তালাকের নিয়ত না থাকলে কি তালাক হয়? রাগের সময় বলা "মুক্তি দিলাম" বা "ছেড়ে দিলাম" শব্দে তালাক পতিত হয়?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 4158
Questioner: koly akhi
Question Asked: 19 Aug 2026, 10:04 AM
Reviewed & Published: 19 Aug 2026, 12:44 PM
Views: 19
Tokens: 4,325
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১.কোন মহিলা যদি রাগারাগি বা ঝগড়াঝাটির পর বলে মুক্তি দে এসব আর সহ্য করতে পারতেছি না।মানে কষ্ট। তহ স্ত্রী ধরেন তালাক চায় নি।হয়ত কষ্ট বুঝিয়েছে।তহ স্বামী যদি বলে দিলাম মুক্তি। তহ স্বামীও যদি নিয়ত ছাড়া বলে তাহলে কি তালাক হয়?

২.কোন মহিলা যদি রাগারাগি বা ঝগড়ার সময় বলে সবসময় চাপ কেন স্বামীকে? মানে চলাফেরাতে।স্বামী যদি নিয়ত ছাড়া বলে মুক্তি দিলাম এসব থেকে।হয়ত চাপবে না বুঝাতে বললে মানে তালাকের নিয়ত ছাড়া তাহলে কি তালাক হয়?

৩.কোন স্বামী যদি রাগে বলে তুর সাথে সংসার করব না যা ছেড়ে দিলাম তুকে।এতে কি নিয়ত লাগে? নাকি নিয়ত ছাড়াও তালাক হয়,?

Answer

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

প্রশ্ন ১ ও ২-এর উত্তর:

স্ত্রী যদি রাগের মাথায় বলে "মুক্তি দাও, সহ্য করতে পারছি না" — এটি তালাকের ইঙ্গিতবাচক (কিনায়া) শব্দ। স্ত্রীর এ উক্তিতে তালাক পতিত হয় না, কারণ স্ত্রীর তালাক দেওয়ার ক্ষমতা নেই। তবে স্বামী যদি জবাবে বলে "দিলাম মুক্তি" বা "তালাক দিলাম" — তাহলে এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত নিয়ম রয়েছে:

স্পষ্ট (সরীহ) শব্দে তালাক দিলে: "তালাক দিলাম", "মুক্তি দিলাম" — যদি স্বামী এ ধরনের স্পষ্ট শব্দে তালাক দেয়, তাহলে নিয়ত নিরপেক্ষভাবে তালাক পতিত হয়ে যায়। অর্থাৎ নিয়ত না থাকলেও তালাক হয়ে যাবে। কারণ শরীআতে স্পষ্ট শব্দে তালাক দিলে নিয়তের প্রয়োজন হয় না।

কিন্তু প্রশ্নে উল্লেখিত "মুক্তি দিলাম" শব্দটি প্রসঙ্গের উপর নির্ভর করে। যদি স্বামী স্ত্রীর কষ্টের কথা বুঝিয়ে বলে "মুক্তি দিলাম" অর্থাৎ তালাক দিলাম — তাহলে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি অন্য অর্থে (যেমন: এ কষ্ট থেকে মুক্তি দিলাম) বলে, তাহলে নিয়তের উপর নির্ভর করবে।

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে: "মুক্তি দিলাম" (خلیت سراحها) শব্দটি তালাকের ক্ষেত্রে সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ হিসেবে গণ্য। তাই নিয়ত না থাকলেও তালাক পতিত হবে।

রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:

"خلیت سراحها" من صریح الطلاق عند أبی حنیفة অর্থাৎ: "আমি তাকে মুক্তি দিলাম" — এটি ইমাম আবু হানীফার মতে তালাকের স্পষ্ট শব্দ।

তবে হানাফী মাযহাবে বিস্তারিত হলো:

  • "خلیت سراحها" (মুক্তি দিলাম) — ইমাম আবু হানীফার মতে সরীহ (স্পষ্ট), তাই নিয়ত লাগবে না।
  • ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মতে এটি কিনায়া (ইঙ্গিতবাচক), তাই নিয়ত লাগবে।

