স্বপ্নে এটা কি আল্লাহর তরফ থেকে সুসংবাদ ছিলো?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি এই রমাদানে কনসিভ করি আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে। আলহামদুলিল্লাহ।
কিন্ত সেটা রমাদানের পর জানতে পেরেছি, তো জানার দুই দিন পর জুম্মার দিন ফজরের আজানের আগে একটা স্বপ্ন দেখি। দেখি যে, নবীজি সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কাউকে নাম বলে দিচ্ছেন। তখন আমি ও বলি যে আমাকেও নাম বলে দিন। তখন নবীজি সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন - "মুহাম্মাদ মুস্তফা" এর পর আরেকটা নাম বললেন "গণিয়ুন"।
এতটুকুই শুনি। কিন্তু আমি নবীজিকে দেখি নি।
এরপর, এখন আমার আলহামদুলিল্লাহ ৭ মাস চলতেছে। এই ৪ দিন আল্ট্রা সোনোগ্রাফি করানু নিয়ে বেশ দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। কারণ, ডাক্তার আমাকে এক পুরুষ ডাক্তার কে সাজেস্ট করেছিলেন, পরে এই এক আল্ট্রা সোনোগ্রাফি করানুর জন্য আমাকে ৩ টা দিন অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। পর্দা রক্ষা করার জন্য, ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করেছি মহিলা ডাক্তার দিয়ে করানুর জন্য, তাও একদিন নয় ৩দিন। ৩ দিন পর গতকাল করাতে পেরেছি। আমি আমার চোখ সহ পর্দা করি, তো সেই অপেক্ষার ভীষণ কষ্টের মুহূর্তে আমি আল্লাহর সাথে এমনি মনে মনে কথা বলি যে, ইয়া আল্লাহ, হারাম সব কিছুই অনেক সহজ করা, কিন্তু হালাল ভাবে কোনো কিছু করতে চাওয়া, পর্দা রক্ষা করতে চাওয়া কত কষ্টের। অনেক ধর্যের। এই যে এই ৩ টা দিন এতো কষ্ট করতেছি নিজের পর্দা রক্ষা করার জন্য ইয়া আল্লাহ তোমার তরফ থেকে কি কোনো সুসংবাদ পাবো না..!! নাকি, আমার কোনো গুনাহের জন্য আমি এতো কষ্ট আর শাস্তি পাচ্ছি। এইভাবে নিজে নিজে ভাবছিলাম আর কি। তো পরে, আল্লাহর রহমতে সব হসপিটালের কাজ শেষ করে আসি। তাও মনে মনে চলে আসতেছিলো একটা সামান্য টেস্ট করতে এতো কষ্ট করতে হলো, পরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পরি।
তো আজকেও ঠিক ফজরের আজানের আগে, একটা স্বপ্ন দেখলাম যে, একজন আমাকে বলছেন যে, আল্লাহ আমাকে পুত্র সন্তান দিবেন, যে নবীজি সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসারী হবেন এমন কিছু একটা শুনেছি। এটা শুনেই ঘুম ভেঙ্গে গেছে। পরে ঘুম থেকে উঠার কিছু খন পরেই ফজরের আজান হলো। আমি শুধু ভাবছিলাম যে, এটা কি আল্লাহর তরফ থেকে ছিলো..!! আল্লাহর তরফ থেকে সুসংবাদ..!! আমি বুঝতেছিলাম না যে কি করবো... শুধু কান্না আসতেছিল।
এখন শায়েখ, আপনার থেকে জানতে চাচ্ছিলাম যে, এটা কি আসলেই কোনো সুসংবাদ ছিলো নাকি নিজের মনের অজান্তেই এটা দেখেছি..?? দয়া করে, জানাবেন।
আর এতো কিছু বলেছি আমার পরিস্থিতি বুঝানোর জন্য।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছি এবং আপনার পর্দা রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। আল্লাহ তায়ালা আপনার এই কষ্টের বিনিময়ে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর সাথে দেখা বা তাঁর কাছ থেকে সরাসরি কোনো নির্দেশনা পাওয়া সম্ভব নয়। কিয়ামতের আগে কেউ নবীজীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বপ্নে দেখলে তা সত্য, তবে তা দেখার অর্থ এই নয় যে, তিনি জাগ্রত অবস্থায় আমাদের সাথে কথা বলছেন। বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ইলহাম বা অন্তর্দৃষ্টি হতে পারে। (সূত্র: সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৯৯৩; রদ্দুল মুহতার, ১/৫৪৩)
আপনার স্বপ্ন সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ:
