বেনামাজীর দেয়া খাবার খাওয়ার বিধান কী?
Food and Drink · Hanafi
Question
Answer
বেনামাজীর দেয়া খাবার গ্রহণ প্রসঙ্গে
প্রশ্ন: কেউ একজন মুসলিম বেনামাজীর দেয়া খাবার খান না, কিন্তু যে খাবার দেন তাকে বুঝতে দেন না যে তার দেয়া খাবার তিনি গ্রহণ করেন না। তিনি হয়তো মুজতাজাবুদ দাওয়া (দোয়া কবুল হওয়া) হওয়ার জন্য এমন করেন। তার এরূপ কাজ কি শরীয়ত সম্মত? ইসলাম এই বিষয়ে কি বলে?
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ। প্রশ্নকারী ভাই/বোনের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে দুটি বিষয় রয়েছে:
১. বেনামাজীর দেয়া খাবার খাওয়া জায়েয কি না? ২. কাউকে না জানিয়ে তার দেয়া খাবার গ্রহণ না করা এবং এতে দোয়া কবুলের আশা করা শরীয়ত সম্মত কি না?
১. বেনামাজীর দেয়া খাবার খাওয়ার বিধান
মূলনীতি হলো: যে ব্যক্তি মুখে কালেমা শাহাদাত উচ্চারণ করেছে (মুসলিম), তার দেয়া খাবার খাওয়া জায়েয। নামাজ না পড়া বা গুনাহগার হওয়ার কারণে তার দেয়া খাবার খাওয়া হারাম হয় না। তবে যদি কেউ তাকে উপদেশ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বা তাকে উৎসাহিত করার জন্য তার দাওয়াত গ্রহণ না করে, তবে তা জায়েয হতে পারে, কিন্তু এটি বাধ্যতামূলক নয়।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
এই আয়াতে হারাম সম্পদ খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু মুসলিম বেনামাজীর হালাল উপার্জিত খাবার হারাম নয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে, তার জান-মাল নিরাপদ।" (সহীহ বুখারী: ২৫, সহীহ মুসলিম: ৩৬)
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) সহ সকল হানাফী ফকীহগণ এই মত পোষণ করেছেন যে, ফাসিক বা গুনাহগার মুসলিমের দেয়া খাবার খাওয়া জায়েয, তবে তার গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা যাবে না।
রদ্দুল মুহতার (শামী) -এ উল্লেখ আছে:
"ফাসিকের দেয়া খাবার খাওয়া জায়েয, কারণ তার খাবার হারাম নয়। তবে যদি জানা যায় যে তার সম্পদ হারাম উপার্জন থেকে, তাহলে তা খাওয়া মাকরূহ।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫)
২. কাউকে না জানিয়ে তার খাবার গ্রহণ না করা
এখন প্রশ্ন হলো, কেউ যদি বেনামাজীর দেয়া খাবার গ্রহণ না করে, কিন্তু তাকে না জানিয়ে থাকে, এবং মনে করে যে এতে তার দোয়া কবুল হবে — এটি শরীয়ত সম্মত কি না?
