কাজের মহিলা ফিতনার কারণ হতে পারে?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
পর্দার বিধান: স্বাধীন নারী ও কাজের মহিলার ক্ষেত্রে
উত্তর
প্রশ্নকারিণীকে প্রথমে জানিয়ে দিচ্ছি যে, ইসলামে পর্দার বিধান শুধুমাত্র স্বাধীন নারীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং সব নারীর জন্য—চাই সে স্বাধীন হোক বা কাজের মহিলা হোক—পর্দা করা ফরজ। কাজের মহিলা হওয়ার কারণে পর্দার বিধান থেকে অব্যাহতি নেই।
কুরআন ও হাদীসের দলীল
১. কুরআনুল কারীমের নির্দেশ:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ "আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে পড়ে তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে।" (সূরা আন-নূর: ৩১)
এই আয়াতে সব মুমিন নারীকে সম্বোধন করা হয়েছে—স্বাধীন ও কাজের মহিলা নির্বিশেষে। (তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন, ৬/৪৮০)
২. আরেকটি আয়াত:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ "হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, আপনার কন্যাগণ এবং মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৯)
৩. হাদীসের দলীল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ "নারী সম্পূর্ণরূপে আবরণীয় (পর্দার বস্তু)।" (সুনানে তিরমিযী: ১১৭৩; সুনানে দারিমী: ৮৯৭)
ইমাম তিরমিযী এই হাদীসটিকে হাসান-গারীব বলেছেন। (তুহফাতুল আহওয়াযী, ৪/২৭৭)
হানাফী ফিকহের দলীল
১. রদ্দুল মুহতার (শামী):
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেছেন:
وَالْحُرَّةُ كُلُّهَا عَوْرَةٌ إِلَّا وَجْهَهَا وَكَفَّيْهَا عِنْدَ الْأَجْنَبِيِّ "স্বাধীন নারীর সমস্ত শরীর আউরাত—চেহারা ও দুই হাতের কব্জি ছাড়া—বেগানা পুরুষের সামনে।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)
তবে দাসীর ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, দাসীও বেগানা পুরুষের সামনে পর্দা করবে, তবে দাসীর জন্য কিছু শিথিলতা আছে—যেমন সে মাথার চুল ঢাকবে না, কিন্তু শরীরের অন্যান্য অংশ ঢাকবে। (বাদায়েউস সানায়ে, ৫/১২২)
২. ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী):
وَأَمَّا نَظَرُ الرَّجُلِ إِلَى الْأَجْنَبِيَّةِ فَلَا يَحِلُّ "বেগানা নারীর দিকে পুরুষের দৃষ্টিপাত করা বৈধ নয়।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৮)
৩. আল-হিদায়া:
وَلَا يَنْظُرُ إِلَى الْأَجْنَبِيَّةِ أَصْلًا "বেগানা নারীর দিকে (পুরুষ) আদৌ দেখবে না।" (আল-হিদায়া, ৪/৪৫৮)
কাজের মহিলার ক্ষেত্রে পর্দার বিধান
কাজের মহিলা ইসলামী বিধান অনুযায়ী বেগানা পুরুষের সামনে (মালিক, মালিকের ছেলে, মালিকের আত্মীয়) নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মেনে চলা ফরজ:
১. সমস্ত শরীর ঢেকে রাখা। ২. দৃষ্টি নত রাখা—বেগানা পুরুষের দিকে তাকানো হারাম। ৩. সৌন্দর্য ও দেহের প্রশংসা করা—এটি ফিতনার কারণ, হারাম। ৪. একাকী দেখা-সাক্ষাত না করা—মালিকের ছেলের সাথে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ ও কথোপকথন হারাম।
ফিতনার সতর্কতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ "আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা আমি রেখে যাইনি।" (সহীহ বুখারী: ৫০৯৬; সহীহ মুসলিম: ২৭৪০)
মালিকের ছেলের করণীয়
মালিকের ছেলের জন্যও ফরজ হলো:
- বেগানা নারীর দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকা।
- কাজের মহিলার সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা না বলা।
- পর্দার বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং নিজের দৃষ্টি নত রাখা।
উপসংহার ও পরামর্শ
১. পর্দার বিধান স্বাধীন নারীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়—কাজের মহিলার জন্যও পর্দা করা ফরজ। ২. কাজের মহিলার উচিত মালিকের ছেলের দিকে তাকানো, তার সৌন্দর্যের প্রশংসা করা এবং তার সামনে ওড়না ছাড়া থাকা থেকে বিরত থাকা। ৩. মালিকের ছেলের উচিত পর্দার বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং নিজের দৃষ্টি নত রাখা। ৪. এই ধরনের পরিস্থিতি ফিতনার কারণ—উভয়ের উচিত আল্লাহকে ভয় করা এবং এই পাপ কাজ থেকে তাওবা করা। ৫. কাজের মহিলার উচিত মালিকের স্ত্রীর কাছে মালিকের ছেলের প্রশংসা করা বন্ধ করা—এটি ফিতনার কারণ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পর্দার বিধান মেনে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