ফতোয়ায় দেওবন্দ: সাধারণত ফতোয়ায় এই মত দেওয়া হয় যে, "মুক্তি দিলাম" বললে যদি প্রসঙ্গ থেকে তালাকের উদ্দেশ্য স্পষ্ট বোঝা যায়, তাহলে তালাক পতিত হবে। আর যদি স্পষ্ট না বোঝা যায়, তাহলে নিয়তের উপর নির্ভর করবে।

আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে: স্ত্রী যদি বলে "মুক্তি দাও, সহ্য করতে পারছি না" এবং স্বামী জবাবে বলে "দিলাম মুক্তি" — এখানে স্বামীর উত্তরটি স্ত্রীর প্রস্তাবের জবাবে দেওয়া হয়েছে। স্ত্রী তালাক চাচ্ছে (কষ্ট প্রকাশ করছে) এবং স্বামী তালাক দিচ্ছে। তাই এখানে তালাকের নিয়ত না থাকলেও তালাক পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে যদি স্বামী স্পষ্টভাবে বলে যে, "আমার তালাকের নিয়ত ছিল না, আমি অন্য অর্থে বলেছি" — তাহলে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মতে তালাক পতিত হবে না, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার মতে পতিত হবে।

সতর্কতা: এ ধরনের ঝগড়ার সময় তালাকের শব্দ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ একবার তালাক পতিত হলে তা ফেরত নেওয়ার সুযোগ সীমিত।


প্রশ্ন ৩-এর উত্তর:

স্বামী যদি রাগের মাথায় বলে "তোর সাথে সংসার করব না, ছেড়ে দিলাম তোকে" — এখানে "ছেড়ে দিলাম" (ترکتک) শব্দটি তালাকের কিনায়া (ইঙ্গিতবাচক) শব্দ।

কিনায়া শব্দে তালাকের নিয়ম: কিনায়া শব্দে তালাক দিলে নিয়ত শর্ত। যদি স্বামীর তালাকের নিয়ত থাকে, তাহলে তালাক পতিত হবে। আর নিয়ত না থাকলে তালাক পতিত হবে না।

কিন্তু যদি প্রসঙ্গ থেকে তালাকের উদ্দেশ্য স্পষ্ট বোঝা যায় (যেমন: ঝগড়ার সময়, তালাকের আলোচনা চলছে), তাহলে নিয়ত না থাকলেও তালাক পতিত হতে পারে।

রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:

الكناية لا يقع بها الطلاق إلا بالنية أو بدلالة الحال অর্থাৎ: কিনায়া শব্দে তালাক পতিত হয় না, তবে নিয়ত থাকলে অথবা অবস্থার প্রেক্ষিতে (দালালাতুল হাল) স্পষ্ট বোঝা গেলে পতিত হয়।

আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে: স্বামী যদি রাগের মাথায় বলে "ছেড়ে দিলাম তোকে" — যদি তার তালাকের নিয়ত না থাকে এবং সে শুধু রাগের বশবর্তী হয়ে বলে থাকে, তাহলে হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী তালাক পতিত হবে না। তবে যদি প্রসঙ্গ থেকে তালাকের উদ্দেশ্যই স্পষ্ট বোঝা যায়, তাহলে তালাক পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে: "ترکتک" (ছেড়ে দিলাম) শব্দটি কিনায়া। তাই নিয়ত ছাড়া তালাক পতিত হবে না।


গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:

১. ঝগড়া-বিবাদে তালাকের শব্দ ব্যবহার করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। ২. রাগের সময় কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। ৩. যদি তালাক পতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে অবিলম্বে স্থানীয় মুফতির সাথে যোগাযোগ করুন। ৪. দাম্পত্য কলহ নিরসনে পরিবারের প্রবীণদের মধ্যস্থতা নিন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীন বুঝার তাওফীক দান করুন। আমীন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.