উত্তর: এটি শরীয়ত সম্মত নয়। কারণ:
ক. প্রতারণা বা ধোঁকা দেওয়া নিষিদ্ধ:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে আমাদের মধ্যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সহীহ মুসলিম: ১০১)
কাউকে না জানিয়ে তার দেয়া খাবার গ্রহণ না করা এবং তাকে বুঝতে না দেওয়া যে তার খাবার গ্রহণ করা হচ্ছে না — এটি এক ধরনের প্রতারণা বা ধোঁকা। শরীয়তে এটি নিন্দনীয়।
খ. সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণ:
এতে করে সম্পর্কের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হতে পারে। ইসলাম সম্পর্ক বজায় রাখতে উৎসাহিত করে।
গ. দোয়া কবুলের ভুল ধারণা:
দোয়া কবুল হওয়া নির্ভর করে আল্লাহর উপর, ইখলাসের উপর, হালাল রিজিকের উপর এবং অন্যান্য শর্তের উপর। বেনামাজীর খাবার না খাওয়াকে দোয়া কবুলের মাধ্যম বানানো ইসলামী শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং দোয়া কবুলের জন্য বেশি বেশি নেক আমল করা, তাওবা করা, হালাল উপার্জন করা ইত্যাদি জরুরী।
ঘ. ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি:
ইসলামে গুনাহগার মুসলিমকে হেদায়েতের দিকে আহ্বান করা উচিত, তাকে বিচ্ছিন্ন করা নয়। তার সাথে সদ্ব্যবহার করা, তাকে নামাজের প্রতি উৎসাহিত করা — এটাই ইসলামের শিক্ষা।
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) -তে উল্লেখ আছে:
"কোনো ফাসিকের দাওয়াত গ্রহণ করা জায়েয, তবে তাকে উপদেশ দেওয়া এবং তার গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা উচিত।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৪৩)
ইমদাদুল ফাতাওয়া -তে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন:
"বেনামাজীর দেয়া খাবার খাওয়া জায়েয, তবে যদি মনে করা হয় যে খাবার না খেলে সে নামাজ পড়তে উৎসাহিত হবে, তাহলে তাকে বুঝিয়ে বলা উচিত, চুপে চুপে না খেয়ে থাকা উচিত নয়। কারণ এতে সম্পর্কের অবনতি হয় এবং ইসলামের ভুল বার্তা পৌঁছে।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/১৮৫)
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেছেন:
"বেনামাজী বা গুনাহগার মুসলিমের দেয়া খাবার খাওয়া জায়েয। তবে কেউ যদি তাকে উপদেশ দেওয়ার জন্য খাবার না খায়, তাহলে তাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে হবে যে, 'আপনি নামাজ পড়ুন, আমি আপনার খাবার গ্রহণ করব' — এতে উপদেশের উদ্দেশ্য সফল হবে। চুপে চুপে খাবার না খাওয়া এবং না জানানো ইসলামী আদবের পরিপন্থী।" (মা'আরিফুল কুরআন, ৫/৪৫২)
দোয়া কবুলের প্রকৃত উপায়
দোয়া কবুল হওয়ার জন্য ইসলাম যেসব বিষয় উল্লেখ করেছে:
১. হালাল রিজিক — রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি হালাল খাবার খায়, তার দোয়া কবুল হয়।" (তিরমিযী: ২৯৮৩) ২. ইখলাস — একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করা ৩. গুনাহ থেকে তাওবা — নিজের গুনাহ থেকে ফিরে আসা ৪. নামাজ ও অন্যান্য ফরজ ইবাদত — নিয়মিত নামাজ পড়া ৫. সৎকর্ম — বেশি বেশি নেক আমল করা
বেনামাজীর খাবার না খাওয়া দোয়া কবুলের শর্ত নয়। বরং নিজের আমল সংশোধন করাই দোয়া কবুলের প্রধান উপায়।
উপসংহার
১. বেনামাজী মুসলিমের দেয়া খাবার খাওয়া জায়েয, তবে তার গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা যাবে না। ২. কাউকে না জানিয়ে তার খাবার গ্রহণ না করা এবং এতে দোয়া কবুলের আশা করা শরীয়ত সম্মত নয়। ৩. এটি প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। ৪. দোয়া কবুলের জন্য বেনামাজীর খাবার বর্জন করা কোনো ইসলামী পদ্ধতি নয়। ৫. উত্তম পন্থা হলো: বেনামাজীকে ভালোবাসা ও সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে নামাজের প্রতি উৎসাহিত করা। যদি কেউ তার খাবার গ্রহণ না করতেই চান, তাহলে তাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া উচিত এবং কারণ ব্যাখ্যা করা উচিত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।