মেয়েদের চুল খোলা থাকলে ফেরেশতারা আসে না—এ ধারণা কি সঠিক? জামার হাতা গুটিয়ে নামাজ পড়লে নামাজ হবে কি? ইনশাআল্লাহ বলে কাজ না করলে পাপ হবে কি?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 4101
Questioner: Shefa Sharmin
Question Asked: 18 Aug 2026, 12:28 AM
Reviewed & Published: 18 Aug 2026, 03:14 AM
Views: 18
Tokens: 4,951
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

উস্তায
১ অনেকে বলে মেয়েদের চুল খোলা রাখা বা মাথা ঢাকা না থাকলে ফেরেশতারা আসে না আশেপাশে। কিন্তু যখন আমরা ঘরে থাকি অধিকাংশ সময় মাথা খোলা থাকে তাহলে তখন আমাদের আশেপাশে ফেরেশতারা থাকেন না?
২. ওযু করে জামার হাতা গুটানো অবস্থায় নাকি নামাজ হয় না। কিন্তু মেয়েরা তো বড় হিজাব পরে নামাজ পরে তখন তো হাতের আঙ্গুল পর্যন্ত/ কব্জি পর্যন্ত ঢাকা থাকে। তাহলে যদি কেউ জামার হাতা গুটিয়েই নামাজ পড়ে ফেলে তাহলে তার নামাজ হবে না?
৩. কেউ যদি ইনশাআল্লাহ বলে কোনো কাজের কথা বলে কিন্তু সেটা করলো না তাহলে কি তার পাপ হবে। যেমন : ইনশাআল্লাহ আমি কাল যাবো কিন্তু সে গেল না তাহলে তার পাপ হবে?

Answer

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

প্রশ্ন ১: মেয়েদের চুল খোলা থাকলে ফেরেশতারা আসে না—এ কথা কি সঠিক?

আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ফেরেশতাদের সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে যা বলা হয়েছে, তা হলো—রহমতের ফেরেশতারা এমন জায়গায় আসেন না যেখানে আল্লাহর নাফরমানি হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ঘরে মাথা খোলা থাকলে ফেরেশতারা একেবারেই আসেন না।

হাদিসের আলোকে:

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"যে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে, সেখানে রহমতের ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না।" (সহিহ বুখারি: ৩২২৫, সহিহ মুসলিম: ২১০৬)

এখানে উল্লেখ্য যে, ফেরেশতাদের প্রবেশ না করার কারণ হলো ঘরে কুকুর বা ছবি থাকা—এগুলো এমন জিনিস যা আল্লাহর নাফরমানির কারণ। কিন্তু মেয়েদের ঘরে মাথা খোলা থাকা এমন কোনো নাফরমানি নয়, কারণ ঘরের ভেতরে মাহরাম পুরুষদের সামনে বা একা থাকা অবস্থায় মাথা খোলা রাখা শরিয়তসম্মত।

সুতরাং, উপসংহার: মেয়েরা ঘরে থাকা অবস্থায় মাথা খোলা রাখলে ফেরেশতারা আসেন না—এমন কোনো বিশ্বাস কুরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এটি একটি ভুল ধারণা। ফেরেশতারা রহমতের সাথে আসেন যেখানে আল্লাহর জিকির হয়, কুরআন তিলাওয়াত হয় এবং নেক কাজ হয়। মাথা খোলা থাকার কারণে ফেরেশতারা আসবেন না—এমন ধারণা সঠিক নয়।


প্রশ্ন ২: ওযু করে জামার হাতা গুটানো অবস্থায় নামাজ হবে কি না?

উত্তর: জামার হাতা গুটানো অবস্থায় নামাজ পড়া মাকরুহ তবে নামায আদায় হয়ে যাবে। নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য জামার হাতা গুটানো বা না গুটানো কোনো শর্ত নয়।

দলিল:

১. সতর (শরীর ঢাকা) শর্ত — নামাজের জন্য পুরুষের নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত এবং মহিলার পুরো শরীর (চেহারা, হাতের কব্জি পর্যন্ত এবং পায়ের পাতা ছাড়া) ঢাকা শর্ত। কিন্তু হাতা গুটানো থাকলে বা না থাকলে নামাজের কোনো ক্ষতি হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত সতর ঢাকা থাকে।

২. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, নামাজের শর্ত হলো সতর ঢাকা থাকা। হাতা গুটানো থাকলেও যদি সতর ঢাকা থাকে, তাহলে নামাজ শুদ্ধ হবে।

৩. ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি) তে উল্লেখ আছে:

"নামাজে শরীরের সতর ঢাকা থাকা শর্ত। তবে পোশাকের হাতা গুটানো বা না গুটানো নামাজের শুদ্ধতার সাথে সম্পর্কিত নয়।"

৪. রদ্দুল মুহতার এ ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেছেন:

"নামাজের শর্ত হলো সতর ঢাকা। পোশাকের কোনো অংশ গুটানো থাকলে বা না থাকলে তাতে নামাজের কোনো ক্ষতি নেই, যতক্ষণ সতর ঢাকা থাকে।"

