দ্বীনি পড়াশোনা থেকে মন উঠে যাওয়া, জিকির আজকারে অনীহা এবং দুনিয়ার জীবনে হতাশা—এর কারণ ও সমাধান ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে জানতে চাই?

Family Life · Hanafi

Question No: 3892
Questioner: Jannatul Akowa Riham
Question Asked: 13 Aug 2026, 06:09 AM
Reviewed & Published: 13 Aug 2026, 06:14 AM
Views: 10
Tokens: 4,079
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

হঠাৎ করে দ্বীনি পড়াশোনা থেকে মন উঠে যাওয়া।
দ্বীনি পড়াশোনা ছাড়া ও দৈনন্দিন জিকির আজকার করতে না পারা।যদিও মনে মনে চায় অনেক ভালো করে পড়ব কিন্তু সবকিছু কেমন জানি অনিহা লাগে।
দুনিয়ার জীবনে সবকিছুতে হতাশ হয়ে যায়। সবকিছু থেকে মন উঠে যায়।

Answer

দ্বীনি পড়াশোনা থেকে মন উঠে যাওয়া ও হতাশা


উত্তর

আলহামদুলিল্লাহ, আপনার এই অনুভূতি অনেক মুমিনের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। এটি একটি সাধারণ মানসিক অবস্থা যা ইমান ও আমলের পথে বাধা সৃষ্টি করতে চায়। নিচে কুরআন-হাদিস ও হানাফি আলেমদের নির্দেশনায় বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো:

১. দ্বীনি পড়াশোনা ও জিকির থেকে মন উঠে যাওয়ার কারণ

দ্বীনি কাজে অনিহা ও অলসতা অনুভব করা একটি স্বাভাবিক মানবিক দুর্বলতা। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও এ সম্পর্কে জানিয়েছেন:

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "إِنَّ لِكُلِّ عَمَلٍ شِرَّةً، وَلِكُلِّ شِرَّةٍ فَتْرَةٌ، فَمَنْ كَانَتْ فَتْرَتُهُ إِلَى سُنَّتِي فَقَدْ اهْتَدَى، وَمَنْ كَانَتْ فَتْرَتُهُ إِلَى غَيْرِ ذَلِكَ فَقَدْ هَلَكَ"

"প্রত্যেক কাজেরই কিছু উৎসাহ-উদ্দীপনার সময় থাকে এবং কিছু সময় থাকে ক্লান্তি-অবসাদ। যার ক্লান্তি-অবসাদ আমার সুন্নতের দিকে হয়, সে হিদায়াতপ্রাপ্ত; আর যার ক্লান্তি-অবসাদ অন্য দিকে হয়, সে ধ্বংস হয়ে যায়।" (মুসনাদ আহমাদ: ৬৫৭০; সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৪৩)

ইমাম ইবনে রজব আল-হাম্বলী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন: "প্রত্যেক আমলেরই একটি উৎসাহের সময় থাকে, আবার একটি সময় আসে যখন মন থেকে উৎসাহ কমে যায়। এই অবস্থায় যে ব্যক্তি সুন্নতের উপর অটল থাকে এবং ফরজ ও ওয়াজিবসমূহ আদায় করতে থাকে, সে হিদায়াতের উপরই থাকে।" (জামি'উল উলূম ওয়াল হিকাম: ১/৩৬৫)

২. হতাশা ও মন থেকে উঠে যাওয়ার চিকিৎসা

ক. দুআ করা

রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি বিশেষ দুআ শিখিয়েছেন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ

"হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও হতাশা থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে এবং ঋণের ভার ও মানুষের প্রভাব থেকে।" (সহীহ বুখারী: ৬৩৬৯)

খ. নামাজে ধৈর্য ও সাহায্য প্রার্থনা

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

"হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)

গ. তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

"বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেন। তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)

৩. হানাফি আলেমদের নির্দেশনা

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.)-এর নির্দেশনা

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, ইবাদতে অলসতা ও অনীহা শয়তানের কুমন্ত্রণা। এর প্রতিকার হলো:

  1. ইস্তিগফার বেশি করা - গুনাহের কারণে ইবাদতে অলসতা আসে
  2. আলিমদের সাহচর্য গ্রহণ করা - ভালো মানুষের সাহচর্য ইমানকে শক্তিশালী করে
  3. ছোট ছোট আমল দিয়ে শুরু করা - বড় আমল করতে না পারলে ছোট আমল নিয়মিত করা

হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর পরামর্শ

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তার বেহেশতী জেওর গ্রন্থে বলেন: "যখন ইবাদতে মন না চায়, তখন জোর করে হলেও নামাজ পড়তে হবে এবং জিকির করতে হবে। কারণ, জোর করে আমল করলে ধীরে ধীরে মনও তৈরি হয়ে যায়।" (বেহেশতী জেওর: ২/৩৩)

তিনি আরও বলেন: "দ্বীনি পড়াশোনায় মন না বসলে কিছুদিনের জন্য হালকা দ্বীনি বই পড়ুন, যেমন: বেহেশতী জেওর, ফাযায়েলে আমল ইত্যাদি। এতে মন আবার তৈরি হবে।"

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.)-এর পরামর্শ

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) তার মা'আরিফুল কুরআন-এ বলেন: "হতাশা ও নিরাশা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। মুমিন সর্বাবস্থায় আল্লাহর রহমত থেকে আশাবাদী থাকে।" (মা'আরিফুল কুরআন: ৮/৫৩৪)

৪. ব্যবহারিক পরামর্শ

ক. ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন

একসাথে অনেক বড় পরিকল্পনা না করে ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। যেমন:

  • প্রতিদিন ১০ মিনিট কুরআন তিলাওয়াত
  • প্রতিদিন ১০০ বার ইস্তিগফার
  • প্রতিদিন ১ পৃষ্ঠা দ্বীনি বই পড়া

খ. নিয়মিত জিকিরের অভ্যাস গড়ুন

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

كَلِمَتَانِ خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ، ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ، حَبِيبَتَانِ إِلَى الرَّحْمَنِ: سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ

"দুটি কালিমা আছে যা জিহ্বায় সহজ, মিযানে ভারী এবং রহমানের কাছে প্রিয়—সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আযীম।" (সহীহ বুখারী: ৬৪০৬)

গ. ভালো মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করুন

الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ

"মানুষ তার বন্ধুর আদর্শের উপর থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন দেখে সে কাকে বন্ধু বানায়।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৩৩; তিরমিজি: ২৩৭৮)

ঘ. দুনিয়ার হতাশা থেকে মুক্তির উপায়

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ

"তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখ করো না, যদি তোমরা মুমিন হও তবে তোমরাই বিজয়ী।" (সূরা আলে ইমরান: ১৩৯)

৫. বিশেষ দোয়া

রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত একটি দোয়া:

يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ

"হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর স্থির রাখুন।" (সুনানে তিরমিজি: ২১৪০)


সংক্ষিপ্ত উপসংহার

১. দ্বীনি কাজে অলসতা ও অনীহা স্বাভাবিক; এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ২. ছোট ছোট আমল নিয়মিত করার চেষ্টা করুন। ৩. বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দরুদ পড়ুন। ৪. ভালো মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করুন। ৫. হতাশা থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন। ৬. মনে রাখবেন, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া কবিরা গুনাহ।

আল্লাহ তাআলা আপনার মন থেকে অলসতা ও হতাশা দূর করে দ্বীনের পথে অটল রাখুন। আমিন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.