মাঝেমধ্যে মনে হয় যে, “যদি স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে, তাহলে আমি হয়তো তার সাথে থাকতে পারব না, চলে যাব।” এদ্বারা কি কোনো সমস্যা হবে?
Family Life · Hanafi
Question
আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি বলি যে “যদি আমার হাজব্যান্ড দ্বিতীয় বিয়ে করে, তাহলে আমি হয়তো তার সাথে থাকতে পারব না, চলে যাব।” কিন্তু পরে আবার মনে হয়, মানুষ তো আল্লাহর জন্য কত কঠিন বিষয়ও সহ্য করে। তাহলে আমি কেন এটা সহ্য করতে পারব না?
এরপর ভয় লাগে—আমি যেহেতু এমন কথা বলছি, আল্লাহ কি আমার উপর রাগ করবেন? বা এমন কিছু ঘটিয়ে দিবেন যাতে আমাকে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়? শুধু এই কারণে যে আমি বলেছি আমি এটা সহ্য করতে পারব না?
আর এখন আমার মনে এই ভয়ও আসে, এবং আপনাকে এই প্রশ্ন করা থেকে কি বুঝায় যে আমি আল্লাহকে নিয়ে খারাপ ধারণা করছি? বা আল্লাহ সম্পর্কে ভুল চিন্তা করছি?
এছাড়া, এ ধরনের ভুল বা ভয়ভিত্তিক চিন্তা আসার কারণে কি আমার গুনাহ হচ্ছে? আমার কি আল্লাহ সম্পর্কে এমন সু-ধারণা রাখা উচিত যে, “ইন শা আল্লাহ, আমার জীবনে এমন কিছু হবে না”?
Answer
উত্তর
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
প্রিয় প্রশ্নকারী! আপনার মনের এই দ্বিধা, ভয় এবং সংশয় স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। আপনি যা অনুভব করছেন, তাতে ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো গুনাহ হচ্ছে না, যদি না আপনি আল্লাহর প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করেন বা ইচ্ছাকৃতভাবে অবিশ্বাস করেন। নিচে আপনার প্রশ্নের প্রতিটি দিক কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে বিশ্লেষণ করে দেওয়া হলো।
১. "যদি স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে, তাহলে থাকব না" – এই ভাবা কি গুনাহ?
ইসলামে দ্বিতীয় বিয়ে পুরুষের জন্য বৈধ, কিন্তু স্ত্রীর জন্য এটি মানসিকভাবে কঠিন একটি বিষয়। আপনার মনে এ ধরনের চিন্তা আসা স্বাভাবিক। তবে এটি বলার অর্থ এই নয় যে, আপনি আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করছেন বা বিদ্রোহ করছেন। বরং এটি আপনার মানসিক দুর্বলতা ও স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
হাদিসে এসেছে:
"إن الله تجاوز لأمتي عما وسوست به صدورهم، ما لم تتكلم به أو تعمل به"
"আল্লাহ আমার উম্মতের মনের মধ্যে উদিত খেয়াল-খুশালা (যা কাজে পরিণত হয়নি) ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা মুখে বলে বা কাজে পরিণত করে।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬৬৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২৭)
সুতরাং, আপনি যদি শুধু মনে মনে এই চিন্তা করেন এবং তা কোনো কাজে পরিণত না করেন, তাহলে এতে কোনো গুনাহ নেই।
২. আল্লাহ কি আমার উপর রাগ করবেন? নাকি আমাকে পরীক্ষায় ফেলবেন?
আল্লাহর প্রতি আপনার সু-ধারণা রাখা উচিত। তিনি অত্যন্ত দয়ালু ও ক্ষমাশীল। আপনি যদি ভয়ের কারণে এটা বলেন, তাহলে আল্লাহ আপনার দুর্বলতা বুঝবেন এবং এর জন্য আপনাকে শাস্তি দেবেন না, বরং তিনি ক্ষমাশীল।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ"
"আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
(সুরা বাকারা, আয়াত: ২২৫)
অতএব, আপনি যদি মনে মনে ভয় পান যে, আল্লাহ আপনার এই কথার জন্য আপনাকে পরীক্ষায় ফেলবেন, তাহলে এটি আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারণা নয়, বরং এটি আপনার নিজের অক্ষমতা ও অস্থিরতার প্রকাশ। কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে—আল্লাহর প্রতি কখনোই খারাপ ধারণা (সু-ধারণার বিপরীত) পোষণ করা যাবে না।
হাদিসে কুদসিতে এসেছে:
"أنا عند ظن عبدي بي، فليظن بي ما شاء"
"আমি আমার বান্দার যেরূপ ধারণা পোষণ করে, সেরূপই হয়ে থাকি। সে আমার সম্পর্কে যা ইচ্ছা ধারণা করতে পারে।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৭৫)
অর্থাৎ, আপনার উচিত আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা রাখা। যেমন আপনি বলছেন, "ইন শা আল্লাহ, আমার জীবনে এমন কিছু হবে না"—এটি উত্তম ধারণা।
৩. "আমি কি আল্লাহকে নিয়ে খারাপ ধারণা করছি?"
