হারাম রিজিক ও সুদের প্রভাব, পরিবারে অশান্তি, অসুস্থতা এবং আখিরাতের শাস্তি সম্পর্কে।
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার বাসার ইনকাম হারাম,অর্থাৎ সুদ খায় পরিবারের কর্তারা।তাদের বুজালেও বুজে নাহ,যে হারাম সুদ খাওয়া।বরং তারা আরও যুক্তি দেয় যে হারাম রিজিক এখন সব জায়গায় আছে,ব্যাংকেও ত হালাল টাকা মানে ইত্যাদি বুজায়!!!
১)আমাদের পরিবারে অশান্তি সবসময় লেগে থাকে,ইদানীং ত আমার আব্বু অনেক অসুস্থ ছিলেন, আর আমার আম্মুও অনেক অসুস্থ যার জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ হচ্ছে,এসব কি এই হারাম রিজিকের জন্যই?
২)তাদেরকে কীভাবে বুজায় যে হারাম টাকা এসব!
৩) সুদের(হারাম টাকার) শাস্তি কি আর দুনিয়াতে কেমন শাস্তি পায়!
৪) আমি একজন মেয়ে হয়ে কতটুকু গ্রহণ করব রিজিক তাদের থেকে।
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। নিচে ধাপে ধাপে উত্তর দেওয়া হলো:
১) পরিবারে অশান্তি ও অসুস্থতা কি হারাম রিজিকের কারণে?
উত্তর:
হ্যাঁ, ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী হারাম রিজিক (সুদের টাকা) পরিবারে অশান্তি, অসুস্থতা এবং বরকতের অভাব সৃষ্টি করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি সুদ খায়, তার পরিবারে বরকত উঠে যায় এবং তার জীবনে অশান্তি নেমে আসে।"
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৭৯)
তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি অসুস্থতা বা অশান্তি শুধু হারাম রিজিকের ফল। আল্লাহ তাআলা পরীক্ষাস্বরূপও রোগ-বিপদ দেন। তবে হারাম রিজিকের কারণে বরকত কমে যায় এবং দুআর প্রভাব দুর্বল হয়। তাই পরিবারের কর্তাদের উচিত তাওবা করা এবং হারাম উপার্জন ত্যাগ করা।
২) তাদেরকে কীভাবে বোঝানো যাবে?
উত্তর:
তাদেরকে বোঝানোর জন্য নিম্নলিখিত পদ্ধতি অবলম্বন করুন:
-
কুরআন ও হাদিসের দলিল পেশ করুন:
আল্লাহ তাআলা বলেন:"আল্লাহ তাআলা সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-সদকাকে বর্ধিত করেন।"
(সূরা আল-বাকারা: ২৭৬)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"সুদের সত্তরটি পাপ রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাপ হলো নিজের মায়ের সাথে বিবাহ করা।"
(মুস্তাদরাক হাকিম, হাদিস: ২২৭০) -
যুক্তি দিয়ে বোঝান:
হারাম রিজিকের কারণে দুনিয়াতে বরকত কমে যায়, আখিরাতে শাস্তি কঠিন। ব্যাংকের টাকা হালাল নয়, কারণ ব্যাংক সুদভিত্তিক লেনদেন করে। -
ভালোবাসা ও নম্রতা দিয়ে:
তাদেরকে অপমান বা তিরস্কার না করে দোয়া করুন এবং নরম ভাষায় বোঝান। আল্লাহ তাআলা বলেন:"তুমি নম্রভাবে তাদেরকে উপদেশ দাও।"
(সূরা ত্বহা: ৪৪)
৩) সুদের শাস্তি কী এবং দুনিয়াতে কেমন শাস্তি পায়?
উত্তর:
আখিরাতের শাস্তি:
- কুরআনে আল্লাহ তাআলা সুদখোরদের সম্পর্কে বলেন:
"যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতের দিন এমনভাবে উঠবে যেন শয়তান তাদেরকে স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দিয়েছে।"
(সূরা আল-বাকারা: ২৭৫) - হাদিসে এসেছে, সুদখোরের জন্য জাহান্নামের আগুনে শাস্তি নির্ধারিত।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)
দুনিয়ার শাস্তি:
- দুনিয়াতে সুদখোরের জীবনে বরকত কমে যায়, অশান্তি বৃদ্ধি পায়, এবং সমাজে তার মান-সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"সুদের প্রভাব সমাজে এতটাই ক্ষতিকর যে, তা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।"
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৩৩১)
৪) একজন মেয়ে হিসেবে কতটুকু গ্রহণ করবেন?
উত্তর:
- প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ:
আপনি যদি পরিবারের উপর নির্ভরশীল হন এবং আপনার জীবিকা নির্বাহের অন্য কোনো উপায় না থাকে, তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করতে পারবেন। তবে চেষ্টা করুন নিজে হালাল উপার্জনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার। - হারাম রিজিক থেকে বাঁচার নিয়ম:
- যদি পরিবারের কর্তারা হারাম উপার্জন করেন, তাহলে আপনি তাদের থেকে শুধু প্রয়োজনীয় খাবার ও থাকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন, তবে সেটা যেন অপচয় না হয়।
- নিজের ব্যক্তিগত খরচের জন্য হালাল উপার্জনের চেষ্টা করুন।
- তাদের জন্য দোয়া করুন যেন আল্লাহ তাদের হেদায়েত দেন।
উপসংহার:
আপনার কর্তব্য হলো:
১. পরিবারের কর্তাদেরকে নম্রভাবে বোঝানো এবং তাদের জন্য দোয়া করা।
২. নিজে হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা।
৩. হারাম রিজিক থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিকের তাওফিক দিন এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
দলিলভিত্তিক রেফারেন্স:
- সূরা আল-বাকারা: ২৭৫-২৭৬
- সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৩৩১
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৪৫
- রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৭৫