শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ইসলামিক উপায়
Family Life · Hanafi
Question
আমার বরের কাজের সুবিধার্থে তার সাথে আমি ঢাকায় থাকি তো যখন বাসায় যাই উনি আমার সাথে কথা বলেন না ছেলের সাথে ঠিকই কথা বলেন এমনকি রমজান মাসেও বাসায় গেলেও তিনি আমার সাথে সারাদিন কথা বলেননি ,ইফতারিতেও আমি আলাদা বসেছি আমার দেবর বাসায় থাকার কারণে ।তিনি তার দুই ছেলেকে নিয়ে আলাদা ইফতার করেছেন। এটা ছিল আমার শ্বশুর বাড়িতে প্রথম রমজান। বিয়ের পর আমার বাসা থেকে কিছু না নিয়ে আসায় তিনি একটু মন খারাপ করেছিলেন কারণ তার ছেলে তাকে কঠিনভাবে বলেছিল শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছু না নেওয়া হয়। তিনিও মুখে বলেন যে তিনি কিছু চান না কিন্তু কাজে কর্মে প্রকাশ করেন যেন আমি সবকিছু বাবার বাসা থেকে নিয়ে আসে। শীতকালে ল্যাপ দেয়নি এমনকি আমার রুমে বালিশ পর্যন্ত বালিশ কথা পর্যন্ত বের করে নিয়ে গেছে। তবে তিনি কখনোই আমার সামনে খারাপ আচরণ করেন নি, কাজের কথাও কখনো বলেননি। আমি নিজে থেকেই যতটুকু পেরেছি করেছি হয়তো তার পছন্দ হয়নি কিন্তু পছন্দ হয়নি সেটা আমাকে ধরায় দেননি। রাগ করে থেকেছেন। বিয়ের পর তার ছেলে যতদিন বাসায় ছিল আমিও ততদিন বাসায় ছিলাম শাশুড়ির সাথে একাকী থাকা হয়নি এটা নিয়েই তার একটু মন খারাপ ছিল কিন্তু সে কখনো আমাকে থাকতেও বলেনি। আমার শাশুড়ি চাকরি করাই সারাদিন বাইরেই থাকেন বাসার পুরা ফাঁকা থাকায় আমি একাই থাকতেও চাইনি। এসব নিয়ে সে মন খারাপ করে আমার এবং আমার পরিবারের সাথে খারাপ আচরণ করে, ভালোভাবে কথা বলে না। অবস্থায় আমার বর আমাকে ধৈর্য গ্রহণ করতে বলেন দেখতে দেখতে এক বছর হয়ে গেল কিন্তু তার আচরণ আমি বুঝতে পারছি না। আমি বলেছি তাকে সরাসরি আমার কোন কাজ বা আচরণে কষ্ট পেলে আমাকে বলবেন কোন কাজ কিভাবে করতে হবে ,কিভাবে করলে খুশি হবে আমাকে না জানালে তো আমি বুঝবো না। তারপরও তিনি কিছু বলেন না কিন্তু দুইদিন পরপর আমার সাথে কথা বলেন না। তিনি চাকরি করার কারণে সারাদিন বাইরে থাকেন, সন্ধ্যার দিকে বাসায় আসেন। তার ছেলে তার সাথে কথা বলে,,খাবার নিয়ে রুমে খাওয়ায় আসে। তারপর ও ঈদের দিন আমার বাসায় আমার আম্মুকে ফোন দিয়ে বলে যে তিনি নাকি তার ছেলের সাথে ২০ মিনিট আলাদা করে কথা বলতে পারেন না। এখানে উল্লেখ্য যে ওনি একটা পার্ট টাইম জব করে পাশাপাশি সরকারি জবের জন্য পড়তেছে। ও কারণে সারাদিন রুমে পড়ে। আর বাহিরে থাকলে তার মা ই তাকে বলে এভাবে পড়লে হবে।
এসব কিছু কাহিনী তুলে ধরলাম। নতুন বউ হিসেবে তিনি আমাকে কখনো দেখেনি,,কাজ ও শেখায় দেয়নি। ঈদের দিন ও ভালো ব্যবহার করেনি। জানিনা কেনো।
আমি তাই আমার বরকে বলেছি যে এবার ঢাকা থেকে বাসায় গেলে আপনি একাই যাবেন। আমাকে দেখলে যেহেতু তার মন খারাপ হয় । আমি যাব না। আমার বর আবার এটাতে একটু রাজি না। কিন্তু আমি চাচ্ছিলাম শাশুড়ি তাঁর ছেলেকে নিয়ে ভালো থাক।১ বছর থেকে ঠিক করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ আমি। এতকিছুর পরেও আমি কখনো তার সাথে খারাপ আচরণ বা তর্ক করিনি।এখন আশংকা হয় যে যদি আমি সহ্য করতে না পেরে তার কাজের উত্তর দিয়ে দেই।তাহলে সে আরও রেগে যাবে,আরো অশান্তি বাড়বে।আমি থাকলে যেহেতু সমস্যা হয়,কি করলে ঠিক হবে তাও বলে না।তো কি করার।
এখন একজন মুসলিম হিসেবে আমার কি করনীয়? এভাবে দূরে থাকা কী আমার অন্যায় হচ্ছে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারিণী বোন, আপনার দীর্ঘ অভিযোগ ও পারিবারিক জটিলতা আমরা অবগত হয়েছি। প্রথমেই জেনে রাখুন, ইসলামে স্বামী-স্ত্রী ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শাশুড়ির সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধৈর্য, সহনশীলতা এবং হিকমত (প্রজ্ঞা) সহকারে আচরণ করাই কুরআন ও হাদিসের নির্দেশ।
