পাবজি, ফ্রি ফায়ার গেমস খেলে, আইডি বিক্রি করে এবং খেলা শিখিয়ে উপার্জনের ইসলামী বিধান।
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
গেমস খেলে উপার্জন সংক্রান্ত ফতোয়া
প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: একজন ফ্রি ফায়ার, পাবজি গেমস খেলে, গেমসের আইডি বিক্রি করে এবং খেলা শিখিয়ে টাকা ইনকাম করে। তার ইনকাম কি হালাল? তার কেনা কোনো খাবার খাওয়া যাবে? খেয়ে ফেললে করণীয় কি?
উত্তর
১. গেমস খেলে উপার্জনের বিধান
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে গেমস খেলে উপার্জনের বিধান নির্ভর করে গেমসের প্রকৃতির উপর:
ক) যে সকল গেমসে জুয়া/বাজি থাকে: পাবজি এবং ফ্রি ফায়ারের মতো গেমসে সাধারণত স্কিন, অস্ত্র, চরিত্র ইত্যাদি কেনাবেচা হয় এবং কিছু মোডে বাজি ধরার সুযোগ থাকে। যদি কোনো গেমসে জুয়া, বাজি বা সুদযুক্ত লেনদেন থাকে, তবে তা হারাম।
খ) যে সকল গেমসে হারাম উপাদান থাকে: যেসব গেমসে নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক, অশ্লীলতা, শিরক বা কুফরি উপাদান থাকে, সেগুলো খেলা জায়েয নয়।
গ) সময় নষ্টের দিক থেকে: যদি গেমস খেলায় অতিরিক্ত সময় নষ্ট হয় এবং নামাজ, জিকির ইত্যাদি থেকে গাফেল করে, তবে তা মাকরূহ।
ঘ) আইডি বিক্রি ও খেলা শিখিয়ে উপার্জন:
- আইডি বিক্রি: গেমসের আইডি বিক্রি করা যদি জুয়া বা প্রতারণার সাথে জড়িত না হয়, তবে কিছু ফকীহ এর অনুমতি দিয়েছেন। তবে যেহেতু গেমসটি নিজেই যদি হারাম বা মাকরূহ হয়, তাহলে তার আইডি বিক্রিও জায়েয হবে না।
- খেলা শিখিয়ে উপার্জন: যদি গেমসটি বৈধ হয় এবং শেখানোতে কোনো হারাম উপাদান না থাকে, তবে তা জায়েয। কিন্তু পাবজি/ফ্রি ফায়ারের মতো গেমসে সাধারণত সহিংসতা, অশ্লীলতা এবং সময় নষ্টের বিষয় থাকে, তাই এগুলো শিখিয়ে উপার্জন করা মাকরূহে তাহরিমি বা হারামের কাছাকাছি।
২. তার কেনা খাবার খাওয়ার বিধান
যেহেতু তার উপার্জন সম্পূর্ণ হালাল নয় (গেমসে হারাম উপাদান থাকার কারণে), তাই তার কেনা খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে যদি কেউ জেনে বা না জেনে খেয়ে ফেলেন, তাহলে:
৩. খেয়ে ফেললে করণীয়
যদি কেউ এমন ব্যক্তির কেনা খাবার খেয়ে ফেলে, যার উপার্জনে হারাম ও হালাল মিশ্রিত আছে, তাহলে: তওবা করতে হবে,সমপরিমাণ টাকা ছওয়াবের নিয়ত ছাড়া গরিব মিসকিনদের মাঝে সদকাহ করতে হবে।
দলিল ও উল্লেখযোগ্য ফতোয়া
কুরআন থেকে দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ" "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
"يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ ۖ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِمَا" "তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে মদ ও জুয়া সম্পর্কে। বলুন, এ দুটিতে রয়েছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য কিছু উপকার; কিন্তু এ দুটির পাপ উপকারের চেয়ে অনেক বড়।" (সূরা আল-বাকারা: ২১৯)
হাদিস থেকে দলিল:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا" "নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কিছুই কবুল করেন না।" (সহীহ মুসলিম: ১০১৫)
হানাফি ফিকহের কিতাব থেকে:
১. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ইবনে আবিদীন রহ. বলেন, এমন বস্তু দ্বারা উপার্জন করা জায়েয নয় যা শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম বা নিষিদ্ধ। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫)
২. ফতোয়ায়ে শামী: যে ব্যক্তির উপার্জনে হারাম ও হালাল মিশ্রিত থাকে, তার কাছ থেকে খাবার গ্রহণ করা মাকরূহ। তবে যদি কেউ খেয়ে ফেলে, তবে তার জন্য তওবা করাই যথেষ্ট। (ফতোয়ায়ে শামী, ৯/৫৪৭)
৩. ফতোয়ায়ে উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানি): যেসব গেমসে জুয়া, অশ্লীলতা বা হারাম উপাদান থাকে, সেগুলো খেলা এবং সেগুলো থেকে উপার্জন করা জায়েয নয়। (ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/৪৫৬)
৪. ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী): যে ব্যক্তির উপার্জন সন্দেহজনক, তার কাছ থেকে খাবার গ্রহণ না করাই উত্তম। তবে খেয়ে ফেললে তওবা করতে হবে। (ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/২৩৪)
৫. বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী): যে খেলায় সময় নষ্ট হয় এবং শরীয়তের কোনো বিধান লঙ্ঘিত হয়, তা খেলা জায়েয নয়। (বাহিশতী জেওর, ২/৪৫)
সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ
১. পাবজি/ফ্রি ফায়ার গেমসে সাধারণত সহিংসতা, অশ্লীলতা, সময় নষ্ট এবং কিছু ক্ষেত্রে জুয়ার উপাদান থাকে। তাই এগুলো খেলা এবং এগুলো থেকে উপার্জন করা জায়েয নয়।
২. আইডি বিক্রি ও খেলা শিখিয়ে উপার্জন - যেহেতু গেমসটি নিজেই সমস্যাযুক্ত, তাই এর মাধ্যমে উপার্জনও জায়েজ নেই।
৩. তার কেনা খাবার - যেহেতু তার উপার্জন সম্পূর্ণ হালাল নয়, তাই তার কেনা খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
৪. খেয়ে ফেললে - তওবা করতে হবে,সমপরিমাণ টাকা ছওয়াবের নিয়ত ছাড়া গরিব মিসকিনদের মাঝে সদকাহ করতে হবে।
উত্তম পথ: এই ব্যক্তিকে হালাল উপার্জনের পথ খুঁজে বের করার পরামর্শ দেওয়া উচিত এবং তার সাথে সদ্ব্যবহার করা উচিত, যাতে সে হালাল পথে ফিরে আসতে পারে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।