আপনার প্রশ্নটি করার মাধ্যমে বোঝা যায় যে, আপনি আল্লাহকে নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করছেন না; বরং আপনি ভয় পাচ্ছেন এবং এ বিষয়ে জানতে চাচ্ছেন। এটি আপনার ঈমানের দুর্বলতা নয়, বরং একটি স্বাভাবিক মানসিক দ্বন্দ্ব।
তবে, যদি কখনো মনে আসে যে, "আল্লাহ হয়তো আমাকে শাস্তি দেবেন আমার এই কথার জন্য"—এটি আল্লাহর প্রতি খারাপ ধারণা নয়, বরং নিজের অক্ষমতা ও পরিণামের ভয়। কিন্তু যদি আপনি মনে করেন, "আল্লাহ জুলুম করেন বা অন্যায় করেন"—সেটি খারাপ ধারণা হবে। আপনাকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
হানাফি ফিকহের বিখ্যাত কিতাব "রদ্দুল মুহতার" -এ এসেছে:
"الخواطر لا تؤاخذ بها ما لم تستقر"
"মনের খেয়াল-খুশালা (যা স্থির হয়নি) এর জন্য পাকড়াও করা হবে না।"
(ইবনে আবিদীন, রদ্দুল মুহতার, ১/৪২)
৪. এই ভয়ভিত্তিক চিন্তা আসার কারণে কি গুনাহ হচ্ছে?
আপনি যদি শুধু ভয় পান এবং এতে আপনি অস্থির হন, তাহলে এটি গুনাহ নয়। বরং এটি শয়তানের প্ররোচনা হতে পারে। শয়তান মানুষকে ভীতি প্রদর্শন করে এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"إِنَّمَا ذَٰلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ"
"ওই তো শয়তান; সে তার বন্ধুদের ভয় দেখায়। কাজেই তোমরা তাদের ভয় করো না; বরং আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা মুমিন হও।"
(সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭৫)
৫. সু-ধারণা রাখা ও দোয়া করার গুরুত্ব
আপনার উচিত আল্লাহর প্রতি অবিচল সু-ধারণা রাখা এবং দোয়া করা যে, আল্লাহ আপনার জীবনে এমন কোনো কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি করবেন না যা আপনি সহ্য করতে পারবেন না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"لا يموتن أحدكم إلا وهو يحسن الظن بالله"
"তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর সাথে সু-ধারণা পোষণ করা অবস্থায় ছাড়া মৃত্যুবরণ না করে।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮৭৭)
৬. কী করবেন?
উপরের আলোচনা থেকে বোঝা গেল, আপনার চিন্তা ও ভয় স্বাভাবিক এবং গুনাহ নয়। তবে নিজেকে শক্তিশালী করার জন্য নিম্নলিখিত কাজগুলো করুন:
১. প্রচুর ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করুন।
২. দোয়া করুন: "ইয়া আল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্য দিন এবং আমার প্রতি দয়া করুন। আমার জীবনে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করবেন না যা আমি সহ্য করতে না পারি।"
৩. আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা রাখুন।
৪. শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচতে সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়ুন।
৫. নিজের স্বামীর সাথে সম্পর্ক মজবুত করুন এবং দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকুন।
ইমাম আওযায়ী (রহ.) বলেছেন:
"إن عظم البلاء عظم الأجر"
"পরীক্ষার কষ্ট যত বড় হবে, প্রতিদানও তত বড় হবে।"
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৯৬)
সারসংক্ষেপ
- শুধু মনের চিন্তা বা ভয় গুনাহ নয়।
- আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা রাখা ফরজ।
- আপনার প্রশ্ন করা আল্লাহর প্রতি খারাপ ধারণার প্রমাণ নয়, বরং এটি আপনার ঈমানের দুর্বলতা নয় বরং শয়তানের ওয়াসওয়াসা।
- নিজেকে ধৈর্য ও আল্লাহর রহমতের উপর স্থির রাখুন।
আল্লাহ আপনার ভয় দূর করুন, আপনার ঈমান মজবুত করুন এবং আপনার পরিবারে শান্তি বজায় রাখুন।
রেফারেন্স:
- সহিহ বুখারি: ৬৬৬৪
- সহিহ মুসলিম: ১২৭, ২৬৭৫, ২৮৭৭
- সুরা বাকারা: ২২৫
- সুরা আলে ইমরান: ১৭৫
- ইবনে আবিদীন, রদ্দুল মুহতার: ১/৪২
- উসুলুল শাশি (হানাফি উসুলের কিতাব)