বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশী শিক্ষার্থী ভর্তির সাহায্যের বিনিময়ে অর্থ নেওয়া কি জায়েজ হবে?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 4028
Questioner: Labib Arefin
Question Asked: 16 Aug 2026, 12:23 AM
Reviewed & Published: 16 Aug 2026, 12:42 AM
Views: 11
Tokens: 8,335
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব, আমার একটি বিষয়ে শরীয়তের সুনির্দিষ্ট বিধান জানার প্রয়োজন ছিল। আশা করি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আমাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে বাধিত করবেন।
​প্রেক্ষাপট:
আমি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশে, বিশেষ করে রাশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তির ব্যাপারে দাপ্তরিক ও অন্যান্য সহায়তা করে থাকি। আমার এই শ্রম, সময় ও গাইডেন্সের বিনিময়ে আমি কনসালটেন্সি বা সার্ভিস চার্জ হিসেবে একটি নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক গ্রহণ করি।
​আমার প্রশ্ন ও সংশয়:
আমার এই উপার্জনের বৈধতা নিয়ে মনে একটি মারাত্মক দ্বিধা কাজ করছে। রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বভাবতই সহশিক্ষা (Co-education) চালু আছে। সেখানে ছেলে-মেয়েরা একসাথে পড়াশোনা করে এবং নারী সহপাঠী বা শিক্ষিকারা ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী পর্দা পালন করেন না। এছাড়া, সেখানকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ এমন, যেখানে একজন তরুণ শিক্ষার্থীর ফিতনায় জড়ানোর বা পাপের সুযোগ তুলনামূলক অনেক বেশি।
​এই অবস্থায় আমার জানার বিষয় হলো:
১. আমি যে একজন শিক্ষার্থীকে এমন একটি পরিবেশে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছি বা ভর্তি প্রক্রিয়ায় সাহায্য করছি, এর কারণে সে সেখানে গিয়ে কোনো ফিতনায় বা পাপে জড়ালে আমি কি পরোক্ষভাবে তার সেই পাপের অংশীদার হব?
২. এই ভর্তি প্রক্রিয়ায় তাকে সাহায্য করার বিনিময়ে তার কাছ থেকে আমার নেওয়া পারিশ্রমিক বা টাকাটা কি ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে হালাল হবে, নাকি হারাম?
​দয়া করে বিষয়টি বিস্তারিত জানিয়ে আমার মনের সংশয় দূর করবেন, যাতে আমি সম্পূর্ণ হালাল ও শরীয়তসম্মত উপায়ে আমার কাজ পরিচালনা করতে পারি।
​জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Answer

বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সহায়তার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণের বিধান

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার উদ্বেগটি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহী মাসআলা। নিম্নে কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো:

১. পাপের অংশীদার হওয়া প্রসঙ্গে

আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন:

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পরকে সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরকে সাহায্য করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)

এই আয়াতের আলোকে, যদি কেউ এমন কাজে সহায়তা করে যা সরাসরি পাপের দিকে নিয়ে যায়, তবে সে পাপের অংশীদার হবে। কিন্তু এখানে বিষয়টি হলো:

মূলনীতি: কোনো কাজ নিজে বৈধ হলে, তার সহায়তা করাও বৈধ। তবে যদি সেই বৈধ কাজটি ব্যবহার করে কেউ পাপ করে, তবে সহায়তাকারী পাপের অংশীদার হবেন না, যতক্ষণ না তার নিয়ত বা উদ্দেশ্য পাপে সহায়তা করা হয়।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.)《রাদ্দুল মুহতার)

"الْأَصْلُ أَنَّ مَا كَانَ وَسِيلَةً إِلَى مُحَرَّمٍ فَهُوَ مُحَرَّمٌ" "মূলনীতি হলো, যে কাজ হারামের দিকে পৌঁছানোর মাধ্যম হয়, সেটিও হারাম।" (রাদ্দুল মুহতার, ৯/৫৫০)

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো—উক্ত কাজটি কি সরাসরি হারামের দিকে নিয়ে যায়, নাকি সম্ভাব্য হারামের দিকে নিয়ে যেতে পারে?

