়, তাহলে তার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করা এবং খাওয়ার জন্য উপার্জন করা জায়েয হতে পারে, তবে সেটি শুধুমাত্র প্রয়োজন (দারুরাহ) এর পরিমাণ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে। দারুরাহ হলো এমন অবস্থা যা ছাড়া জীবন ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।


৫. তওবা করে টাকা সদকা করে দিলে দায়মুক্তি

যদি কেউ অবৈধভাবে অবস্থান করে উপার্জন করে থাকে, তাহলে সেই টাকা তার জন্য হারাম। এই টাকা থেকে তাকে বের হয়ে আসতে হবে এবং সেই টাকা সদকা করে দিতে হবে। তবে, এই সদকা সাধারণ সদকার মতো নয়, বরং এটি তطهির (পবিত্রকরণ) এর জন্য সদকা।

ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর মতে, হারাম উপার্জন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সেই টাকা গরিব-মিসকিনকে সদকা করে দিতে হবে। তবে, এই সদকার সওয়াব সে পাবে না, বরং এটি তার জন্য পবিত্রতা অর্জনের উপায়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫১; রদ্দুল মুহতার, ৯/৫৫৬)

তওবা করার শর্ত হলো: ১. কাজটি সাথে সাথে বন্ধ করা। ২. অতীতের জন্য অনুতপ্ত হওয়া। ৩. ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা। ৪. হারাম টাকা থেকে বের হয়ে আসা এবং তা সদকা করা।

যদি এই শর্তগুলো পূরণ করা হয়, তাহলে ইনশাআল্লাহ সে দায়মুক্ত হবে।


৬. কোন পর্যায় পর্যন্ত বৈধ এবং কোন পর্যায় থেকে হারাম

আপনার প্রশ্নের শেষ অংশে জানতে চেয়েছেন, কোন পর্যায় পর্যন্ত যাওয়া, থাকা ও কাজ করা বৈধ হবে। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো:

বৈধ পর্যায়:

  • Tourist/Student Visa নিয়ে বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করা (যদি প্রবেশের সময় কাজের নিয়ত না থাকে)।
  • ভিসার মেয়াদের মধ্যে বৈধভাবে Work Visa করার চেষ্টা করা।
  • Work Visa হওয়ার পর বৈধভাবে কাজ করা এবং উপার্জন করা।

নাজায়েয/হারাম পর্যায়:

  • Tourist/Student Visa নিয়ে মূলত কাজ করার উদ্দেশ্যে যাওয়া।
  • Work Visa না হওয়া পর্যন্ত Tourist/Student Visa-তে কাজ করা।
  • ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেখানে অবস্থান করা।
  • ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কাজ করা এবং উপার্জন করা।

ব্যতিক্রম (দারুরাহ): যদি কেউ এমন পরিস্থিতিতে পড়ে যায় যে, তার কাছে দেশে ফেরার টিকিট কেনার টাকা নেই, অথবা ফেরত যাওয়ার পথে প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকে, তাহলে সে শুধুমাত্র প্রয়োজন পরিমাণ কাজ করে টাকা জমিয়ে দেশে ফিরে আসতে পারবে। তবে, এই অবস্থাও অস্থায়ী এবং তাকে দ্রুত বৈধ উপায় খুঁজে বের করতে হবে অথবা দেশে ফিরে আসতে হবে।


উপসংহার:

আপনার বর্ণিত ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে উত্তম হলো: ১. বৈধভাবে Work Visa বা শ্রমিক ভিসা নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। ২. যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে Tourist/Student Visa নিয়ে যাওয়া থেকে বিরত থাকা। ৩. যদি ইতিমধ্যে Tourist/Student Visa নিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে Work Visa হওয়ার আগ পর্যন্ত কাজ না করা এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দেশে ফিরে আসা। ৪. ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনো অবস্থাতেই সেখানে অবস্থান করা ও কাজ করা জায়েয নয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জনের তাওফিক দান করুন এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

দলিলসমূহ:

১. সূরা আল-মায়িদাহ: ১ - অঙ্গীকার পূরণের নির্দেশ। ২. সহিহ মুসলিম: ১০১ - প্রতারণা নিষিদ্ধ। ৩. রদ্দুল মুহতার, ৯/৫৫৬ - হারাম উপার্জনের বিধান। ৪. ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫১ - হারাম টাকা সদকার বিধান। ৫. রদ্দুল মুহতার, ৪/২৬৩ - দেশের আইন ভঙ্গ করা নিষিদ্ধ।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.