গান এটার লাইন হয়ত কুফরী হবে না মনে করে গাইলে কি কোন সমস্যা হয়?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
গান ও কুফরী সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: একটি গানের লাইন "দোয়া বি লাগে না মুঝে, দাবা বি লাগে না মুঝে" (অর্থ: দোয়াও লাগবে না, ওষুধও লাগবে না, তুমি হলে হবে) — এটি যদি কেউ স্বামীকে ভালোবাসা বুঝাতে গায়, এবং মনে করে যে দোয়া লাগবে না, স্বামী থাকলেই হবে, তাহলে কি ঈমানের সমস্যা হবে?
উত্তর:
১. কুফরী হওয়ার শর্ত
ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, কোনো কথা বা কাজ কুফরী হিসেবে গণ্য হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো থাকতে হবে:
১. জেনে-বুঝে করা (ইলম ও ইরাদা সহকারে) ২. ইচ্ছাকৃতভাবে করা (স্বেচ্ছায়, জোরপূর্বক নয়) ৩. উপহাস বা অবজ্ঞার নিয়তে করা (ইস্তিহযা বা ইস্তিখফাফ) ৪. দ্বীনী বিষয়কে তুচ্ছ জ্ঞান করে বলা
ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহ.)在其著名的著作 রদ্দুল মুহতার -এ উল্লেখ করেছেন:
"لَا يَكْفُرُ بِالْكَلِمَةِ إِلَّا إِذَا اعْتَقَدَهَا أَوِ اسْتَهْزَأَ بِهَا"
"কোনো কথা দ্বারা কুফরী হয় না, যতক্ষণ না সে তা বিশ্বাস করে অথবা তা নিয়ে উপহাস করে।"
(রদ্দুল মুহতার, ৪র্থ খণ্ড, ২৩৬ পৃষ্ঠা)
২. প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনার বিশ্লেষণ
আপনি যে পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন:
- একজন স্ত্রী তার স্বামীকে ভালোবাসে
- পরিবারের কেউ স্বামীকে মেনে নেয়নি
- সে গান গাওয়ার সময় মনে মনে ভাবে "দোয়া লাগবে না, আমার স্বামী থাকলেই হবে"
- সে এটা কুফরী হবে না মনে করে গেয়েছে
এক্ষেত্রে বিধান:
১. যদি সে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর দোয়ার কোনো প্রয়োজন নেই এবং স্বামীই সবকিছু করতে পারে — তাহলে এটি কুফরী হতে পারে, কারণ এটি আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা অস্বীকারের শামিল।
২. কিন্তু যদি সে শুধু আবেগের বশবর্তী হয়ে, স্বামীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য এমন কথা বলে, এবং তার অন্তরে প্রকৃতপক্ষে বিশ্বাস থাকে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপকারকারী নেই, দোয়া ও ওষুধের প্রয়োজন আছে — তাহলে এটি কুফরী হবে না।
৩. গান গাওয়ার সময় ভুলবশত বা না বুঝে এমন কথা বললে, এবং পরে অনুতপ্ত হলে — ইনশাআল্লাহ ঈমানের সমস্যা হবে না।
৩. গুরুত্বপূর্ণ নীতি
ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো:
"الْكُفْرُ حُكْمٌ شَرْعِيٌّ يَتَوَقَّفُ عَلَى النِّيَّةِ وَالِاعْتِقَادِ"
"কুফরী একটি শরয়ী বিধান, যা নিয়ত ও বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল।"
(ফাতাওয়া উসমানী, ১ম খণ্ড)
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) উল্লেখ করেছেন:
"কোনো মুসলমানের ঈমান নষ্ট করার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। যতক্ষণ পর্যন্ত স্পষ্টভাবে কুফরী বিশ্বাস প্রমাণিত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে কাফির বলা যাবে না।"
(ফাতাওয়া দারুল উলূম, ৮ম খণ্ড)
৪. তবে সতর্কতা
যদিও প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে ঈমান চলে যাওয়ার আশঙ্কা নেই, তবুও এ ধরনের গান গাওয়া ও শোনা থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ:
১. গান-বাজিতা ইসলামে নিষিদ্ধ — বিশেষ করে এমন গান যা আল্লাহর উপর নির্ভরতাকে দুর্বল করে ২. এ ধরনের কথা বলা — "দোয়া লাগবে না" — শরীয়তের দৃষ্টিতে অনুচিত ৩. আবেগের বশবর্তী হয়ে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে তুলনা করা অনুচিত
মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন:
"স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ইসলামে বৈধ এবং প্রশংসনীয়, কিন্তু আল্লাহর সাথে সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কোনো কথা বা কাজ জায়েয নয়।"
৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:
- না বুঝে, কুফরী হবে না মনে করে কেউ যদি এমন গান গায়, এবং তার অন্তরে প্রকৃত বিশ্বাস থাকে যে আল্লাহই একমাত্র উপকার-অপকারকারী — তাহলে ঈমান চলে যাবে না।
- তবে যদি কেউ বিশ্বাস করে যে, দোয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, স্বামীই সব পারে — তাহলে এটি কুফরী হতে পারে।
- তওবা করা উচিত — আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকা।
৬. সংশ্লিষ্ট কুরআন ও হাদীস
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَمَا هُمْ بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ"
"তারা (জিন-শয়তান) আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো কোনো ক্ষতি করতে পারে না।" (সূরা বাকারা: ১০২)
হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهَ، وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ"
"তুমি যখন চাও, তখন আল্লাহর কাছেই চাও; আর যখন সাহায্য চাও, তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাও।" (তিরমিযী: ২৫১৬)
সারকথা: প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে, যদি কেউ না বুঝে এবং কুফরী হবে না মনে করে গান গায়, তাহলে ঈমান চলে যাবে না। তবে তওবা করা এবং এ ধরনের কথা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
والله أعلم بالصواب