স্বপ্নে হাত অর্ধেক না থাকা, শরীর থেকে নিজেকে আলাদা দেখা, কথা বলতে না পারা—এর ইসলামী ব্যাখ্যা ও করণীয়।

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 4073
Questioner: Tasnēm Zareen
Question Asked: 17 Aug 2026, 02:51 PM
Reviewed & Published: 17 Aug 2026, 03:12 PM
Views: 9
Tokens: 5,957
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ঘুমের মধ্যে আমি দেখছি আমার হাত অর্ধেক নাই , আবার আমার হাতে কোনো একটা প্যাকেট যেমন ফেইসওয়াশ বা এই যাতের কোনো প্যাক হাতের আঙ্গুলে স্পর্শ লেগেছে আর ছুটছে না, অর্ধেক আঙুল নাই আমি হাত নাড়াতে পারছি না ইত্যাদি ইত্যাদি আবার কখনো হাতই উধাও । কিছুক্ষণ পর আমি আমার শরীর দেখছি সেইম কায়দা সেইম পোষাক সেইম ভঙ্গিতে শুয়ে আছে মানে আর একটা আমি ‌। আর মনে হচ্ছে এর আগেও আমার শরীর আমি এনেছি এবং আবারও সরাতে পেরেছি তাই মনে হলো এই শরীর টা সেভাবেই ঠিক করতে হবে বা সড়াতে হবে সেজন্য মনে হচ্ছিল বাড়ি দিলে শব্দ করলে চলে যাবে এরপর আমি নড়ার/ শব্দ করার চেষ্টা করছিলাম দেখলাম শরীর টা অর্ধেক উধাও হয়ে গেছে। আমার আম্মু আমাকে ডাকছে কিন্তু আমি সাড়া দিতে পারছি না আমার কন্ঠ দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না পরবর্তী তে অনেক কষ্টে কিভাবে যেন সাড়া দেই এবং উঠে বসি। আমার মনে হয়নি আমি স্বপ্ন দেখছিলাম মনে হচ্ছিল বাস্তব। এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাই।

দুই‍/ তিন দিন ধরে আমার পুরো শরীর ব্যথা হয়ে আছে এবং শক্তি নেই এরকম হয়ে আছে । প্রায়শই আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি অসুস্থ। সালাত ইবাদত ইত্যাদির প্রতি অনীহা। আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি আজেবাজে চিন্তা আরো অনেক কিছু।

Answer

স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

উত্তর

প্রিয় প্রশ্নকারিণী,

আপনার বর্ণিত স্বপ্নটি এবং সাথে সাথে আপনার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন। আমি বিস্তারিতভাবে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।

স্বপ্নের ব্যাখ্যা

আপনার স্বপ্নে যা দেখেছেন—হাত অর্ধেক না থাকা, হাত নাড়াতে না পারা, শরীর থেকে নিজেকে আলাদা দেখা, কথা বলতে না পারা—এগুলো মূলত শারীরিক দুর্বলতা, মানসিক চাপ এবং ক্লান্তির প্রতিফলন

ইসলামী পণ্ডিতদের মতে, স্বপ্ন সাধারণত তিন প্রকার: ১. সত্য স্বপ্ন (রহমানীয়) - যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ বা সতর্কবাণী ২. শয়তানের প্ররোচনা (শয়তানী) - যা মানুষকে ভয় দেখায় ও দুশ্চিন্তায় ফেলে ৩. মনের কল্পনা (নফসানী) - যা দৈনন্দিন চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন

আপনার স্বপ্নটি মূলত শারীরিক দুর্বলতা ও মানসিক অস্থিরতার কারণে হয়েছে। হাদীসে এসেছে:

رُؤْيَا الْمُسْلِمِ جُزْءٌ مِنْ سِتَّةٍ وَأَرْبَعِينَ جُزْءًا مِنَ النُّبُوَّةِ "মুসলিমের স্বপ্ন নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।" (সহীহ বুখারী: ৬৯৮৭)

তবে সব স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা জরুরী নয়। বিশেষ করে যে স্বপ্ন দুশ্চিন্তা ও ভয়ের সৃষ্টি করে, তা নিয়ে বেশি মাথা ঘামানো উচিত নয়।

শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে

আপনি উল্লেখ করেছেন:

  • ২/৩ দিন ধরে শরীর ব্যথা
  • শক্তি নেই
  • ঘুম থেকে উঠে অসুস্থ বোধ করা
  • সালাত-ইবাদতে অনীহা
  • আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি আজেবাজে চিন্তা

এটি একটি গুরুতর বিষয়। ইসলামী দৃষ্টিতে, ঈমানদারের জন্য আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি খারাপ চিন্তা আসা শয়তানের কুমন্ত্রণা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

إِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْتِي أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ: مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ حَتَّى يَقُولَ: مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ؟ فَإِذَا بَلَغَهُ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ "শয়তান তোমাদের কারো কাছে এসে বলে, এটা কে সৃষ্টি করেছে? ওটা কে সৃষ্টি করেছে? এমনকি বলে, তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে, তখন সে যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং এ চিন্তা বন্ধ করে।" (সহীহ মুসলিম: ১৩৪)

করণীয়

১. শারীরিক চিকিৎসা

  • প্রথমে একজন ভালো ডাক্তারের পরামর্শ নিন। আপনার শারীরিক দুর্বলতা ও ব্যথার কারণ খুঁজে বের করুন।
  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন।

২. মানসিক প্রশান্তি

  • নিয়মিত সালাত আদায় করুন, যদিও অনীহা থাকে। সালাতই মানসিক প্রশান্তির উৎস।
  • কুরআন তিলাওয়াত করুন, বিশেষ করে সূরা বাকারা, সূরা ফালাক ও সূরা নাস।
  • বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দরূদ শরীফ পড়ুন।

৩. শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে

  • আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম পড়ুন।
  • ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে ঘুমান।
  • নামাজের পর তাসবীহ পাঠ করুন।

৪. স্বপ্ন সম্পর্কে

  • এই স্বপ্ন নিয়ে ভয় পাবেন না বা বেশি চিন্তা করবেন না।
  • স্বপ্নের খারাপ প্রভাব দূর করতে ডান দিকে থুথু ফেলে ৩ বার "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়ুন এবং বাম দিকে থুথু ফেলুন।
  • এই স্বপ্ন কারো কাছে বর্ণনা না করাই উত্তম।

গুরুত্বপূর্ণ হাদীস

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا يَكْرَهُهَا فَلْيَتَحَوَّلْ وَلْيَتْفِلْ عَنْ يَسَارِهِ ثَلَاثًا وَلْيَسْأَلِ اللَّهَ مِنْ شَرِّهَا، فَإِنَّهَا لَنْ تَضُرَّهُ "তোমাদের কেউ অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে সে যেন অন্যদিকে ঘুরে যায় এবং বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে আল্লাহর কাছে এর ক্ষতি থেকে আশ্রয় চায়। তাহলে এ স্বপ্ন তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।" (সহীহ মুসলিম: ২২৬১)

উপসংহার

আপনার স্বপ্নটি শারীরিক দুর্বলতা ও মানসিক অস্থিরতার কারণে হয়েছে। এটি কোনো অশুভ লক্ষণ নয়। তবে আপনার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উন্নতির জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া এবং ইসলামী নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করা জরুরী।

আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং ধৈর্য ধরুন। আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ "হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা বাকারা: ১৫৩)

★প্রশ্নে উল্লেখিত স্বপ্ন ভয়ানক স্বপ্নের অন্তর্ভুক্ত। আপনি এ স্বপ্নের কথা কাউকে বলবেননা। বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইবেন,রাতে ঘুমানো আগে অযু করে পবিত্র কাপড়,পবিত্র বিছানায় তিন কুল পড়ে শরীরে ফুক দিয়ে আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমাবেন। একাকী ও পূর্ণ অন্ধকার রুমে না ঘুমানোর চেষ্টা করবেন।

আপনার জন্য করণীয় হল, ইসলামের প্রত্যেকটি বিধানকে গুরুত্ব সহকারে মেনে চলুন।

বিশেষকরে সঠিক সময়ে সালাত আদায় করুন এবং চাইলে কিছুটা দান-সদকাহ করতে পারেন।

কেননা হাদীসে এসেছে.... হযরত কা'ব ইবনে উজরাহ রাযি থেকে বর্ণিত, ﻭﻋﻦ ﻛﻌﺐ ﺑﻦ ﻋﺠﺮﺓ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ ﻗﺎﻝ : ﻗﺎﻝ ﻟﻲ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ : ( ﻭﺍﻟﺼﺪﻗﺔُ ﺗُﻄْﻔِﺊُ ﺍﻟﺨﻄﻴﺌﺔ ﻛﻤﺎ ﻳُﻄْﻔِﺊُ ﺍﻟﻤﺎﺀُ ﺍﻟﻨﺎﺭَ ) ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻱ ( 614 ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহিসসালাম আমাকে বলেছেন,সদকাহ ভূলভ্রান্তিকে এমনভাবে মিটিয়ে দেয় যেভাবে পানি আগুনকে মিটিয়ে দেয়। (তিরমিযি-৬১৪)

আল্লাহ আপনার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উন্নতি করুন এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হিফাজত করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.