১. প্রথম স্বপ্ন (নবীজীর কণ্ঠস্বর শোনা): যেহেতু আপনি নবীজীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেখেননি, শুধু কণ্ঠস্বর শুনেছেন, তাই এটি নবীজীর স্বপ্ন হিসেবে গণ্য হবে না। এটি আপনার মনের অবচেতন অবস্থা হতে পারে, বিশেষ করে সন্তানসম্ভবা অবস্থায় মনের মধ্যে নানা চিন্তা কাজ করে। তবে "মুহাম্মাদ মুস্তফা" এবং "গণিয়ুন" (গণি বা গনিয়ুন - যার অর্থ "ঐশ্বর্যময়" বা "স্বয়ংসম্পূর্ণ", এটি আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম) নাম দুটি শোনা আপনার সন্তানের জন্য ভালো নাম রাখার ইঙ্গিত হতে পারে। "মুহাম্মাদ" নামটি রাখা অত্যন্ত বরকতময় এবং "গণি" (غني) নামটি আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর একটি, যা বান্দার নাম হিসেবে রাখা যায় (যেমন: আব্দুল গণি)।
২. দ্বিতীয় স্বপ্ন (পুত্র সন্তানের সুসংবাদ): আপনি যখন পর্দা রক্ষার জন্য চরম কষ্ট ও হতাশার মধ্যে ছিলেন, তখন আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছিলেন। এরপর ফজরের আজানের আগে এই স্বপ্ন দেখা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ফজরের পূর্বক্ষণ (তাহাজ্জুদের সময়) এবং আজানের সময় দুআ কবুলের বিশেষ মুহূর্ত। (সূত্র: সহীহ বুখারী, হাদীস: ১১৪৫) আপনার এই স্বপ্নটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সুসংবাদ (মুবাশশিরাত) হওয়ারই বেশি সম্ভাবনা।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সম্পর্কে বলেছেন:
لَهُمُ الْبُشْرَىٰ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ "তাদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে পার্থিব জীবনে এবং পরকালে।" (সূরা ইউনুস: ৬৪)
তাফসীরবিদগণ বলেছেন, এই "সুসংবাদ" হলো ভালো স্বপ্ন যা মুমিন দেখে থাকে। (তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন, ৪/৪৫৬)
৩. আপনার কষ্ট ও শাস্তির ধারণা: আপনি মনে করছেন পর্দা রক্ষা করার কারণে কষ্ট পাচ্ছেন, এটি কোনো শাস্তি নয়। বরং এটি আপনার জন্য একটি পরীক্ষা (ইবতিলা)। আল্লাহ তায়ালা যাদের ভালোবাসেন, তাদেরকে কষ্ট দিয়ে পরীক্ষা করেন, যাতে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। হাদীসে এসেছে, "সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা নবীগণের হয়, তারপর যারা তাদের নিকটতর, তারপর যারা তাদের নিকটতর।" (সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ২৩৯৮) আপনার এই কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা আপনার গুনাহ মাফ করে দিচ্ছেন এবং আপনার মর্যাদা বৃদ্ধি করছেন। এটি শাস্তি নয়, বরং রহমত।
সারকথা ও পরামর্শ:
১. আপনার দ্বিতীয় স্বপ্নটি (পুত্র সন্তানের সুসংবাদ) আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সুসংবাদ হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি, কারণ এটি আপনার দুআ ও কষ্টের প্রেক্ষিতে ফজরের পূর্ব মুহূর্তে এসেছে। ২. স্বপ্নের নাম দুটি (মুহাম্মাদ ও গণি) আপনার সন্তানের জন্য উত্তম নাম হিসেবে রাখতে পারেন। "মুহাম্মাদ" এবং "আব্দুল গণি" (গণি আল্লাহর গুণ, বান্দার নাম হবে আব্দুল গণি)। ৩. পর্দা রক্ষার কষ্টকে শাস্তি মনে করবেন না। এটি আপনার জন্য পরীক্ষা এবং এর মাধ্যমে আপনার মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধৈর্য ধারণ করুন, ইনশাআল্লাহ এর উত্তম প্রতিদান পাবেন। ৪. স্বপ্নের উপর ভরসা না করে আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং দুআ করতে থাকুন। সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। কুরআনে বলা হয়েছে, "আসমান ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।" (সূরা আশ-শূরা: ৪৯-৫০)
আল্লাহ তায়ালা আপনার সন্তানকে নেককার, সুস্থ ও সুন্দর করুন এবং আপনার পর্দা রক্ষার এই কষ্টকে কবুল করুন। আমীন।