যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ৫% সার্ভিস চার্জ কি হালাল? সুদ ও সার্ভিস চার্জের মধ্যে পার্থক্য কি?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 4214
Questioner: morium afrojccr
Question Asked: 20 Aug 2026, 06:11 PM
Reviewed & Published: 20 Aug 2026, 06:16 PM
Views: 18
Tokens: 7,496
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, আমি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের গাঙ্গাচরা তে গিয়েছিলাম ক্ষুদ্রঋণ সম্পরকে জানতে সেখাঙ্কার কার এক কর্মকর্তা বা কর্মচারী জাই বলেন আরকি তিনি বলেছেন যে আমকে বলেছে যে ঋণ পেতে আগে নিয়ম অনুযায়ী আগে ৭ দিন এর ত্রাইনিং করতে হবে এরপর সারতিফিকেত জমা দিয়ে নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করে এরপর ঋণ দিবে এবং সেখানে ৫% সার্ভিস চার্জ আছে আর এই ৫% সার্ভিস চার্জ এ আসলে ২% শুধ থাকে বাকি % তা সার্ভিস চার্জ, মানে ৫ % এর মধ্যে সুধ অ সার্ভিস চার্জ ২ তাই থাকে । কিন্তু অনলাইনে সার্চ করে আমি জানলাম যুব উন্নয়নের ৫% সার্ভিস চার্জ সম্পর্কে।
"(যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, কিছু ঋণ কর্মসূচিতে বলা হয়েছে ঋণের উপর ৫% (ক্রমহ্রাসমান) হারে সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়। সরকারি ব্যাখ্যায় এটিকে “সার্ভিস চার্জ” বলা হয়েছে, “সুদ” বলা হয়নি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—সরকারি ওয়েবসাইটে একটি উদাহরণ দেওয়া আছে: ৫০,০০০ টাকা ঋণ নিলে ২ বছরের মেয়াদে ৫% ক্রমহ্রাসমান হিসাবে অতিরিক্ত ২,৪১৬ টাকা সার্ভিস চার্জ দিতে হয়।
অর্থাৎ কর্মকর্তা যে বলেছেন “৫% এর মধ্যে ২% সুদ, বাকিটা সার্ভিস চার্জ”, সেটি সরকারি প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে মেলে না। আমি যে সরকারি নথি পেয়েছি সেখানে ৫%-কে সার্ভিস চার্জ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে; ৫%-এর মধ্যে ২% “সুদ” আছে—এমন তথ্য পাইনি। ) " আমি দিধায় আছি আসলেই কি এটি শুধুই সার্ভিস চার্জ ? আর যদি আমি সরাসরি খোঁজ নিয়ে এটি নিশ্চিত হই যে এটি শুধুই সার্ভিস চার্জ তাহলে এই ঋণ কি নেয়া হালাল হবে?"

Answer

উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক মানুষের জানার প্রয়োজন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ৫% সার্ভিস চার্জ নিয়ে আপনার দ্বিধা স্বাভাবিক। আসুন আমরা এই বিষয়টি কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে পরিষ্কারভাবে বিশ্লেষণ করি।

১. ইসলামে সুদ (রিবা) এর বিধান

ইসলামে সুদ (রিবা) সম্পূর্ণ হারাম। কুরআন মজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আল্লাহ তাআলা বেচাকেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

সুদ শুধু হারামই নয়, বরং এটি এমন একটি মহাপাপ যা সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। যারা সুদ খায়, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। (সূরা আল-বাকারা: ২৭৯)

২. সার্ভিস চার্জ বনাম সুদ (রিবা) - হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

হানাফি ফিকহের ইমামগণ (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ) এবং পরবর্তী ফকিহগণ (যেমন: ইমাম ইবনে আবিদিন শামী) এই বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট। তাদের মতে:

  • সুদ (রিবা): ঋণের মূল টাকার উপর নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করাই হলো সুদ। এটি কোনো অবস্থাতেই হালাল নয়, তাকে "সার্ভিস চার্জ" বা অন্য যেকোনো নামে ডাকা হোক না কেন। নাম পরিবর্তন করলে বস্তুর হুকুম পরিবর্তন হয় না। (আল-হিদায়া, রদ্দুল মুহতার)

  • সার্ভিস চার্জ (প্রকৃত): ইসলামি ফিকহে ঋণদাতা প্রকৃত সেবা বা খরচের বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিতে পারেন। যেমন: কাগজপত্র তৈরি, ফাইলিং, প্রশিক্ষণের খরচ, প্রশাসনিক খরচ ইত্যাদি। তবে এই খরচ বাস্তব এবং যুক্তিসঙ্গত হতে হবে এবং তা ঋণের পরিমাণের সাথে সরাসরি আনুপাতিক হারে (যেমন: ৫%) না হয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণে (Fixed Amount) হতে হবে। কারণ, ৫০,০০০ টাকার ঋণের প্রশাসনিক খরচ এবং ৫,০০,০০০ টাকার ঋণের প্রশাসনিক খরচ একই রকম হয়, কিন্তু ৫% হারে নিলে খরচের পরিমাণ ১০ গুণ বেড়ে যায়, যা বাস্তবসম্মত নয়।

৩. আপনার প্রশ্নের বিশ্লেষণ

আপনি যে তথ্য দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে:

  • ঋণের উপর ৫% "সার্ভিস চার্জ" নেওয়া হয়।
  • একজন কর্মকর্তা বলেছেন, এর মধ্যে ২% সুদ এবং বাকি ৩% সার্ভিস চার্জ।
  • সরকারি ওয়েবসাইটে ৫%-কে সম্পূর্ণ "সার্ভিস চার্জ" বলা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যিই হালাল?

