দ্বীনদার বানাবো ভেবে বিয়ে করেছিলাম, এখন নিজেই দ্বীন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি,করনীয় কি?
Family Life · Hanafi
Question
এখন আমি মন থেকে একদমই এই বিয়ে মানতে পারছি না। আমার আল্লাহর সাথেও অনেক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
তাকে দ্বীনদার বানাবো ভেবে বিয়ে করেছিলাম। এখন নিজেই দ্বীন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।
আমরা বিয়ের ঐ ১ দিনই একসাথে ছিলাম। এখন ৩ বছরের জন্য পড়াশুনা, চাকরির জন্য আলাদা আছি।
তার সাথে কথা বলতেও আমার বিরক্ত লাগে।সন্তানরা দুনিয়ায় বুকে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করবে এই ইচ্ছে ও নেই এখন।
সে ঔষধ কম্পানির রিপ্রেজেনটেটিভ সকাল ৮-২ ডিউটি। বিকাল ৪/৫- রাত ১১/১২ টা ডিউটি। সবকিছু নিয়ে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। ভার্সিটির পড়াশুনা ও হচ্ছে না। পরীক্ষা খারাপ হচ্ছে। IOM এর পড়াশুনা ও ছেড়ে দিয়েছি।
এখন আমার করনীয় কি? এর সমাধান কি?
Answer
বিবাহ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: গত ১ তারিখে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছে, কিন্তু আমি এই বিয়ে মানতে পারছি না। আমার করণীয় কী?
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আমরা উদ্বিগ্ন। আসুন, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এবং হানাফী মাযহাবের আলোকে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি।
১. বিবাহের বৈধতা
প্রথমত, আপনাকে জানতে হবে যে ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হওয়া আবশ্যক:
- ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) - উভয় পক্ষের সম্মতি
- সাক্ষী - অন্তত দুইজন পুরুষ বা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী
- মহর নির্ধারণ
আপনার বিবাহ যদি এই শর্তগুলো পূরণ করে থাকে, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, বিবাহের পর তা বৈধ বলে গণ্য হবে যদি উপরোক্ত শর্তগুলো পূরণ হয়।
২. বিবাহ ভঙ্গের বিধান
ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন। তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ ইসলামে অপছন্দনীয় কিন্তু জায়েয। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।
হানাফী ফিকহ অনুযায়ী:
- যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক অচল হয়ে যায় এবং কোনোভাবেই মিলানো সম্ভব না হয়, তাহলে তালাক বা খুলার (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন) ব্যবস্থা রয়েছে।
- খুলা - স্ত্রী যদি স্বামীকে অপছন্দ করে এবং বিবাহ চালিয়ে যেতে না চায়, তাহলে সে স্বামীর কাছ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে পারে। সাধারণত এর বিনিময়ে স্ত্রী মহর বা মোহরানা ফেরত দেয়।
রদ্দুল মুহতার (৫ম খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়) এ উল্লেখ আছে যে, স্ত্রী যদি স্বামীকে অপছন্দ করে এবং তার সাথে জীবনযাপন করা সম্ভব না হয়, তাহলে সে খুলার মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারে।
৩. আপনার করণীয়
আপনার পরিস্থিতিতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত:
ক. ধৈর্য ও ইসতিখারা
বিবাহের পর মন পরিবর্তন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় প্রাথমিক অবস্থায় মনোভাব পরিবর্তন হয়, কিন্তু পরে সম্পর্ক ভালো হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যেন তার (ধর্মীয়) ভাইকে তিন দিনের বেশি পরিত্যাগ না করে।" (বুখারী ও মুসলিম)
আপনি আল্লাহর কাছে ইসতিখারা করুন এবং ধৈর্য ধারণ করুন। সম্ভবত এই বিবাহে আপনার জন্য কল্যাণ রয়েছে।
খ. স্বামীর সাথে যোগাযোগ
আপনি বলেছেন যে তার সাথে কথা বলতে বিরক্ত লাগে। কিন্তু সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ অপরিহার্য। ধীরে ধীরে তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করুন। হয়তো সময়ের সাথে সাথে আপনার মনোভাব পরিবর্তন হবে।
গ. দ্বীনের প্রতি দূরত্ব
আপনি বলেছেন যে আল্লাহর সাথে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এটি শয়তানের প্ররোচনা। এই কঠিন সময়ে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা করুন। নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির通过这些 মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করুন।
ঘ. পারিবারিক পরামর্শ
আপনার পরিবার এবং স্বামীর পরিবারের সাথে কথা বলুন। তারা হয়তো সমস্যা সমাধানে সাহায্য করতে পারবেন। ইসলামী পণ্ডিত বা মুফতির কাছ থেকেও পরামর্শ নিতে পারেন।
ঙ. শিক্ষা ও ক্যারিয়ার
আপনি বলেছেন যে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি মানসিক চাপের কারণে হতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগ দিন। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নিন।
৪. বিবাহ বিচ্ছেদের পূর্বে বিবেচনা
বিবাহ বিচ্ছেদ একটি গুরুতর সিদ্ধান্ত। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর যদি তারা (স্বামী-স্ত্রী) পৃথক হয়ে যায়, তবে আল্লাহ প্রত্যেককে নিজ নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত করে দেবেন।" (সূরা আন-নিসা: ১৩০)
তবে বিবাহ বিচ্ছেদের আগে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করুন:
-
সালিশ (মধ্যস্থতা) - কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমস্যা হলে উভয় পরিবার থেকে একজন করে সালিশ নিয়োগ করা উচিত। (সূরা আন-নিসা: ৩৫)
-
সময় দেওয়া - সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য সময় দিন। তাড়াহুড়া করবেন না।
-
ইসলাহ (সমাধান) - সম্ভব হলে সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করুন।
৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
যদি সব চেষ্টা করেও সম্পর্ক ঠিক না হয় এবং আপনি সত্যিই এই বিবাহ চালিয়ে যেতে না পারেন, তাহলে শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী খুলা বা তালাকের ব্যবস্থা করতে পারেন। তবে এর জন্য আপনাকে একজন যোগ্য মুফতি বা ইসলামী পণ্ডিতের পরামর্শ নিতে হবে।
মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন যে, বিবাহ বিচ্ছেদ একটি অপছন্দনীয় কাজ, কিন্তু যখন সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না, তখন তা জায়েয।
৬. মানসিক স্বাস্থ্য
আপনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি গুরুতর বিষয়। অনুগ্রহ করে:
- মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
- পরিবারের সাথে কথা বলুন
- আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন
- ধৈর্য ধারণ করুন
৭. দোয়া
আল্লাহর কাছে দোয়া করুন:
"رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا"
"হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য ইমাম বানিয়ে দিন।" (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪)
সংক্ষিপ্ত উপদেশ
- ধৈর্য ধরুন - বিবাহের পর প্রাথমিক অবস্থায় সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক
- আল্লাহর নিকটে যান - নামাজ, কুরআন, জিকিরের মাধ্যমে
- স্বামীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করুন - ধীরে ধীরে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করুন
- পারিবারিক পরামর্শ নিন - উভয় পরিবারের সাথে কথা বলুন
- যোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন - চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে
- মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন - প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নিন
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম সমাধান দান করুন এবং আপনাকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী)
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী)