ত্বাগুতের সহযোগিতা, হারাম কাজে অংশগ্রহণ, ঈমানের সীমা এবং মুসলিম কর্মকর্তার করণীয় সম্পর্কে ইসলামি বিধান।
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
ত্বাগুতের সহযোগিতা ও হারাম কাজে অংশগ্রহণের বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
এমন একটি চাকরিতে নিয়োজিত হওয়া যেখানে হালাল কাজের পাশাপাশি হারাম কাজ (নারীদের খেলা, বাদ্যযন্ত্রসহ অনুষ্ঠান পরিচালনা) এবং ত্বাগুতি আইনে জরিমানা/কারাদণ্ড প্রদানের নেতৃত্ব দিতে হয়—এমন ক্ষেত্রে মুসলিম কর্মকর্তার ঈমানের অবস্থা কী হবে এবং সীমা কতটুকু?
উত্তর
১. ত্বাগুতের সংজ্ঞা ও সহযোগিতার বিধান
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِينَ اجْتَنَبُوا الطَّاغُوتَ أَن يَعْبُدُوهَا وَأَنَابُوا إِلَى اللَّهِ لَهُمُ الْبُشْرَىٰ "যারা ত্বাগুতের ইবাদত থেকে দূরে থাকে এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তাদের জন্য সুসংবাদ।" (সূরা আয-যুমার: ১৭)
ত্বাগুত বলতে এমন সব কিছুকে বোঝায় যা আল্লাহর বিধানের বিপরীতে আইন প্রণয়ন করে এবং মানুষকে তা মানতে বাধ্য করে। তবে কোনো মুসলিম যদি চাকরির প্রয়োজনে এমন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে যেখানে কিছু হারাম কাজ হয়, তবে তা তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ত্বাগুতের সহযোগী বানিয়ে দেয় না, যতক্ষণ না সে নিজে হারাম কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করে বা তাকে সমর্থন করে।
২. হারাম কাজে সহযোগিতার বিধান
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ২)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, হারাম কাজে সহযোগিতা করা বা তাতে অংশগ্রহণ করা জায়েয নয়। তবে যদি কেউ এমন পরিবেশে কাজ করে যেখানে হারাম কাজ হয় কিন্তু সে নিজে সেই হারাম কাজে সরাসরি জড়িত না থাকে, তাহলে তার চাকরি সম্পূর্ণ হারাম হবে না, তবে তাকে যথাসম্ভব হারাম কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে।
৩. ঈমানের অবস্থা
ঈমান ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো—ঈমান হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধানকে অন্তর দিয়ে সত্যায়ন করা এবং তা মেনে চলা। কোনো গুনাহের কাজ করলে ঈমান চলে যায় না, তবে তা ঈমানের দুর্বলতা সৃষ্টি করে। ইমাম তাহাবী (রহ.)在其 عقيدة الطحاوية-তে উল্লেখ করেছেন:
وَلَا نُكَفِّرُ أَحَدًا مِنْ أَهْلِ الْقِبْلَةِ بِذَنْبٍ مَا لَمْ يَسْتَحِلَّهُ "আমরা কিবলাবাসী কাউকে কোনো গুনাহের কারণে কাফির বলি না, যতক্ষণ না সে তা হালাল মনে করে।"
অর্থাৎ, যদি কোনো মুসলিম হারাম কাজ করে কিন্তু তা হালাল মনে না করে, তবে সে ফাসিক (গুনাহগার) হবে, কাফির হবে না। তবে যদি সে হারামকে হালাল মনে করে বা ত্বাগুতি আইনকে আল্লাহর আইনের উপর প্রাধান্য দেয়, তাহলে তা ঈমানের পরিপন্থী হতে পারে।
৪. মুসলিম হিসেবে সীমা
মুসলিম হিসেবে আপনার করণীয়:
১. সরাসরি হারাম কাজে অংশগ্রহণ না করা — নারীদের খেলা, বাদ্যযন্ত্রসহ অনুষ্ঠান পরিচালনার নেতৃত্ব দেওয়া থেকে বিরত থাকা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ "আমার উম্মতের কিছু লোক এমন হবে যারা ব্যভিচার, রেশমি কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।" (সহীহ বুখারী: ৫৫৯০)
২. ত্বাগুতি আইনে জরিমানা/কারাদণ্ড প্রদান থেকে বিরত থাকা — ইসলামি বিধান অনুযায়ী বিচারক বা শাসকের দায়িত্ব পালন করা জায়েয, তবে এমন আইন প্রয়োগ করা যা স্পষ্টতই ইসলামবিরোধী এবং জুলুমের উপর ভিত্তি করে, তা থেকে বিরত থাকা উচিত। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) নিজেও জুলুমী শাসকের অধীনে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং কারাবরণ করেছিলেন।
৩. নিজের অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করা — যদি সম্ভব হয়, এমন বিভাগে বদলি হওয়ার চেষ্টা করুন যেখানে হারাম কাজের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই।
৪. যদি সম্পূর্ণভাবে চাকরি ছেড়ে দেওয়া সম্ভব না হয় — তাহলে অন্তত হারাম কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকুন এবং হালাল অংশটুকু আদায় করুন। তবে যদি চাকরির মূল দায়িত্বই হারাম হয়, তাহলে সেই চাকরি ছেড়ে দেওয়া ওয়াজিব।
৫. ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়ার আলোকে
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ করেছেন যে, এমন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা যেখানে হারাম কাজ হয়, যদি ব্যক্তি নিজে হারাম কাজে সরাসরি জড়িত না থাকে এবং তার কাজের প্রধান দায়িত্ব হালাল হয়, তবে চাকরি করা জায়েয হবে, তবে হারাম কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। কিন্তু যদি তার কাজের প্রধান দায়িত্বই হারাম হয়, তাহলে সেই চাকরি করা জায়েয নয়।
সারসংক্ষেপ
১. হারাম কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করলে ঈমান চলে যায় না, তবে তা গুরুতর গুনাহ। ২. ত্বাগুতের সহযোগী তখনই হবেন যখন আপনি ত্বাগুতি আইনকে আল্লাহর আইনের উপর প্রাধান্য দেবেন বা হারামকে হালাল মনে করবেন। ৩. আপনার জন্য করণীয় হলো—হারাম কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ বন্ধ করা, সম্ভব হলে চাকরি পরিবর্তন করা, এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করা। ৪. যদি চাকরির মূল দায়িত্বই হারাম হয় (যেমন নারীদের খেলা ও বাদ্যযন্ত্রের অনুষ্ঠান পরিচালনা), তাহলে সেই চাকরি ছেড়ে দেওয়া ওয়াজিব।
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)