উত্তর: না, এটি হালাল নয়। কারণ:

১. সুদ ও সার্ভিস চার্জের সংমিশ্রণ: কর্মকর্তা যদি নিজেই স্বীকার করেন যে ৫% এর মধ্যে ২% সুদ আছে, তাহলে সেই ২% অংশ স্পষ্টতই হারাম। ইসলামে কোনো লেনদেনে যদি সুদের অংশও থাকে, তাহলে সেই পুরো লেনদেনই সন্দেহযুক্ত এবং হারাম হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "যে জিনিস হালাল এবং হারাম উভয়টাই মিশ্রিত থাকে, তা থেকে দূরে থাকো।" (আবু দাউদ)

২. সার্ভিস চার্জের নামে সুদ: সরকারি ওয়েবসাইটে ৫% কে "সার্ভিস চার্জ" বললেও, এটি ঋণের উপর ক্রমহ্রাসমান হারে (Reducing Balance) ধার্য করা হচ্ছে। এটি একটি সুদের ক্লাসিক উদাহরণ। কারণ, ঋণের পরিমাণ যত বেশি, সার্ভিস চার্জও তত বেশি। এটি কোনো প্রকৃত সেবার বিনিময় নয়, বরং ঋণের মূলধনের উপর একটি নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, যা ইসলামি পরিভাষায় রিবা। ফিকহের মূলনীতি হলো: "ঋণ থেকে কোনো উপকার গ্রহণ করাই হলো সুদ।" (ক্বাওয়ায়িদুল ফিকহ) অর্থাৎ, ঋণদাতা যদি ঋণ দেওয়ার শর্তে কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা উপকার নেয়, তবে সেটি সুদ, নাম যাই হোক না কেন।

৩. ইমাম ইবনে আবিদিন (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার এ বলেছেন: "যদি কোনো ব্যক্তি ঋণ দেয় এবং শর্ত করে যে, সে নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ পাবে, তবে তা হারাম।" (রদ্দুল মুহতার, ৫/১৬৮)

৪. ফাতাওয়া ও আধুনিক প্রেক্ষাপট

আধুনিক যুগের প্রখ্যাত হানাফি আলেমগণ, যেমন মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহঃ) এবং মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম), এই ধরনের "সার্ভিস চার্জ" এর ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক। তাঁদের মতে:

  • ঋণ প্রদানের সাথে কোনো শর্তে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা জায়েয নয়।
  • ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি প্রকৃত সেবার বিনিময়ে (যেমন: ফাইলিং ফি, প্রসেসিং ফি) নির্দিষ্ট পরিমাণ (Fixed) টাকা নেয়, তবে সেটি জায়েয হতে পারে, তবে শর্ত হলো তা ঋণের শতকরা হারে না হয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণে হবে এবং তা প্রকৃত খরচের ভিত্তিতে হবে।
  • কিন্তু ঋণের উপর শতকরা হারে (৫%) "সার্ভিস চার্জ" নেওয়া সম্পূর্ণ হারাম, কারণ এটি সুদ। (ফাতাওয়া উসমানি, জামিয়া বিনোরি টাউন)

৫. আপনার করণীয়

আপনি যদি নিশ্চিত হন যে, এই ৫% টাকা ঋণের উপর শতকরা হারে ধার্য করা হচ্ছে এবং এর কোনো অংশই প্রকৃত সেবার বিনিময় নয় (যেমন: প্রশিক্ষণের খরচ আলাদা, ফাইলিং ফি আলাদা), তাহলে এই ঋণ নেওয়া আপনার জন্য জায়েয হবে না। এটি হারাম হবে।

আপনার জন্য পরামর্শ:

  • আপনি যদি এই ঋণ না নিয়েই চলতে পারেন, তাহলে অবশ্যই তা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ তাআলা হারাম থেকে বাঁচার বিনিময়ে হালাল রিজিকের ব্যবস্থা করবেন।
  • যদি আপনি এই ঋণ নিতেই বাধ্য হন (অর্থাৎ, কোনো বৈধ উপায়ে অর্থের ব্যবস্থা না থাকে এবং এটি আপনার জীবিকার একমাত্র পথ হয়), তাহলে আপনি আলেমদের সাথে পরামর্শ করে দেখতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, জরুরত (চরম প্রয়োজন) এর মাত্রা অতিক্রম করলে তা হারামই থাকবে। সাধারণ ব্যবসা শুরু করার জন্য এই ঋণ নেওয়া "জরুরত" এর পর্যায়ে পড়ে না।
  • আপনি যদি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লিখিতভাবে নিশ্চিত করতে পারেন যে, এই ৫% টাকা সম্পূর্ণরূপে প্রশাসনিক খরচ (যেমন: প্রশিক্ষণ, কাগজপত্র, মনিটরিং) বাবদ নেওয়া হচ্ছে এবং তা ঋণের পরিমাণের সাথে সম্পর্কিত নয়, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন। কিন্তু যেহেতু এটি "ক্রমহ্রাসমান হারে" (Reducing Balance) ধার্য করা হচ্ছে, তাই এটি স্পষ্টতই সুদ।

সিদ্ধান্ত: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এই ৫% "সার্ভিস চার্জ" প্রকৃতপক্ষে সুদ (রিবা)। নাম পরিবর্তন করে "সার্ভিস চার্জ" বললেও এটি হারাম। তাই এই ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকাই আপনার জন্য উত্তম এবং নিরাপদ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হালাল রিজিকের তাওফিক দান করুন এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। (আমিন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.