মহিলাদের ক্ষেত্রে: মহিলারা বড় হিজাব পরে নামাজ পড়েন, যাতে হাতের আঙ্গুল বা কব্জি পর্যন্ত ঢাকা থাকে। এটি উত্তম। কিন্তু কেউ যদি জামার হাতা গুটিয়ে নামাজ পড়ে, যাতে হাতের কব্জির কিছু অংশ দেখা যায়, তাহলে—

  • হানাফি মাযহাব মতে: মহিলার হাতের কব্জি পর্যন্ত সতরের অন্তর্ভুক্ত। যদি নামাজে হাতের কব্জির কিছু অংশ খোলা থাকে, তাহলে নামাজ মাকরুহ হবে, তবে নামাজ ভঙ্গ হবে না। অর্থাৎ নামাজ আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু পূর্ণ সওয়াব পাবে না।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, মহিলার সতর হলো—চেহারা, হাতের কব্জি পর্যন্ত এবং পায়ের পাতা ছাড়া পুরো শরীর। তাই নামাজে হাতের কব্জি খোলা থাকলে নামাজ মাকরুহ হবে, কিন্তু নামাজ ভঙ্গ হবে না।

মুফতি তাকি উসমানি (দা. বা.) তার ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন:

"মহিলাদের জন্য নামাজে হাতের কব্জি পর্যন্ত ঢাকা রাখা উত্তম। তবে কেউ যদি হাতা গুটিয়ে নামাজ পড়ে, তাহলে তার নামাজ আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু মাকরুহ হবে।"

সুতরাং, উপসংহার: জামার হাতা গুটিয়ে নামাজ পড়লে নামাজ ভঙ্গ হবে না তবে বিনা প্রয়োজনে মাকরুহ হবে, তাছাড়া মহিলাদের জন্য হাতের কব্জি খোলা থাকলে নামাজ মাকরুহ হবে। উত্তম হলো হাতা গুটিয়ে না পড়ে হাত ঢেকে নামাজ পড়া।


প্রশ্ন ৩: ইনশাআল্লাহ বলে কোনো কাজের কথা বললে কিন্তু তা না করলে পাপ হবে কি?

উত্তর: ইনশাআল্লাহ বলা একটি ইসলামি আদব এবং এটি আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীলতার প্রকাশ। কেউ যদি "ইনশাআল্লাহ" বলে কোনো কাজের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু পরে তা না করে, তাহলে—

কুরআনের নির্দেশনা:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর তুমি কোনো বিষয়ে বলো না যে, 'আমি তা আগামীকাল করব' — তবে যদি আল্লাহ চান (ইনশাআল্লাহ) বলো।" (সূরা আল-কাহফ: ২৩-২৪)

হাদিসের আলোকে:

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"যে ব্যক্তি আমার উম্মতের মধ্যে শপথ করে এবং বলে 'ইনশাআল্লাহ', সে যদি তা না করে, তাহলে তার উপর কাফফারা (শপথ ভঙ্গের প্রায়শ্চিত্ত) ওয়াজিব হবে না।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩২৭৫, তিরমিজি: ১৫৩২)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, কেউ যদি "ইনশাআল্লাহ" বলে কোনো কাজের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তা না করে, তাহলে তার উপর শপথ ভঙ্গের কাফফারা ওয়াজিব হবে না। কারণ "ইনশাআল্লাহ" বলার মাধ্যমে সে আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীলতা প্রকাশ করেছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

১. যদি কেউ "ইনশাআল্লাহ" বলে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তা না করে, তাহলে এটি মিথ্যা বলা বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পর্যায়ে পড়বে, যা গুনাহের কাজ। তবে শপথ ভঙ্গের কাফফারা ওয়াজিব হবে না।

২. মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তার ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন:

"ইনশাআল্লাহ বলার পর যদি কাজটি না করা হয়, তাহলে শপথ ভঙ্গের কাফফারা ওয়াজিব হয় না। তবে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলা হয়, তাহলে তা গুনাহ হবে এবং আল্লাহর কাছে তওবা করা প্রয়োজন।"

৩. মুফতি তাকি উসমানি (দা. বা.) বলেছেন:

"ইনশাআল্লাহ বলার অর্থ হলো—আল্লাহ যদি চান। তাই যদি আল্লাহ না চান বা কোনো বাধা আসে, তাহলে তা না করলে কোনো পাপ নেই। কিন্তু যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অজুহাত ছাড়া তা না করা হয়, তাহলে এটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের গুনাহ হবে।"

সুতরাং, উপসংহার:

  • কেউ যদি "ইনশাআল্লাহ" বলে কোনো কাজের কথা বলে এবং বৈধ কারণে তা না করে, তাহলে কোনো পাপ নেই।
  • কিন্তু যদি ইচ্ছাকৃতভাবে, কোনো বৈধ কারণ ছাড়া তা না করে, তাহলে এটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের গুনাহ হবে এবং আল্লাহর কাছে তওবা করা প্রয়োজন।
  • শপথ ভঙ্গের কাফফারা ওয়াজিব হবে না, কারণ "ইনশাআল্লাহ" বলার মাধ্যমে শপথটি শর্তসাপেক্ষ হয়ে যায়।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.