১. ধৈর্য ও সহনশীলতার গুরুত্ব:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)
আপনার উচিত ধৈর্য ধারণ করা এবং রাগ বা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে এমন কোনো কাজ না করা যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে এবং আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।" (সহিহ বুখারি: ৬০১৮)
শাশুড়ি আপনার প্রতিবেশী বা পরিবারের সদস্য হলেও তার সাথে ভালো আচরণ করা আপনার দায়িত্ব।
২. দূরে থাকা বা আলাদা থাকা:
আপনি যদি মনে করেন যে আপনার উপস্থিতি শাশুড়ির জন্য সমস্যা তৈরি করছে এবং এর ফলে পারিবারিক অশান্তি বাড়ছে, তবে সাময়িকভাবে দূরে থাকা বা স্বামীর সাথে আলাদা থাকা জায়েজ হতে পারে। তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়। ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অটুট রাখা এবং পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ফিকহের কিতাবে আছে, স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাড়ি থেকে বের হওয়া বা আলাদা থাকা উচিত নয়। তবে যদি শাশুড়ির আচরণে আপনার ধর্মীয় বা নৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে স্বামীর সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
৩. স্বামীর ভূমিকা:
আপনার স্বামীর উচিত মা ও স্ত্রীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫)
স্বামীর উচিত মাকে বোঝানো যে, স্ত্রী তার পরিবারের সদস্য এবং তার সাথে ভালো আচরণ করা উচিত। তবে এক্ষেত্রে স্বামীকে কঠোর ভাষা ব্যবহার না করে নরমভাবে বোঝাতে হবে।
৪. শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা:
আপনি ইতিমধ্যে শাশুড়িকে সরাসরি বলেছেন যে, আপনার কোনো ভুল থাকলে তিনি জানান। এটি ভালো উদ্যোগ। তবে তিনি যদি না বলেন, তাহলে আপনি নিজে থেকে ছোট ছোট উপহার বা ভালো আচরণের মাধ্যমে তার মন জয় করার চেষ্টা করতে পারেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
"তোমরা পরস্পরকে উপহার দাও, এতে ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।" (সুনানে আবু দাউদ: ৫২৩০)
৫. দূরে থাকা অন্যায় কি না:
আপনি যদি স্বামীর সাথে আলাদা থাকেন বা শাশুড়ির থেকে দূরে থাকেন, তবে এটি অন্যায় নয় যদি তা পারিবারিক অশান্তি এড়ানোর জন্য হয়। তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়। আপনাকে চেষ্টা করতে হবে সম্পর্ক উন্নয়নের।
৬. দোয়া ও ইস্তিগফার:
আল্লাহর কাছে দোয়া করুন এবং শাশুড়ির জন্য ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
"দোয়া ছাড়া আর কিছুই ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে না।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৩৯)
৭. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
আপনার স্বামী যদি চান যে আপনি তার সাথে বাসায় যান, তবে আপনি যেতে পারেন। তবে শাশুড়ির সাথে কথা বলার সময় নম্র ও বিনয়ী হোন। যদি তিনি কথা না বলেন, তাহলে আপনি নিজে থেকে সালাম দিয়ে কথা শুরু করুন। এটি ইসলামের শিক্ষা।
উপসংহার:
আপনার ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রশংসনীয়। তবে মনে রাখবেন, সম্পর্ক উন্নয়নে সময় লাগে। আপনি যদি মনে করেন যে আপনার উপস্থিতি সমস্যা তৈরি করছে, তবে সাময়িকভাবে দূরে থাকা জায়েজ। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য স্বামীর সাথে পরামর্শ করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিন। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং দোয়া করতে থাকুন।
রেফারেন্স:
- সূরা আল-বাকারা: ১৫৩
- সহিহ বুখারি: ৬০১৮
- সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫, ৩৫৩৯
- সুনানে আবু দাউদ: ৫২৩০
আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবারে শান্তি ও ভালোবাসা দান করুন।