চিকিৎসার প্রয়োজনে পর্দার শিথিলতা
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: ইসলামী বিধান ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ:
১. মাহরাম ও গায়রে-মাহরামের স্পর্শের বিধান: ইসলামে গায়রে-মাহরাম নারী-পুরুষের পরস্পরকে স্পর্শ করা বা দেখা নিষিদ্ধ। তবে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা (ضرورة) বা প্রয়োজন (حاجة) এর ক্ষেত্রে শরীয়তের নীতিমালা অনুযায়ী শিথিলতা রয়েছে। কুরআন ও হাদিসে চিকিৎসার প্রয়োজনে পর্দার বিধান শিথিল করার অনুমতি রয়েছে।
২. চিকিৎসার ক্ষেত্রে পর্দার নিয়ম: হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী) এবং ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) তে উল্লেখ আছে যে, রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজন হলে, রোগী পুরুষ হলে পুরুষ ডাক্তার এবং রোগী নারী হলে নারী ডাক্তারের ব্যবস্থা করা উত্তম। কিন্তু নারী ডাক্তার না পাওয়া গেলে বা জরুরি অবস্থায় পুরুষ ডাক্তার দেখাতে পারবে, তবে প্রয়োজনের পরিমাণ মতো (بقدر الضرورة) দেখানো যাবে। অর্থাৎ যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই উন্মুক্ত করা যাবে, এর বেশি নয়।
৩. আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষাপট: আপনার মায়ের ক্ষেত্রে ডাক্তার (পুরুষ) ইনজেকশন দেওয়ার জন্য কোমর দেখানোর প্রয়োজন মনে করেছেন। এটি একটি চিকিৎসাগত প্রয়োজন। ইসলামি ফিকহে এই প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মহিলা নার্স বা ডাক্তার থাকা সত্ত্বেও পুরুষ নার্সের মাধ্যমে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে কি না? যদি মহিলা নার্স বা ডাক্তার পাওয়া সম্ভব হতো, তাহলে পুরুষ নার্সের মাধ্যমে দেওয়া অনুচিত ছিল। কিন্তু যদি জরুরি অবস্থায় মহিলা নার্স না পাওয়া যায়, অথবা ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে পুরুষ নার্সই উপস্থিত ছিল, তাহলে প্রয়োজনের তাগিদে তা করা জায়েয হবে এবং গুনাহ হবে না।
৪. গুনাহের বিধান: যেহেতু এটি একটি জরুরি (ইমার্জেন্সি) অবস্থা ছিল এবং ডাক্তারের নির্দেশনায় ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে, তাই এতে আপনি বা আপনার মা গুনাহগার হবেন না। কারণ শরীয়তে "প্রয়োজন অপরিহার্যকে বৈধ করে" (الضرورة تبيح المحظور) এই নীতিটি প্রযোজ্য। তবে শর্ত হলো, প্রয়োজনের পরিমাণ যেন অতিক্রম না করা হয়। অর্থাৎ যতটুকু প্রয়োজন (কোমরে ইনজেকশন) ততটুকুই করা হয়েছে, এর বেশি কিছু নয়।
৫. উত্তম কী ছিল? উত্তম ছিল:
- প্রথমে চেষ্টা করা যে, মহিলা ডাক্তার বা মহিলা নার্স দিয়ে কাজটি করানো যায়।
- যদি মহিলা না পাওয়া যায়, তাহলে স্বামী বা মাহরাম পুরুষ (যেমন: ছেলে, ভাই, বাবা) উপস্থিত থাকা অবস্থায় পুরুষ নার্স কাজটি করবে, যাতে পর্দা রক্ষা হয়।
- তবে জরুরি অবস্থায় (যেমন: রোগীর জীবন ঝুঁকি বা ব্যথা অসহ্য) যদি মহিলা না পাওয়া যায়, তাহলে পুরুষ নার্সের মাধ্যমে করানোই বৈধ এবং এতে গুনাহ নেই।
হানাফি ফিকহের উল্লেখযোগ্য উদ্ধৃতি:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী): "যদি কোনো নারী অসুস্থ হয় এবং তার চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তাহলে প্রথমে নারী ডাক্তার দেখাবে। নারী ডাক্তার না থাকলে পুরুষ ডাক্তার দেখাতে পারবে, তবে প্রয়োজনের পরিমাণ মতো।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৫৫)
- রদ্দুল মুহতার: "চিকিৎসার প্রয়োজনে পর্দার বিধান শিথিল করা জায়েয, তবে প্রয়োজনের পরিমাণ অতিক্রম করা যাবে না।" (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৩৭১)
- ফাতাওয়া উসমানি: মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম উল্লেখ করেছেন যে, "চিকিৎসার প্রয়োজনে গায়রে-মাহরামের সামনে শরীরের ঐ অংশ দেখানো জায়েয, যার চিকিৎসা প্রয়োজন, তবে শর্ত হলো, প্রয়োজনের পরিমাণ মতো দেখানো এবং ফিতনার আশঙ্কা না থাকা।"
সারসংক্ষেপ:
আপনার মায়ের ক্ষেত্রে এটি একটি জরুরি চিকিৎসা ছিল। ডাক্তারের পরামর্শে কোমরে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এটি একটি প্রয়োজন, তাই এতে গুনাহ হবে না। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষেত্রে মহিলা নার্স বা ডাক্তার পাওয়া গেলে তাদের মাধ্যমেই করানো উত্তম। যদি সম্ভব না হয়, তাহলে মাহরাম পুরুষের উপস্থিতিতে করানো যাবে। জরুরি অবস্থায় পুরুষ নার্সের মাধ্যমে করানো বৈধ এবং গুনাহের বিষয় নয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। (আমিন)