বিশ্লেষণ:

  • বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা নিজে কোনো হারাম কাজ নয়। বরং জ্ঞান অর্জন ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  • সহশিক্ষা (Co-education) পরিবেশে পড়াশোনা করা—যদিও শরীয়তসম্মত নয়, তবে এটি একটি পরিবেশগত সমস্যা, যা শিক্ষার্থী নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে সেখানে যায়।
  • আপনি শুধুমাত্র ভর্তি প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছেন, আপনি তাকে পাপ করতে বলছেন না বা পাপের নির্দেশ দিচ্ছেন না।

ফিকহী নীতি: হানাফী ফিকহে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো:

"الْحَاكِمُ بِالْعَادَةِ كَالْحَاكِمِ بِالنَّصِّ" "প্রচলিত রীতি-রেওয়াজ সেই বিধানই পায় যা نص (কুরআন-হাদীস) থেকে প্রমাণিত।"

আরেকটি নীতি হলো:

"الْأُمُورُ بِمَقَاصِدِهَا" "বিষয়সমূহের বিধান তার উদ্দেশ্যের উপর নির্ভরশীল।"

আপনার উদ্দেশ্য যদি হয় শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষায় সহায়তা করা, এবং আপনি জানেন না যে সে সেখানে গিয়ে পাপ করবে, তবে আপনি পাপের অংশীদার হবেন না। কিন্তু যদি আপনি জানেন যে, সে সেখানে গিয়ে অবশ্যই পাপে লিপ্ত হবে (যেমন: জেনে বুঝে তাকে হারাম পরিবেশে পাঠানো), তাহলে বিষয়টি ভিন্ন।

তবে সতর্কতা: যেহেতু আপনি জানেন যে, রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সহশিক্ষা চালু এবং পর্দার ব্যবস্থা নেই, তাই আপনার উচিত:

  • শিক্ষার্থীকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া যে, সেখানে গিয়ে সে শরীয়তের কোন কোন বিধান লঙ্ঘনের সম্মুখীন হতে পারে।
  • তাকে ইসলামী আদর্শ ও পর্দা রক্ষার উপদেশ দেওয়া।
  • যদি সম্ভব হয়, এমন বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রোগ্রাম বেছে নেওয়ার চেষ্টা করা যেখানে ইসলামী পরিবেশ তুলনামূলকভাবে ভালো।

২. পারিশ্রমিক গ্রহণের বৈধতা

আপনার দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, এই সহায়তার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা হালাল হবে কি না।

মূলনীতি: ইসলামে বৈধ কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা সম্পূর্ণ জায়েয। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ "যদি তারা তোমাদের সন্তানদের স্তন্যদান করে, তবে তাদেরকে তাদের পারিশ্রমিক প্রদান করো।" (সূরা আত-তালাক: ৬)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"أَعْطُوا الْأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ" "মজুরকে তার পারিশ্রমিক ঘাম শুকানোর আগেই দাও।" (ইবনে মাজাহ: ২৪৪৩)

হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: হানাফী ফিকহে ওকালত (প্রতিনিধিত্ব) ও জু'আলাহ (পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ) উভয়ই বৈধ। ইমাম কাসানী (রহ.)在其《বাদায়েউস সানায়ে》中写道:

"الْإِجَارَةُ جَائِزَةٌ عَلَى كُلِّ عَمَلٍ مُبَاحٍ" "প্রতিটি বৈধ কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েয।" (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/১৭৪)

আপনার কাজের প্রকৃতি: আপনি ভর্তি প্রক্রিয়ায় দাপ্তরিক সহায়তা, গাইডেন্স, ডকুমেন্টেশন ইত্যাদি সেবা প্রদান করছেন। এটি একটি বৈধ পেশা। এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েয, ইনশাআল্লাহ।

তবে শর্ত: আপনার পারিশ্রমিক হালাল হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হওয়া জরুরি:

  1. আপনার কাজটি সম্পূর্ণ বৈধ হতে হবে (যা আপনি করছেন)।
  2. আপনি যে শিক্ষার্থীকে সহায়তা করছেন, তার উদ্দেশ্য যদি উচ্চশিক্ষা অর্জন হয় (যা বৈধ), তবে আপনার পারিশ্রমিক হালাল।
  3. আপনার পারিশ্রমিক নির্ধারিত এবং স্পষ্ট হতে হবে, যাতে কোনো প্রতারণা না থাকে।

৩. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা ও পরামর্শ

ক. নিয়ত সংশোধন করুন: আপনার নিয়ত যেন শুধুমাত্র অর্থ উপার্জন না হয়, বরং শিক্ষার্থীদের বৈধ উচ্চশিক্ষায় সহায়তা করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ" "নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।" (বুখারী: ১, মুসলিম: ১৯০৭)

খ. শিক্ষার্থীদের সতর্ক করুন: আপনি যাদের ভর্তি করাচ্ছেন, তাদেরকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন যে, বিদেশে গিয়ে তারা ইসলামী বিধান লঙ্ঘনের সম্মুখীন হতে পারে। তাদেরকে পর্দা, নামাজ ও ইসলামী আদর্শ রক্ষার উপদেশ দিন।

গ. বিকল্প ব্যবস্থা: যদি সম্ভব হয়, এমন বিশ্ববিদ্যালয় বা দেশ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করুন যেখানে ইসলামী পরিবেশ তুলনামূলকভাবে ভালো। যেমন: মালয়েশিয়া, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইত্যাদি।

ঘ. হারাম কাজে সহায়তা না করা: যদি কোনো শিক্ষার্থী স্পষ্টতই এমন উদ্দেশ্যে বিদেশে যেতে চায় যা হারাম (যেমন: শুধুমাত্র হারাম সম্পর্ক বা বেহায়াপনার জন্য), তবে তাকে সহায়তা করা থেকে বিরত থাকুন।

৪. ফিকহী রেফারেন্স

ক. কুরআন:

  • সূরা আল-মায়িদা: ২ (সৎকাজে সহযোগিতা)
  • সূরা আত-তালাক: ৬ (পারিশ্রমিক প্রদান)

খ. হাদীস:

  • "أَعْطُوا الْأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ" (ইবনে মাজাহ: ২৪৪৩)
  • "إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ" (বুখারী: ১)

গ. হানাফী ফিকহের কিতাব:

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৯/৫৫০
  • বাদায়েউস সানায়ে (ইমাম কাসানী), ৪/১৭৪
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (ফাতাওয়া আলমগীরী), ৪/৪৪৭
  • আল-হিদায়া (মারগীনানী), ৩/২৩০

৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

সংক্ষেপে উত্তর:

১. পাপের অংশীদার হওয়া: আপনি যদি নিয়ত ও উদ্দেশ্য ভালো রাখেন এবং শিক্ষার্থীকে সতর্ক করেন, তবে সে সেখানে গিয়ে পাপ করলে আপনি পাপের অংশীদার হবেন না। তবে আপনার উচিত তাকে ইসলামী আদর্শ রক্ষার উপদেশ দেওয়া এবং সম্ভব হলে ভালো পরিবেশের বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া।

২. পারিশ্রমিক গ্রহণ: আপনার কাজটি বৈধ এবং এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা হালাল, ইনশাআল্লাহ। তবে শর্ত হলো, আপনার কাজটি সম্পূর্ণ বৈধ হতে হবে এবং আপনার নিয়ত সঠিক হতে হবে।

মনে রাখবেন: ইসলামে জ্ঞান অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ" "জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ।" (ইবনে মাজাহ: ২২৪)

তাই আপনি যদি শিক্ষার্থীদের বৈধ উচ্চশিক্ষায় সহায়তা করেন, তবে এটি একটি সৎকাজ। আপনার পারিশ্রমিক হালাল হবে, ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.