গর্ভবতী অবস্থায় আ'মাল সমূহ
Family Life · Hanafi
Question
Answer
وعلیکم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
গর্ভবতী অবস্থায় সন্তান যেন নেক, চক্ষুশীতলকারী এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দা হয়, সে জন্য ইসলামে কিছু বিশেষ আমল ও দোয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে কুরআন ও হাদিসের আলোকে এবং হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের ভিত্তিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল উল্লেখ করা হলো:
১. কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া
গর্ভবতী মায়ের জন্য সবচেয়ে উত্তম আমল হলো বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা এবং আল্লাহর কাছে সন্তানের জন্য কল্যাণ প্রার্থনা করা। বিশেষ করে নিম্নোক্ত দোয়াগুলো পাঠ করা বাঞ্ছনীয়:
ক. সূরা আল-ফুরকান (২৫:৭৪)-এর দোয়া:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
উচ্চারণ: "রাব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ'ইউনিও ওয়াজ'আলনা লিলমুত্তাক্বিনা ইমামা।"
অর্থ: "হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে আমাদের জন্য চক্ষুশীতলকারী বানাও এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের ইমাম বানাও।"
খ. সূরা আলে ইমরান (৩:৩৮)-এর দোয়া:
رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً ۖ إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ
উচ্চারণ: "রাব্বি হাব লি মিল্লাদুনকা যুররিয়্যাতান ত্বাইয়্যিবাহ্, ইন্নাকা সামীউদ্দু'আ।"
অর্থ: "হে আমার রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি দোয়া শ্রবণকারী।"
২. সূরা ইউসুফ ও সূরা মারইয়াম তিলাওয়াত
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে যে, গর্ভবতী নারী যদি সূরা ইউসুফ তিলাওয়াত করে, তবে সন্তান সুন্দর চরিত্রের ও সুশীল হবে। আর সূরা মারইয়াম তিলাওয়াত করলে সন্তান ধৈর্যশীল ও নেককার হবে। (মা'আরিফুল কুরআন, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৩৫)
৩. সূরা লুকমান তিলাওয়াত
সূরা লুকমান তিলাওয়াত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। কেননা লুকমান (আঃ) ছিলেন জ্ঞানী ও নেককার ব্যক্তি। এই সূরায় সন্তানকে নেক উপদেশ দেওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। গর্ভবতী মা এই সূরা তিলাওয়াত করলে সন্তান হিকমত ও নেককার হওয়ার আশা করা যায়।
৪. নিয়মিত নামাজ ও জিকির
গর্ভবতী মায়ের জন্য নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা এবং বেশি বেশি জিকির করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে:
- দুরূদ শরীফ বেশি বেশি পড়া
- "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" পড়া
- "ইয়া হাফীযু" (হে সংরক্ষণকারী) জিকির করা
৫. হালাল খাদ্য গ্রহণ
সন্তান নেককার হওয়ার জন্য গর্ভবতী মায়ের জন্য হালাল ও পবিত্র খাদ্য গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি হালাল খাদ্য গ্রহণ করে, তার দোয়া কবুল হয়।" (সহীহ মুসলিম)
গর্ভবতী মায়ের উচিত হারাম ও সন্দেহযুক্ত খাবার থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা। কেননা মায়ের খাদ্যের প্রভাব সন্তানের চরিত্রে পড়ে।
৬. আখলাক ও চরিত্রের উন্নতি
গর্ভবতী মায়ের উচিত সর্বদা ভালো চরিত্রের অধিকারী হওয়া, বেশি বেশি দান-সদকা করা, কারো সাথে খারাপ ব্যবহার না করা। কেননা মায়ের আচরণ-আখলাকের প্রভাব সন্তানের উপর পড়ে। (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৮৫)
৭. বিশেষ দোয়া
গর্ভবতী মা নিম্নোক্ত দোয়াটি বেশি বেশি পড়তে পারেন:
اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ صَالِحًا مُؤْمِنًا تَقِيًّا نَقِيًّا
উচ্চারণ: "আল্লাহুম্মাজ'আলহু সলিহান মু'মিনান তাকিয়্যান নাকিয়্যা।"
অর্থ: "হে আল্লাহ! তাকে (সন্তানকে) নেককার, মুমিন, মুত্তাকী ও পবিত্র বানাও।"
৮. সন্তান প্রসবের সময় দোয়া
সন্তান প্রসবের সময় মা নিম্নোক্ত দোয়া পড়তে পারেন (সূরা মারইয়ামের আয়াত):
قَالَ كَذَٰلِكِ قَالَ رَبُّكِ هُوَ عَلَيَّ هَيِّنٌ
উচ্চারণ: "ক্বালা কাযালিকি ক্বালা রাব্বুকি হুয়া আলাইয়্যা হাইয়্যিন।"
অর্থ: "তিনি বললেন, এমনই হবে। তোমার রব বলেছেন, এটা আমার জন্য সহজ।"
গুরুত্বপূর্ণ নোট:
১. গর্ভবতী মায়ের উচিত নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদত যথাযথভাবে পালন করা। তবে গর্ভাবস্থায় শারীরিক অসুবিধা থাকলে ইসলামি বিধান অনুযায়ী ছাড় দেওয়া হয়েছে।
২. সন্তান নেককার হওয়ার জন্য শুধু আমলই যথেষ্ট নয়, বরং আল্লাহর রহমত ও তাওফিক প্রয়োজন। তাই বেশি বেশি আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত।
৩. গর্ভবতী মায়ের মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখা জরুরি। রাগ, হিংসা, ঈর্ষা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা উচিত।
৪. স্বামীর উচিত গর্ভবতী স্ত্রীর প্রতি বিশেষ যত্ন ও ভালোবাসা প্রদর্শন করা এবং তার জন্য দোয়া করা।
দলিলসমূহ:
- কুরআনুল কারিম (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭৪, সূরা আলে ইমরান ৩:৩৮)
- সহীহ মুসলিম (হাদিস নং ১০১৫)
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী দামাত বারাকাতুহুম)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে নেককার সন্তান দান করুন এবং আমাদের সন্তানদেরকে চক্ষুশীতলকারী বানান। আমিন।