দায়িত্ব পালন না করে বহিঃপরীক্ষক কর্তৃক গৃহীত টাকা হালাল হবে কী না?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম ।
এইচএসসি পরীক্ষার বহিঃপরীক্ষক হিসেবে বিভিন্ন কলেজে আমাদের দায়িত্ব পড়ে আবার একই সময়ে নিজ কলেজে অভ্যন্তরীণ শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব থাকে, আবার ক্লাসও থাকে । কলেজের দায়িত্ব আর ক্লাস ম্যানেজ করে অন্য কলেজে গিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হলে LD নিতে হবে, সেক্ষেত্রে আমার ক্লাস গুলো অন্য শিক্ষকদেরকে নিতে হবে । আবার তারাও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষক হিসেবে খাতা দেখছেন, পরীক্ষার ডিউটি দিচ্ছেন, ক্লাস নিচ্ছেন এমনকি কেউ কেউ অন্য কলেজে বহিঃ পরীক্ষক হিসেবেও লিস্টে আছেন । তো একটা অলিখিত নিয়ম এরকম হয়ে গিয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট কলেজের অভ্যন্তরীণ শিক্ষকরাই ব্যবহারিক পরীক্ষার খাতাগুলো দেখে ফেলেন, তারাই নম্বর বসান আর বহিঃ পরীক্ষক তার কাজের ফাঁকে নিজ কলেজের দায়িত্ব পালনের ফাঁকে অন্য কলেজে গিয়ে ঐ খাতা গুলোয় শুধু স্বাক্ষর করে আসেন । একটা খাতায় বহিঃ পরীক্ষক ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষক উভয়কেই স্বাক্ষর করতে হয় ৷ তো প্রতিটি খাতা দেখা বাবদ বহিঃ
পরীক্ষক ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষক উভয়ই খাতা দেখা বাবদ ১০ টাকা করে পান কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষকই সব খাতা দেখছেন এবং বহিঃ পরীক্ষক স্বাক্ষর করার দিনে এসে খাতা দেখার টাকা নিচ্ছেন । যেমন, ২০০০ খাতার মধ্যে তার জন্য ৫০০ খাতা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তিনি ৫০০০ টাকা বুঝে নিচ্ছেন । তিনি জোর করে টাকাটা দাবি করছেন না কিন্তু সিস্টেমের কারণে সংশ্লিষ্ট কলেজ তাকে টাকাটা দিচ্ছে । সিস্টেম অথবা নিয়ম রক্ষার জন্য, যদিও বহিঃ পরীক্ষক একটি খাতাও দেখেননি ।
এ অবস্থায় বহিঃ পরীক্ষক কর্তৃক গৃহীত টাকার শরয়ী হুকুম কী? বহিঃ পরীক্ষকের করণীয় কী?
Answer
প্রশ্নের উত্তর
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো: বহিঃপরীক্ষক হিসেবে কেউ খাতা দেখেননি, অথচ সিস্টেমের কারণে তাকে খাতা দেখার পারিশ্রমিক দেওয়া হচ্ছে। এই টাকা তার জন্য হালাল হবে কি না এবং তার করণীয় কী?
শরয়ী হুকুম
মূলনীতি: ইসলামে কোনো কাজ সম্পাদন না করে তার বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয নয়। পারিশ্রমিক (উজরত) প্রাপ্য হয় কাজ সম্পাদনের বিনিময়ে। যদি কেউ প্রকৃতপক্ষে কাজটি না করে থাকে, তাহলে তার জন্য সেই পারিশ্রমিক গ্রহণ করা হালাল নয়।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে:
১. আল্লাহ তাআলা বলেন:
"যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আমি তাদের কাজের প্রতিদান অক্ষুণ্ণ রাখি না।" (সূরা আল-কাহফ: ৩০)
২. রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি কোনো কাজের দায়িত্বে নিয়োজিত হয় এবং আমরা তাকে বেতন দেই, সে যা কিছু এর বাইরে গ্রহণ করে তা খিয়ানত (আমানতের খিয়ানত)।" (আবু দাউদ: ২৯৪৩)
৩. ইমাম সারাখসী (রহঃ) আল-মাবসূত (১৫তম খণ্ড) এ উল্লেখ করেছেন:
"উজরত (পারিশ্রমিক) প্রাপ্য হয় কাজ সম্পাদনের বিনিময়ে অথবা কাজের জন্য প্রস্তুত থাকার বিনিময়ে।"
আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর
যেহেতু বহিঃপরীক্ষক প্রকৃতপক্ষে খাতা দেখেননি, শুধুমাত্র স্বাক্ষর করেছেন, তাই:
১. খাতা দেখার যে ১০ টাকা প্রতি খাতা হিসেবে তাকে দেওয়া হচ্ছে, তা তার জন্য হালাল নয়। কারণ তিনি কাজটি করেননি।
২. তবে স্বাক্ষর করার কাজটির জন্য যদি কোনো পারিশ্রমিক নির্ধারিত থাকে, তাহলে তিনি সেই পরিমাণ গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু খাতা দেখার পারিশ্রমিক তার প্রাপ্য নয়।
৩. বহিঃপরীক্ষকের করণীয়:
- তাকে উচিত হবে প্রকৃত অবস্থা কর্তৃপক্ষকে জানানো।
- তিনি যে খাতা দেখেননি, সেই খাতার পারিশ্রমিক গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা।
- যদি তিনি ইতোমধ্যে টাকা গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে সেই টাকা ফেরত দেওয়া অথবা সংশ্লিষ্ট কলেজের অনুমতি নিয়ে কোনো দাতব্য কাজে ব্যয় করা।
- যদি ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে অন্ততপক্ষে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়মে অংশ না নেওয়া।
ফিক্বহী কিতাবের উল্লেখ
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৪র্থ খণ্ড) তে উল্লেখ আছে:
"যদি কেউ কোনো কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করে কিন্তু কাজটি সম্পাদন না করে, তাহলে সে খিয়ানতকারী। তার উপর কর্তব্য হলো পারিশ্রমিক ফেরত দেওয়া।"
রদ্দুল মুহতার (৬ষ্ঠ খণ্ড) তে ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"উজরত শুধুমাত্র কাজ সম্পাদনের বিনিময়ে প্রাপ্য হয়। কাজ না করলে উজরত প্রাপ্য হয় না।"
উপসংহার
বহিঃপরীক্ষক কর্তৃক গৃহীত টাকা, যে টাকা খাতা দেখার বিনিময়ে দেওয়া হচ্ছে অথচ তিনি খাতা দেখেননি, তা হারাম। তার কর্তব্য হলো:
- টাকাটি ফেরত দেওয়া অথবা
- সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে গরীব-মিসকিনকে দান করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হালাল রিযিকের তাওফীক দান করুন। (আমীন)