স্বাস্থ্য সহকারী কর্মীর চাকরি শরীয়তসম্মতভাবে হালাল কি না এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত হানাফি ফতোয়া ও দলিলভিত্তিক উত্তর জানতে চাই?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 4017
Questioner: আফরিন
Question Asked: 15 Aug 2026, 07:32 PM
Reviewed & Published: 15 Aug 2026, 07:57 PM
Views: 34
Tokens: 3,469
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

প্রশ্নঃ
১৬৪৮১৭. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, স্বাস্থ্য সহকারী কর্মীর চাকরী কি শরীয়াসম্মত ভাবে হালাল?সেখানে যে জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গুলো পালন করা হয় বিভিন্ন কার্যক্রম থাকে এটা নিয়ে আমার একটু সংশয় হচ্ছে।

Answer

উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের উত্তর সংক্ষেপে: স্বাস্থ্য সহকারী কর্মীর চাকরি মূলত হালাল ও বৈধ, তবে জন্মনিয়ন্ত্রণ (পরিবার পরিকল্পনা) সংক্রান্ত যে সকল কার্যক্রম সম্পাদন করতে হয়, সেগুলোর বিধান ভিন্ন। ইসলামী শরীয়াহর দৃষ্টিতে স্থায়ী জন্মনিয়্ট্রণ (অপারেশন ইত্যাদি) হারাম, তবে সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ (কনডম, পিল, ইনজেকশন ইত্যাদি) বৈধ হওয়ার শর্ত রয়েছে। তাই আপনার চাকরিতে যদি এমন কোনো কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকে যা সরাসরি হারাম (যেমন: স্থায়ী বন্ধ্যাকরণে সহায়তা করা), তাহলে সেই অংশটি পরিহার করা জরুরি। চাকরিটি সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং হারাম কাজের অংশটি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।


বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা:

১. মূলনীতি: ইসলামী শরীয়াহতে জীবিকা অর্জনের মূল ভিত্তি হলো হালাল ও বৈধ উপায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِن رِّزْقِهِ" (তিনিই তোমাদের জন্য পৃথিবীকে সুগম করেছেন, অতএব তোমরা তার পথে বিচরণ কর এবং তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে আহার কর।) [সূরা আল-মুলক: ১৫]

তাই স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া একটি সম্মানজনক ও বৈধ পেশা, যতক্ষণ পর্যন্ত এর সাথে শরীয়তবিরোধী কোনো কাজ জড়িত না থাকে।

২. জন্মনিয়ন্ত্রণের শরয়ী বিধান: জন্মনিয়ন্ত্রণ বা পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে ইসলামী পণ্ডিতদের মতামত হলো:

  • স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ (تعقيم/بنج بندی): এটি সম্পূর্ণ হারাম। কারণ এটি আল্লাহর দেওয়া সন্তান লাভের নিয়ামতকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) 'আযল' (coitus interruptus) সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেন:

"ذَاكُمُ الْوَأْدُ الْخَفِيُّ" (এটা হলো লুকানো হত্যা।) [সহীহ মুসলিম: ১৪৪২] যদিও পরবর্তীতে সাহাবীদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু স্থায়ী বন্ধ্যাকরণকে কখনোই বৈধ বলা হয়নি। ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) তাঁর 'রাদ্দুল মুহতার' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া 'আযল' করা মাকরূহ, আর স্থায়ীভাবে বন্ধ্যা করে দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। (রাদ্দুল মুহতার, ২/৩৭৮)

  • সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ (مانع حمل): এটি বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত হলো: ১. স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতি থাকতে হবে। ২. এটি এমন কোনো ক্ষতির কারণ হবে না যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ৩. দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান না নেওয়ার উদ্দেশ্য না হয়ে বরং সন্তানের সুস্বাস্থ্য, মায়ের স্বাস্থ্য বা সঠিক লালন-পালনের জন্য হতে হবে। ইমাম আল-কাসানী (রহ.) 'বাদায়েউস সানায়ে' গ্রন্থে বলেন, 'আযল' (সাময়িক ব্যবস্থা) জায়েয, কারণ এটি স্থায়ীভাবে বন্ধ্যা করে না। (বাদায়েউস সানায়ে, ২/৩৩২)

