সহজ ডেলিভারির জন্য কি আমল করা উচিত
Family Life · Hanafi
Question
এম্নিতে আমি নিজে নিজে কিছু পরিমাণ করে সূরা ইয়াসিন, দরুদ ও ইস্তিগফার এর টার্গেট নিয়েছি এই আশা যাতে পূর্ণ হয়। এটা কি ঠিক আছে?
Answer
সহজ ও নিরাপদ প্রসবের জন্য আমল
প্রশ্নের উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ, আপনার উদ্যোগটি খুবই ভালো। গর্ভবতী মায়ের জন্য সহজ ও নিরাপদ প্রসবের জন্য কুরআন ও হাদিসে কিছু আমলের কথা উল্লেখ আছে। আপনার নিজের নির্ধারিত আমল (সূরা ইয়াসিন, দরুদ ও ইস্তিগফার) করা অবশ্যই ঠিক আছে, তবে কিছু বিশেষ আমল কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত রয়েছে।
কুরআন ও হাদিস থেকে প্রমাণিত আমলসমূহ
১. সূরা ইনশিকাক ও সূরা যিলযাল পাঠ
হজরত উসমান ইবনে আবিল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে নারীর প্রসব বেদনা আরম্ভ হয়, তাকে সূরা ইনশিকাক এবং সূরা যিলযাল পাঠ করানো হলে সে সহজে সন্তান প্রসব করবে।" (মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস: ১৬০০; তাফসিরে রুহুল মাআনি, ৩০তম পারা)
২. সূরা ইউসুফের বিশেষ আয়াত
কোনো কোনো বর্ণনায় সূরা ইউসুফের নিম্নোক্ত আয়াতটি প্রসব সহজ করার জন্য পাঠ করার কথা উল্লেখ আছে:
قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ ۖ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُن مِّنَ الْجَاهِلِينَ
"সে বলল, হে আমার রব! তারা আমাকে যেদিকে ডাকছে, তা অপেক্ষা কারাগারই আমার কাছে বেশি প্রিয়। যদি আপনি তাদের চক্রান্ত আমার থেকে না সরান, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।" (সূরা ইউসুফ: ৩৩)
৩. সূরা ফাতিহা ও দরুদ
সূরা ফাতিহা পাঠ করে প্রসবকালীন মায়ের উপর ফুঁক দেওয়া এবং বেশি পরিমাণে দরুদ শরীফ পাঠ করা সহজ প্রসবের জন্য সহায়ক।
৪. হজরত মারইয়াম (আ.)-এর আমল
সূরা মারইয়ামের নিম্নোক্ত আয়াতটি প্রসবকালীন ব্যথায় পাঠ করার কথা হাদিসে উল্লেখ আছে:
وَأَجِیْٓـِٔیْ إِلَیْکِ بِجِذْعِ النَّخْلَةِ
"আর খেজুর গাছের কাণ্ড ধরে নিজের দিকে টেনে আনো..." (সূরা মারইয়াম: ২৫)
আপনার আমল সম্পর্কে
আপনি সূরা ইয়াসিন, দরুদ ও ইস্তিগফারের টার্গেট নিয়েছেন—এটি সম্পূর্ণ ঠিক আছে। তবে মনে রাখবেন:
১. সূরা ইয়াসিন পাঠ করা অনেক ফজিলতের কাজ। হাদিসে আছে, "যে ব্যক্তি সূরা ইয়াসিন পাঠ করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।" (তিরমিজি)
২. দরুদ শরীফ পাঠ করলে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সুপারিশ লাভ হয় এবং রিজিক বৃদ্ধি পায়।
৩. ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করলে আল্লাহ তাআলা বিপদ থেকে মুক্তি দেন এবং রিজিকের দরজা খুলে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি পাঠাবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সাহায্য করবেন।" (সূরা নূহ: ১০-১২)
গুরুত্বপূর্ণ নসিহত
১. আমলের সাথে তাওয়াক্কুল: আমলের পাশাপাশি আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখুন। মনে রাখবেন, প্রসব সহজ করবেন আল্লাহ তাআলাই।
২. চিকিৎসকের পরামর্শ: ইসলামী আমলের পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাও গ্রহণ করুন। ইসলামে চিকিৎসা করানো বৈধ এবং উৎসাহিত।
৩. দোয়া: প্রসবকালীন সময়ে এই দোয়াটি পড়ুন:
لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ، لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَرَبُّ الْأَرْضِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ
"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আজিমুল হালিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুল আরশিল আজিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুস সামাওয়াতি ওয়া রাব্বুল আরদি ওয়া রাব্বুল আরশিল কারিম।"
(বুখারি ও মুসলিম)
ফাতাওয়া ও উসুলি কিতাবের আলোকে
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, কুরআনের আয়াত দ্বারা শিফা (আরোগ্য) লাভ করা জায়েয। (রাদ্দুল মুহতার, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩৬৩ পৃষ্ঠা)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মা'আরিফুল কুরআনে উল্লেখ করেছেন যে, কুরআন তিলাওয়াত করে রোগীর উপর ফুঁক দেওয়া এবং শিফার নিয়তে পাঠ করা জায়েয। (মা'আরিফুল কুরআন, ১ম খণ্ড, ৪২ পৃষ্ঠা)
উপসংহার
আপনার নেওয়া টার্গেট (সূরা ইয়াসিন, দরুদ ও ইস্তিগফার) সম্পূর্ণ ঠিক আছে। সাথে সাথে উপরোক্ত আমলগুলোও করতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা এবং ধৈর্য ধারণ করা। আল্লাহ তাআলা আপনাকে সহজ ও নিরাপদ প্রসবের তাওফিক দান করুন। আমিন।