৩. চাকরির বিধান: আপনার চাকরিতে যদি নিম্নলিখিত কাজগুলো থাকে, তাহলে সেগুলো থেকে বিরত থাকা জরুরি:

  • স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ (টিউবেকটমি, ভ্যাসেকটমি) অপারেশনে সরাসরি অংশগ্রহণ বা সহায়তা করা।
  • গর্ভপাত (ইসকাত-ই-হামল) করাতে সহায়তা করা, যা ইসলামে হারাম (যদি না মায়ের জীবন রক্ষার প্রয়োজন হয়)।
  • এমন কোনো ওষুধ বা উপকরণ বিতরণ করা যা সরাসরি ক্ষতিকর বা হারাম।

তবে যদি চাকরিতে সাধারণ স্বাস্থ্য সেবা, রোগী দেখাশোনা, টিকা দেওয়া, প্রাথমিক চিকিৎসা ইত্যাদি থাকে এবং সাথে জন্মনিয়ন্ত্রণের সাময়িক পদ্ধতি (যেমন: কনডম, পিল) বিতরণ করা হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত নিয়ম প্রযোজ্য:

  • যদি আপনি জানেন যে, সেই পিল বা কনডম ব্যবহার করে কোনো মুসলিম দম্পতি শরীয়তসম্মত শর্তে (উভয়ের সম্মতিতে) ব্যবহার করবে, তাহলে তা বিতরণ করা জায়েয।
  • যদি আপনি জানেন যে, এটি হারাম উদ্দেশ্যে (যেমন: স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ বা অন্যায়ভাবে) ব্যবহার হবে, তাহলে সেই অংশে সহায়তা করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

৪. ফতোয়া ও আধুনিক পণ্ডিতদের মত: মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) এবং মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) সহ আধুনিক হানাফি পণ্ডিতগণ বলেছেন:

"সরকারি চাকরিতে যদি বৈধ ও অবৈধ কাজ মিশ্রিত থাকে, তাহলে চাকরি ছেড়ে দেওয়া জরুরি নয়; বরং অবৈধ অংশটি এড়িয়ে চলা ফরজ। যদি অবৈধ অংশটি এড়িয়ে চলা সম্ভব না হয় এবং আয়ের প্রধান উৎসই সেই অবৈধ কাজ হয়, তাহলে সেই চাকরি ত্যাগ করা ওয়াজিব।" (ফতোয়া উসমানি, ২/৪৩৫; ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/২৯৪)

৫. আপনার জন্য করণীয়:

  • আপনি যদি মনে করেন যে, আপনার কাজের একটি বড় অংশ জন্মনিয়ন্ত্রণের স্থায়ী পদ্ধতি বা হারাম কাজে সহায়তা করছে, তাহলে আপনার উচিত সুপারভাইজারকে জানিয়ে সেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার চেষ্টা করা।
  • যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে অন্য কোনো বিভাগে বদলির চেষ্টা করুন।
  • যদি চাকরিটি সম্পূর্ণভাবে হারাম কাজের উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে ধীরে ধীরে অন্য হালাল উপায় খুঁজে নিন এবং চাকরি পরিবর্তন করুন। তবে হঠাৎ করে চাকরি ছেড়ে দেওয়া জরুরি নয়, যদি আপনি হারাম অংশটি এড়িয়ে চলতে পারেন।

উপসংহার: স্বাস্থ্য সহকারী কর্মীর চাকরি নিজে হালাল, তবে জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির যে অংশটি শরীয়তসম্মত নয় (স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ, গর্ভপাত), সেটি এড়িয়ে চলা আপনার জন্য জরুরি। আল্লাহ তাআলা আপনাকে হালাল রিজিকের তাওফিক দান করুন। (আমিন)

দলিলসমূহ:

  • সূরা আল-মুলক: ১৫
  • সহীহ মুসলিম: ১৪৪২ (আযল সম্পর্কিত হাদীস)
  • রাদ্দুল মুহতার, ২/৩৭৮
  • বাদায়েউস সানায়ে, ২/৩৩২
  • ফতোয়া উসমানি, ২/৪৩৫
  • ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/২৯৪

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.